সানজিদা ইসলাম শুচি
শিক্ষক
বর্তমান সময়ে Work from Home এই বাক্যটির সাথে আমরা কম-বেশি সবাই পরিচিত। মূলত আজকে এই প্রসঙ্গে লেখার বিশেষ উদ্দেশ্য হল, ঘরে বসে কাজের (Work from Home) যে ক্রমবর্ধমান প্রসার এবং টেলিমেডিসিনের মতো প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবার বিকাশ কর্মজীবী অভিভাবকদের অসুস্থতার দিনের অভিজ্ঞতায় কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে, তার সামাজিক, পারিবারিক ও কর্মসংস্কৃতিগত দিকগুলো বিশ্লেষণ করা। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই নতুন কর্মব্যবস্থা কীভাবে কর্মজীবন ও পারিবারিক দায়িত্ব কর্তব্যের ভারসাম্য রক্ষা, মানসিক সুস্থতা, দীর্ঘ দিনের গড়ে ওঠা পারিবারিক আন্তরিক বন্ধন, সংস্কারের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার জন্ম দিচ্ছে, তা নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করাই এই প্রতিবেদনের মূল লক্ষ্য।
প্রযুক্তির অগ্রগতি কর্মজীবী মানুষের জীবনকে যেমন অধিক নমনীয় ও সংযুক্ত করেছে, তেমনি দায়িত্ব ও প্রত্যাশার নতুন বাস্তবতাও তৈরি করেছে। ঘরে বসে কাজ (Work from Home) এবং টেলিমেডিসিনের মতো প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা কর্মজীবী পরিবারের জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা এনে দিয়েছে। তবে এই সুবিধার আড়ালে কর্মজীবী অভিভাবকদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক দায়িত্ব এবং পেশাগত অঙ্গীকারের মধ্যকার প্রচলিত সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। একসময় অসুস্থ সন্তানের পরিচর্যার জন্য কর্মক্ষেত্র থেকে সাময়িক বিরতির যৌক্তিক কারণ হিসেবে বিবেচিত হলেও, বর্তমানে অনেক অভিভাবক একই সঙ্গে সন্তানের পরিচর্যা এবং অফিসের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ফলে অসুস্থতার দিন আর বিশ্রাম বা পরিচর্যার জন্য নিবেদিত সময় হিসেবে থাকে না; বরং তা পরিণত হয় বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালনের এক অবিরাম চাপে। দীর্ঘমেয়াদে এ প্রবণতা কর্মক্ষমতা, মানসিক সুস্থতা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং কর্ম-জীবনের ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রযুক্তির সুফলকে টেকসই ও মানবিক করতে হলে পরিবারবান্ধব কর্মনীতি, পরিচর্যাবান্ধব কর্মসংস্কৃতি এবং কর্মীদের মানসিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
আসুন বর্তমান সময়ের Work for Home এর প্রচলিত এই ধারার বাস্তব প্রতিফলন ঠিক কেমন, সে সম্পর্কে একটি ধারণা নেয়ার চেষ্টা করি-
ঘরই যখন কর্মক্ষেত্র
কোভিড-১৯ মহামারির পর বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও অনেক প্রতিষ্ঠানে দূরবর্তী কাজের সংস্কৃতি বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে কর্মীদের জন্য কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকেও দায়িত্ব পালন করা সহজ হয়েছে। বিশেষ করে ছোট সন্তান রয়েছে এমন পরিবারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা।
কিন্তু এই পরিবর্তনের একটি অদৃশ্য দিকও রয়েছে। অতীতে অসুস্থ সন্তানের কারণে অফিসে না যাওয়ার অর্থ ছিল কাজ থেকে সাময়িক বিরতি। বর্তমানে সেই বিরতির সুযোগ অনেকটাই কমে গেছে। কারণ প্রযুক্তি কর্মীদের সবসময় অনলাইনে সংযুক্ত থাকার সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে অনেক অভিভাবক সন্তানের পরিচর্যার পাশাপাশি মিটিং, ই-মেইল এবং অন্যান্য অফিসিয়াল দায়িত্বও পালন করতে বাধ্য হন। এতে কাজের চাপ কমার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে আরও বেড়ে যায়।
টেলিমেডিসিন ও পরিবর্তিত বাস্তবতা
ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা বা টেলিমেডিসিন চিকিৎসা গ্রহণকে অনেক সহজ করেছে। অনলাইন ভিডিও কনসালটেশনের মাধ্যমে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রেসক্রিপশন সংগ্রহ করা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন আগের চেয়ে দ্রুত ও সহজ।
তবে এই সুবিধাও একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আগে হাসপাতালে যেতে সময় ব্যয় হওয়ায় কর্মস্থল থেকে দূরে থাকার একটি স্বাভাবিক সুযোগ তৈরি হতো। এখন চিকিৎসা কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ধরে নেয় কর্মী সঙ্গে সঙ্গে কাজে ফিরে যেতে পারবেন। ফলে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে মানবিক বিশ্রামের প্রয়োজনকে আড়াল করে দিচ্ছে।
পরিবর্তিত অভিভাবকত্ব ও সামাজিক বাস্তবতা
বর্তমান প্রজন্মের অভিভাবকেরা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকে আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সামান্য জ্বর বা সংক্রমণ হলেও অনেকেই সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর পরিবর্তে বাসায় বিশ্রামে রাখেন। কোভিড-পরবর্তী সময়ে সংক্রামক রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিও এই পরিবর্তনের একটি বড় কারণ।
কিন্তু এখানে একটি বৈপরীত্য স্পষ্ট। সন্তান বিশ্রামের সুযোগ পেলেও সেই সন্তানের যত্ন নেওয়া অভিভাবক নিজে প্রায়ই বিশ্রাম পান না। তিনি একই সময়ে একজন কর্মী, একজন অভিভাবক এবং একজন সেবাদানকারীর ভূমিকা পালন করেন। এই দ্বৈত চাপ দীর্ঘমেয়াদে মানসিক ক্লান্তি, উদ্বেগ এবং কর্মদক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রযুক্তির সুবিধায় বেড়েছে প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা
প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করার জন্য তৈরি হলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি কর্মীদের প্রতি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে, যেটা নিঃসন্দেহে ন্যায় সঙ্গত নয়। “ঘরে বসে কাজ করা সম্ভব”, এই ধারণা অনেক সময় “যে কোনো পরিস্থিতিতেই কাজ চালিয়ে যেতে হবে”, এমন এক অলিখিত সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে।
ফলে অসুস্থতার দিন, পারিবারিক জরুরি পরিস্থিতি কিংবা পরিচর্যার সময়ও অনেক কর্মী সম্পূর্ণভাবে কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেন না। বিশেষ করে যেসব পরিবারে ছোট শিশু রয়েছে, তাদের জন্য এটি একটি বড় সামাজিক ও কর্মজীবনগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
উপসংহার
দূরবর্তী কাজ এবং টেলিমেডিসিন আধুনিক কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে প্রযুক্তিগত সুবিধাকে মানবিক কর্মসংস্কৃতির বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। কর্মক্ষেত্রে পরিবারবান্ধব নীতি, পরিচর্যা, সংক্রান্ত ছুটির বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা এবং কর্মীদের মানসিক সুস্থতার প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একজন কর্মী ঘরে অবস্থান করছেন মানেই তিনি পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারবেন, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। প্রযুক্তি তখনই প্রকৃত অর্থে কল্যাণ বয়ে আনবে, যখন তা মানুষের দায়িত্ব কমাবে, নতুন চাপ সৃষ্টি করবে না। আধুনিক কর্মজীবী পরিবারের সুস্থতা নিশ্চিত করতে তাই উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি মানবিকতা ও সহমর্মিতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
