তানজীনা ফেরদৌস
নির্বাহী সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক আমলের আইনকে আধুনিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ বাল্যবিবাহপ্রবণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সামাজিক সংকট মোকাবিলা করা। কিন্তু আইনটির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ, ১৯ ধারা, শুরু থেকেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। অনেকের মতে, যে আইন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের জন্য প্রণীত হয়েছিল, সেই আইনই ব্যতিক্রমের সুযোগ রেখে উদ্দেশ্যকে আংশিকভাবে দুর্বল করেছে। এই নিবন্ধে আইনটির ইতিবাচক দিক, সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ও সামাজিক সংস্কার নিয়ে একটি সমন্বিত পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হয়েছে।
আইন সংস্কার এবং ১৯ ধারার বিতর্ক
২০১৭ সালের আইনটি বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ১৯২৯-এর পরিবর্তে প্রণীত হয়। নতুন আইনে নারীর বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং পুরুষের ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে সম্পাদন, নিবন্ধন, আয়োজন বা সহায়তা করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
তবে ১৯ ধারা একটি বিশেষ ব্যতিক্রমের সুযোগ সৃষ্টি করে। এই ধারার অধীনে অভিভাবকের সম্মতি এবং আদালতের অনুমোদন সাপেক্ষে, অপ্রাপ্তবয়স্কের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় বয়সসীমার নিচেও বিয়ের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
পরবর্তীতে বাল্যবিবাহ নিরোধ বিধিমালা, ২০১৮-এ “বিশেষ পরিস্থিতি”র ব্যাখ্যা সীমিত পরিসরে নির্ধারণ করা হয়। সেখানে মূলত প্রেমের সম্পর্কের ফলে কিশোরীর গর্ভধারণ এবং তার দেখভালের জন্য নিকট আত্মীয়ের অনুপস্থিতির মতো পরিস্থিতিকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এই ব্যতিক্রম কার্যত সেই কাজকেই বৈধতার সুযোগ দেয়, যা আইনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রতিরোধ করা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ১৯২৯ সালের আইনে এমন কোনো বিধান ছিল না।
বর্তমান বাস্তবতা: সংকট এখনো অব্যাহত
২০১৪ সালের গার্ল সামিট-এ বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচের মেয়েদের বাল্যবিবাহ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক দশক পরও বাস্তবতা উদ্বেগজনক।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিবাহিত হয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ শিশুকনের বসবাস, যার মধ্যে ১ কোটি ৩০ লাখ মেয়ের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের আগেই। কোভিড মহামারির সময় বাল্যবিবাহের হার প্রায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য গত এক দশকের তুলনায় প্রায় ১৭ গুণ দ্রুতগতিতে বাল্যবিবাহ কমাতে হবে।
আইনের প্রতিরোধমূলক কার্যকারিতাও সীমিত। সর্বোচ্চ শাস্তি প্রায় দেড় মাসের কারাদণ্ড এবং প্রায় ১৩ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থদণ্ড হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে শাস্তির ভয় বাস্তব প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে না।
আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং কাঠামোগত অস্পষ্টতা
১৯ ধারা ছাড়াও বর্তমান আইনগত কাঠামোয় আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা রয়েছে।
প্রথমত, প্রচলিত ব্যক্তিগত ধর্মীয় আইন এবং আইন দ্বারা নির্ধারিত বিয়ের ন্যূনতম বয়সের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়ে গেছে। ফলে কোন বিধান অগ্রাধিকার পাবে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, আইনটিতে বাল্যবিবাহ বাতিলের স্বাধীন সুযোগ নেই। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে জটিল বিবাহবিচ্ছেদ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যেখানে বৈষম্যমূলক শর্তও বিদ্যমান।
এ ছাড়া ২০১৮ সালের বিধিমালায় বিশেষ বিধানের আওতায় সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারণ করা হয়নি। অপ্রাপ্তবয়স্কের স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নির্ধারণের জন্যও কোনো বিস্তারিত মানদণ্ড বা তদন্ত পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়নি।
আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও একাধিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অনেক মানুষের মধ্যে আইন সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির অকার্যকারিতা, জন্ম ও বিবাহ নিবন্ধন ব্যবস্থার দুর্বলতা, অপরাধীদের বিরুদ্ধে সীমিত মামলা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার অভাব এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আইনটি অনেক ক্ষেত্রে নিজের বিয়েতে জড়িত অপ্রাপ্তবয়স্কদেরও শাস্তির আওতায় আনে। একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুসারে ১৩ বছরের বেশি বয়সী স্ত্রীর ক্ষেত্রে বৈবাহিক ধর্ষণকে এখনো অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
সুশাসনের জন্য জরুরি নীতিগত পদক্ষেপ
বর্তমান বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে কয়েকটি বিষয় অগ্রাধিকার পাওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, সংসদের উচিত ১৯ ধারা সংশোধন করে এমন একটি সর্বনিম্ন বয়স নির্ধারণ করা, যার নিচে কোনো অবস্থাতেই ব্যতিক্রমের সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে “বিশেষ পরিস্থিতি”র সুস্পষ্ট ও সীমিত সংজ্ঞা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নিম্ন আদালতের অনুমোদন কার্যকর হওয়ার আগে উচ্চতর বিচারিক পর্যায়ের লিখিত অনুমোদনের ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, নারী ও পুরুষের বিয়ের বয়সের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করে সমান বয়স নির্ধারণের বিষয়ে নীতিগত আলোচনা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, অপ্রাপ্তবয়স্কের ইচ্ছায় বাল্যবিবাহ বাতিলের আইনগত সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি উদ্ধার, পুনর্বাসন, আইনি সহায়তা, চিকিৎসা এবং মনোসামাজিক পরামর্শ প্রদানের জন্য একটি স্বাধীন তহবিল গঠন করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, ১৩ বছর বা তার বেশি বয়সী স্ত্রীর ক্ষেত্রে বৈবাহিক ধর্ষণের যে ঔপনিবেশিক ব্যতিক্রম এখনো বিদ্যমান, তা বাতিল করা সময়ের দাবি।
বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
বিচার বিভাগের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ বিধানের অধীনে কোনো আবেদন বিবেচনার সময় আদালতের উচিত অপ্রাপ্তবয়স্কের স্বাধীন ও অবাধ সম্মতি নিশ্চিত করার জন্য কঠোর নির্দেশনা অনুসরণ করা। মেয়েটির সাক্ষাৎকার অভিভাবক বা সম্ভাব্য স্বামীর উপস্থিতি ছাড়া গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত মতামত নিরপেক্ষভাবে জানা যায়।
বিভিন্ন আদালতের এখতিয়ার ও ব্যাখ্যাগত অস্পষ্টতাও দূর করতে হবে। একই সঙ্গে বিচারকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। বিশেষ করে শিশুর অধিকার সনদ (CRC) এবং নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW) অনুযায়ী সব ধরনের বাল্যবিবাহকে জোরপূর্বক বিবাহ হিসেবে বিবেচনার নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
যেখানে ব্যক্তিগত আইন এবং আইন দ্বারা নির্ধারিত বয়সের মধ্যে সংঘাত তৈরি হয়, সেখানে সর্বোচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আইনের প্রয়োগে একরূপতা নিশ্চিত করতে পারে।
ভবিষ্যতের পথচলা
বাংলাদেশের জাতীয় কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য কৌশল ২০১৭ থেকে ২০৩০ এবং সোশ্যাল প্রোটেকশন প্লাস কর্মসূচি ইতিবাচক নীতিগত উদ্যোগের ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে আইনগত সামঞ্জস্য ছাড়া কৌশলগত পরিকল্পনা প্রত্যাশিত ফল দিতে পারে না।
আঞ্চলিক অনেক দেশের তুলনায় নারী উন্নয়ন ও লিঙ্গসমতায় বাংলাদেশের অগ্রগতি ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে আইন যদি নিজেই পরস্পরবিরোধী বার্তা দেয়, তাহলে সেই অগ্রগতি টেকসই হবে না।
বর্তমান রূপে ১৯ ধারা বাল্যবিবাহ নির্মূলের পরিবর্তে ব্যতিক্রমের মাধ্যমে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহনশীলতার ইঙ্গিত দেয়। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই ধারা বাতিল অথবা কঠোর আইনগত ও বিচারিক সুরক্ষার আওতায় না আনা পর্যন্ত বাংলাদেশের আইন সংস্কার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হবে।
আজকের ৩ কোটি ৮০ লাখ শিশুকনে যেন ভবিষ্যতের পরিসংখ্যান না হয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন আরও সুসংগত আইন, কার্যকর প্রয়োগ, শক্তিশালী বিচারিক তদারকি এবং সমাজের সর্বস্তরের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
