শেখ সেলিম
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রপ্তানি নগদ প্রণোদনা স্কিম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৪৩টি পণ্যশ্রেণির সবগুলোই এবং সেগুলোর বিদ্যমান হার (শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত) আগের মতোই রাখা হয়েছে। বিশ্ববাজারে চাহিদার পরিবর্তনের মধ্যেও রপ্তানির গতি ধরে রাখতে এই সিদ্ধান্তকে একটি সুচিন্তিত ধারাবাহিকতার নীতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে ব্যবসায়িক চক্রের অবস্থান, স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির পরিণতির আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, এই সিদ্ধান্ত এমন কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষার মাঝে আটকে আছে যা পুরোপুরি অর্জন করা সম্ভব নয়, আবার এমন কিছু ঝুঁকিও এড়িয়ে যাচ্ছে যেগুলোর যথাযথ সমাধান দেওয়া হয়নি। এই লেখায় নীতিটিকে তিনটি মাত্রায় ঘনিষ্ঠভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে: ব্যবসায়িক চক্রের প্রভাব, স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধির প্রভাব এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাব।
ব্যবসায়িক চক্রের প্রভাব
নীতিগতভাবে রপ্তানি নগদ প্রণোদনা একটি প্রতিচক্রীয় (কাউন্টারসাইক্লিক্যাল) হাতিয়ার। যখন বহির্বিশ্বে চাহিদা সংকুচিত হয় এবং রপ্তানিকারকরা মুনাফার সংকোচনে পড়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ঝুঁকিতে থাকেন, তখনই এই প্রণোদনার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা সবচেয়ে বেশি। সরাসরি রাজস্ব হস্তান্তরের মাধ্যমে খরচের একটি অংশ পুষিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র মূলত সেই ব্যবধান ভর্তুকি দেয়, যা বিশ্ববাজার দিতে রাজি এবং দেশীয় উৎপাদকের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন, এই দুইয়ের মধ্যে বিরাজ করে। অর্থনীতি যখন মন্দার মধ্যে থাকে, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট খাত সাময়িক ধাক্কার মুখে পড়ে, তখন এই যুক্তি খাটে। এমন পরিস্থিতিতে প্রণোদনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাহিদা পুনরুদ্ধার হওয়া পর্যন্ত সংকটের সময় পার করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থান এই যুক্তিকে জটিল করে তোলে। ধারাবাহিকতার কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে “বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তন ও খরচের চাপ”, আবার একই সঙ্গে বলা হয়েছে “অতিরিক্ত রাজস্ব চাপ সৃষ্টি না করেই এই নীতি গ্রহণ করা হয়েছে”। এই বক্তব্য নিজের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। অর্থনীতি যদি এমন এক পর্যায়ে থাকে যেখানে রপ্তানির প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে বিদ্যমান হারে ধারাবাহিক সহায়তা প্রয়োজন, তাহলে সেই হারের রাজস্ব ব্যয় এড়ানো হচ্ছে না; বরং তা শুষে নেওয়া হচ্ছে।
আবার অন্যদিকে, অর্থনীতি যদি এমন পর্যায় পেরিয়ে যায় যেখানে টিকে থাকার জন্য আর প্রণোদনার প্রয়োজন নেই, তাহলে সেগুলো ধরে রাখা মোটেও প্রতিচক্রীয় সহায়তা নয়। তখন তা রপ্তানির খরচ কাঠামোর মধ্যে গেঁথে যাওয়া এক স্থায়ী ভর্তুকিতে পরিণত হয়, যা এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখে যেগুলোর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বাস্তব কোনো সম্ভাবনাই নেই।
ব্যবসায়িক চক্রের সবচেয়ে গভীর উদ্বেগ হলো, পুরো একটি অর্থবছর জুড়ে অপরিবর্তিত প্রণোদনার হার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে সেই বছরের মধ্যে বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার সামর্থ্য কেড়ে নেয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধে যদি তৈরি পোশাকের (প্রণোদনাপ্রাপ্ত পণ্যের মধ্যে প্রধান শ্রেণি) বৈশ্বিক চাহিদা শক্তিশালী হয়, তবে প্রণোদনা প্রয়োজনের বদলে বাড়তি মুনাফা হিসেবে প্রবাহিত হতে থাকবে। আবার চাহিদা যদি আরও দুর্বল হয়, তবে বিদ্যমান হার মুনাফার ব্যবধান পূরণে অপ্রতুল প্রমাণিত হতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই, গতিশীল একটি চক্রের ওপর স্থির প্রণোদনা কাঠামো প্রয়োগ করা মানে একটি অকার্যকর হাতিয়ার তৈরি করা। অপরিবর্তিত হার ও অপরিবর্তিত পরিধিতে অটল থাকাকে স্থিতিশীলতা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, কিন্তু অস্থির পরিবেশে স্থিতিশীলতা কোনো গুণ নয়। বরং তা একধরনের অনমনীয়তা।
স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধির প্রভাব: রূপান্তর নয়, নিছক হস্তান্তর
স্বল্প মেয়াদে প্রণোদনা স্কিম নিঃসন্দেহে বিদ্যমান রপ্তানির পরিমাণ ধরে রাখবে। রপ্তানি আয়ের শূন্য দশমিক ৩০ থেকে ১০ শতাংশ যখন সরাসরি রপ্তানিকারকের হাতে ফিরে আসে, তখন তা কার্যকর প্রাপ্ত মূল্য বাড়িয়ে দেয় এবং এমন মুনাফায় উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়, যা অন্যথায় টেকসই হতো না। তৈরি পোশাক, চামড়া ও পাটের মতো শ্রমঘন খাতের জন্য এর অর্থ কর্মসংস্থান রক্ষা এবং উৎপাদন সূচি বজায় থাকা। এগুলো বাস্তব ও স্পর্শযোগ্য স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধির প্রভাব, যা উপেক্ষা করা উচিত নয়।
কিন্তু যে প্রবৃদ্ধি টিকিয়ে রাখা হচ্ছে, তা নতুন প্রবৃদ্ধি নয়। বরং তা পিছিয়ে দেওয়া সংকোচন। যে প্রতিষ্ঠান কেবল নগদ প্রণোদনা তার খরচ ও আয়ের ব্যবধান পূরণ করে বলেই টিকে আছে, সেটি প্রকৃত অর্থে বেড়ে উঠছে না। বরং তাকে কাঠামোগত প্রতিযোগিতাহীন অবস্থায় ধরে রাখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নীতির লক্ষ্য “অপ্রচলিত খাতে বৈচিত্র্যায়নে সহায়তা করা”। অথচ সেসব খাতের প্রণোদনার হার সাধারণত শূন্য দশমিক ৩০ থেকে ১০ শতাংশ পরিসরের নিচের দিকে থাকে, যা প্রকৃত বৈচিত্র্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন পুনর্বণ্টন ঘটাতে সক্ষম নয়। উদীয়মান কোনো রপ্তানি পণ্যের ওপর শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমিক কিংবা বাজারে প্রবেশের ঘাটতি পুষিয়ে দেয় না। বড়জোর তা ঋণাত্মক মুনাফাকে সামান্য কম ঋণাত্মক করে তোলে। বৈচিত্র্যায়নের জন্য দরকার ধৈর্যশীল বিনিয়োগ, কারিগরি সহায়তা এবং বাজার উন্নয়ন। নগদ প্রণোদনা তার গঠন অনুযায়ী এই কাজগুলো করতে পারে না।
সার্কুলারে শর্ত দেওয়া হয়েছে যে, প্রণোদনা কেবল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রত্যাবাসিত রপ্তানি আয়ের ওপরই প্রযোজ্য হবে এবং তা বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালা মেনেই পাওয়া যাবে। এতে বাড়তি জটিলতা তৈরি হয়। যে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রা প্রক্রিয়াকরণে বিলম্ব ও নথিপত্রের জট সুবিদিত, সেখানে কাগজে-কলমে প্রণোদনা অর্জন এবং বাস্তবে তা হাতে পাওয়ার মধ্যে ব্যবধান অনেক বড় হতে পারে। ছোট রপ্তানিকারক, যাদের আলাদা কমপ্লায়েন্স টিম নেই, তাদের জন্য এই প্রশাসনিক বোঝা কার্যত প্রণোদনার প্রকৃত মূল্য নামমাত্র হারের চেয়ে কমিয়ে দেয়। এটি এমন এক বিকৃতি, যা ছোট প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানকে এবং উদীয়মান খাতের চেয়ে প্রচলিত খাতকে সুবিধা দেয়।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব: রাজস্ব চ্যানেল
নগদ প্রণোদনা প্রচলিত অর্থে মুদ্রানীতি নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও এগুলো আসলে রাজস্ব হস্তান্তর। এর মূল্যস্ফীতিমূলক প্রভাব দুটি পথে কাজ করে। প্রথমটি সরাসরি রাজস্ব মূল্যস্ফীতি। রপ্তানি প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া প্রতিটি টাকা সরকারি ব্যয়, যার অর্থায়ন করতেই হয়। আর বাংলাদেশের বর্তমান রাজস্ব প্রেক্ষাপটে সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ ঘাটতি অর্থায়নে চলে। ঘাটতি ব্যয়, বিশেষত যখন তা মূলধনী খাতের বদলে চলতি খাতে যায়, তখন তা সরবরাহ না বাড়িয়ে সামগ্রিক চাহিদা বাড়ায় এবং দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টি করে।
বিদ্যমান হার ধরে রাখায় বাড়তি রাজস্ব চাপ এড়ানো গেছে বলে প্রতিবেদনের যে দাবি, তা কেবল সংকীর্ণ অর্থেই সঠিক যে নতুন কোনো বোঝা যুক্ত হয়নি। কিন্তু ইতিমধ্যেই চাপে থাকা রাজস্ব পরিবেশে হাজার হাজার কোটি টাকার একটি হস্তান্তর কর্মসূচি বছরের পর বছর চালিয়ে যাওয়ার সঞ্চিত মূল্যস্ফীতিমূলক প্রভাবকে এই দাবি আমলে নেয় না।
দ্বিতীয় পথটি হলো বিনিময় হারের প্রভাব। রপ্তানি নগদ প্রণোদনা মূলত একধরনের আংশিক অবমূল্যায়ন। টাকার বিনিময় হার আনুষ্ঠানিকভাবে না বদলিয়েই এটি বিদেশি বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের কার্যকর দাম কমিয়ে দেয়। তবে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রপ্তানির প্রবাহ বাড়িয়ে দেওয়ায় রপ্তানি আয় দেশে ফিরিয়ে আনতে ও রূপান্তর করতে দেশীয় মুদ্রার চাহিদাও বাড়ে, যা সাময়িকভাবে টাকার মান বাড়িয়ে দিতে পারে।
শক্তিশালী টাকা আমদানি সস্তা করে, যা স্বল্প মেয়াদে মূল্যস্ফীতি কমায়। তবে তা কেবল তখনই ঘটে, যখন এই মূল্যবৃদ্ধি টেকসই হয় এবং ভোক্তা পর্যায়ে দামের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে। বাস্তবে বাংলাদেশে আমদানি মূল্যের প্রতিফলন ধীর ও অসম্পূর্ণ। ফলে প্রণোদনার রাজস্বজনিত মূল্যস্ফীতিমূলক প্রভাব বিনিময় হারজনিত মূল্যস্ফীতি-হ্রাসকারী প্রভাবের আগেই দেখা দেবে এবং তাকে ছাপিয়ে যাবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রপ্তানি নগদ প্রণোদনা অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত কোনো নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নয়। বরং এটি এমন এক রাজস্ব হস্তান্তর কর্মসূচি টিকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত, যা দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমন্বয়ের বিনিময়ে স্বল্পমেয়াদি রপ্তানির পরিমাণ ধরে রাখে, নতুনদের চেয়ে প্রতিষ্ঠিতদের সুবিধা দেয় এবং মুদ্রানীতির ভাষায় মোড়ানো এক মূল্যস্ফীতিমূলক রাজস্ব বোঝা বহন করে। প্রকৃত কৌশলী পদক্ষেপ হতো এই মুহূর্তটিকে কাজে লাগানো, যখন বৈশ্বিক খরচের চাপ বদলাচ্ছে। পরিণত খাতগুলোর জন্য প্রণোদনা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা এবং সেই সম্পদ বৈচিত্র্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সক্ষমতা বিনিয়োগে ঘুরিয়ে দেওয়াই হতো যথার্থ কৌশল।
ধারাবাহিকতা কোনো কৌশল নয়। বরং কৌশলের অনুপস্থিতি।
