আরিফ রেশাদ
ইউনিভার্সিটি অব এসেক্স, যুক্তরাজ্য
২০২৬ সালের ৭ জুলাই দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত মীম আরাফাত মানবের নিবন্ধে বাংলাদেশের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন, ২০২৬ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। লেখক যুক্তি দিয়েছেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য বর্তমান আইন কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
মানবের নিবন্ধে বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর দুর্বলতা, প্রয়োগগত সীমাবদ্ধতা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সমস্যাগুলো নিয়ে শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে তাঁর তাত্ত্বিক প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের দিক থেকে অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী বলে মনে হতে পারে এবং আইন প্রণয়নের পেছনের বাস্তব সীমাবদ্ধতাগুলো আরও বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।
এই পর্যালোচনা নিবন্ধে মূল লেখাটির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং প্রশ্ন তোলা হয়েছে, নতুন আইন বাস্তবে তার সম্ভাবনা অনুযায়ী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে কি না, এবং কোন কোন কারণে তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শক্তির দিক: কাঠামোগত বিশ্লেষণ ও বাস্তব তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন
মানবের নিবন্ধের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তিনি তথ্য ফাঁসের ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখেননি। বরং তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট যোগসূত্র তৈরি করেছেন।
এর মধ্যে রয়েছে শপনোর তথ্য ফাঁস, ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে ফেসবুকে ভোটার তালিকা বিক্রির তথ্য এবং টেলিগ্রাম বট ও এপিআই লিকের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য বারবার উন্মুক্ত হওয়ার ঘটনা।
এই ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে মানব যথার্থভাবেই দেখিয়েছেন, এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; বরং একটি বৃহত্তর কাঠামোগত দুর্বলতার লক্ষণ।
তাঁর ব্যবহৃত “শ্যাডো কপি” ধারণাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বৈধ যাচাই প্রক্রিয়ার জন্য সংগৃহীত তথ্য পরবর্তীতে অনির্দিষ্ট সময় ধরে সংরক্ষিত থাকে, অথচ এর কোনো নিরীক্ষা ব্যবস্থা বা মুছে ফেলার নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে না। ফলে তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই বিশ্লেষণ আলোচনার দিক পরিবর্তন করে। কারণ এতে কেবল নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় ডাটাবেসকে সমস্যার মূল হিসেবে দেখা হয় না; বরং সেই ডাটাবেসের সঙ্গে যুক্ত ১৭৪টি প্রতিষ্ঠানকে সম্ভাব্য দুর্বল সংযোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
“আরও শক্তিশালী আইন প্রয়োজন” এই প্রচলিত বক্তব্যের বাইরে গিয়ে মানব মূল প্রশ্নটি সামনে এনেছেন: তথ্য কীভাবে পুরো ব্যবস্থার মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে এবং কোন পর্যায়ে তা ফাঁস হচ্ছে? আইনের প্রয়োগ কাঠামো নিয়ে তাঁর সমালোচনাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
আইনের ৪৯ ধারা অনুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার কারণ দেখিয়ে সরকার নির্দেশ দিলে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে সেই নির্দেশ মানতে হবে। মানবের মতে, যে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের কার্যক্রম তদন্ত করতে স্বাধীন নয়, তা প্রকৃত অর্থে নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয়; বরং কেবল একটি অভিযোগ গ্রহণকারী দপ্তরে পরিণত হয়।
এই যুক্তির গুরুত্ব বোঝা যায় আন্তর্জাতিক উদাহরণের মাধ্যমে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন (জিডিপিআর) এর ৫২ অনুচ্ছেদ তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। এর ফলে তারা প্রয়োজনে নিজ নিজ সরকারের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পারে। একইভাবে কেনিয়ার তথ্য সুরক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।
এই উদাহরণগুলো দেখায়, জবাবদিহির ঘাটতি কেবল একটি তাত্ত্বিক সমস্যা নয়; বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রেও এর সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে।
দুর্বলতার দিক: বিকল্প ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও অনালোচিত বাস্তবতা
তবে মানবের প্রস্তাবিত বিকল্প ব্যবস্থাগুলো তাঁর সমালোচনার মতো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
তিনি ডেটা কমন্স মডেল এর কথা বলেছেন, যেখানে ক্রিপ্টোগ্রাফিক যাচাই, ন্যূনতম তথ্য প্রকাশ এবং ডেটা সমবায়ের মাধ্যমে নাগরিকের তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ধারণা রয়েছে।
ধারণাটি আকর্ষণীয় হলেও বাস্তবায়নের পথ স্পষ্ট নয়।
মানব নিজেই স্বীকার করেছেন যে এনআইডি কাঠামো ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং একবার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা পরিবর্তন করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় যেখানে ১৭৪টি প্রতিষ্ঠান এনআইডি ডাটাবেসের সঙ্গে যুক্ত এবং যেখানে শ্যাডো কপির বিস্তার ঘটেছে, সেখানে বিদ্যমান কাঠামো থেকে নতুন মডেলে যাওয়ার বাস্তব পথ আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন ছিল।
ক্রিপ্টোগ্রাফিক যাচাই ব্যবস্থা চালু করা বা কার্যকর ডেটা সমবায় প্রতিষ্ঠা করা প্রযুক্তিগত, প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিকভাবে কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্নের উত্তর আরও গভীরভাবে প্রয়োজন। অ্যারন সোয়ার্টজ এবং টিম বার্নার্স লির সলিড (Solid) প্রকল্প এর উদাহরণ বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের বর্তমান ডিজিটাল অবকাঠামোর তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রক সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক কিছুটা সীমিত। এই উদাহরণগুলো তথ্যকে জনসম্পদ হিসেবে দেখার একটি দার্শনিক অবস্থান তুলে ধরে, কিন্তু বাংলাদেশের ডিজিটাল অবকাঠামো পরিচালনার বাস্তব চ্যালেঞ্জের সরাসরি সমাধান দেয় না।
মানব উল্লেখ করেছেন যে, কোনো ব্যবস্থার ভেতরে তৈরি করা সুশাসন বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বেশি টেকসই। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা হলো, এই অবকাঠামো ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। এর কাঠামোগত পরিবর্তন ব্যয়বহুল, রাজনৈতিকভাবে জটিল এবং প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন।
নিবন্ধে আইনের পেছনের রাজনৈতিক অর্থনীতিও পর্যাপ্তভাবে আলোচিত হয়নি। তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে রাখার সিদ্ধান্ত কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি তথ্য ব্যবস্থাপনার ওপর নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের একটি সচেতন নীতি সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছে এবং প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করলে কী ধরনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করলে আলোচনাটি আরও বাস্তবভিত্তিক হতো।
একইভাবে তথ্য ফাঁসের ঘটনা সম্পর্কে বাধ্যতামূলক নোটিফিকেশন ব্যবস্থা না থাকার বিষয়টিকে নিবন্ধে সরাসরি ব্যর্থতা হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে এর পেছনে ব্যবসায়িক চাপ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কিংবা আইন প্রণয়নের সমঝোতার বিষয়গুলোও বিবেচনা করা দরকার ছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ডেটা অ্যাডিকোয়েসি অর্জনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে মানবের বক্তব্য যথার্থ। বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে যেখানে পর্যাপ্ত মানদণ্ড না থাকলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত ব্যয় চাপতে পারে।
তবে এই অর্থনৈতিক যুক্তির সঙ্গে ডেটা কমন্স কাঠামোর সমন্বয় কিছুটা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। একদিকে যেখানে অর্থনৈতিক সংযুক্তি শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কারণ হিসেবে উঠে আসে, অন্যদিকে ডেটা কমন্স নাগরিক ক্ষমতায়ন ও সম্মিলিত নিয়ন্ত্রণের ধারণাকে গুরুত্ব দেয়। এই দুই উদ্দেশ্যের মধ্যে সম্পর্ক আরও পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
উপসংহার
বাংলাদেশের তথ্য ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন নিয়ে আলোচনায় মানবের নিবন্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। তথ্য ফাঁসের কারণ হিসেবে কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা এবং শুধু আইন দিয়ে প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়, এই যুক্তিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে নিবন্ধের সীমাবদ্ধতা হলো, সমালোচনা থেকে বাস্তব সমাধানের পথে যাওয়ার সেতু পুরোপুরি নির্মাণ করা হয়নি। ডেটা কমন্সের ধারণা এখনো পর্যাপ্তভাবে নির্দিষ্ট নয়, নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতার পথে রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষিত হয়নি এবং বর্তমান দুর্বল কাঠামো থেকে প্রস্তাবিত বিকল্প ব্যবস্থায় কীভাবে পৌঁছানো যাবে, তার স্পষ্ট রূপরেখাও অনুপস্থিত।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় আরও কার্যকর আলোচনা তৈরি করতে ইউরোপীয় উদাহরণের তুলনার পাশাপাশি দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতার জটিলতাগুলোকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কারণ একটি কার্যকর তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা শুধু আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তৈরি হয় না; এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা এবং নাগরিকের তথ্য অধিকারের প্রতি প্রকৃত প্রতিশ্রুতি।
