ফারাহ জেহির
সম্পাদক, অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতা, মডেলিং এবং সেলিব্রিটি ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর অঙ্গনে এখনও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি গড়ে তুলতে পারেনি, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। নিবন্ধে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, এই সীমিত উপস্থিতির কারণ প্রতিভা বা সক্ষমতার অভাব নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, নীতিগত ঘাটতি এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের সৃজনশীল শিল্পের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
নিবন্ধে দেখানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত ছিল। পাশাপাশি পেশাদার প্রতিভা বিকাশে বিনিয়োগের ঘাটতি এবং মডেলিং ও বিনোদন জগতকে ঘিরে সামাজিক অনীহা এই খাতকে পিছিয়ে দিয়েছে। প্রতিবেশী ভারত ও শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশও প্রতিভাবান মানুষে সমৃদ্ধ; তবে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠায় সেই প্রতিভাকে আন্তর্জাতিক সাফল্যে রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের উচিত সৃজনশীল অর্থনীতির অংশ হিসেবে মডেলিং, ফ্যাশন, ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা। একই সঙ্গে স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, পেশাগত প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, অংশগ্রহণকারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ইতিবাচক জনআলোচনা উৎসাহিত করার মাধ্যমে দেশের উৎপাদন সক্ষমতাকে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপান্তর করা সম্ভব।
বৃহৎ পোশাক শিল্প, কিন্তু বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্বে সীমাবদ্ধতা
প্রায় সতেরো কোটি মানুষের দেশ এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতা, মডেলিং এবং সেলিব্রিটি ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর অঙ্গনে বাংলাদেশের উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। ভারত ষাটের দশক থেকে এখন পর্যন্ত ছয়জন মিস ওয়ার্ল্ড এবং তিনজন মিস ইউনিভার্স বিজয়ী তৈরি করেছে। অন্যদিকে জনসংখ্যায় অনেক ছোট দেশ শ্রীলঙ্কা ১৯৫৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে মিস ওয়ার্ল্ডে অংশগ্রহণ করে আসছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়মিত সাফল্য অর্জন করছে।
বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ২০২০ সালে মিস ইউনিভার্সে অংশ নেয় এবং ২০২৫ সালে শীর্ষ ত্রিশে স্থান অর্জন করে দেশের সর্বোচ্চ সাফল্যের রেকর্ড গড়ে। এই ব্যবধানের ব্যাখ্যা জনসংখ্যা, শারীরিক সৌন্দর্য কিংবা ব্যক্তিগত যোগ্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মূল কারণ দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনার অভাব এবং সৃজনশীল শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেয় এমন জাতীয় নীতির অনুপস্থিতি।
প্রথম পদক্ষেপ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা
বাংলাদেশ প্রথম মিস ওয়ার্ল্ডে অংশগ্রহণ করে ১৯৯৪ সালে, ঠিক সেই সময় যখন ঐশ্বরিয়া রাই ও সুস্মিতা সেনের আন্তর্জাতিক সাফল্যের মাধ্যমে ভারত বৈশ্বিক সুন্দরী প্রতিযোগিতার অন্যতম শক্তিতে পরিণত হচ্ছিল। কিন্তু ২০০১ সালের পর ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরোধিতা তীব্র হলে আয়োজকেরা প্রতিযোগিতা বন্ধ করে দেন। এরপর প্রায় ষোল বছর বিশ্বের প্রধান সুন্দরী প্রতিযোগিতাগুলোতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বন্ধ ছিল। পরে মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ পুনরায় চালু হয় এবং ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো মিস ইউনিভার্স বাংলাদেশ আয়োজন করা হয়।
এই দীর্ঘ বিরতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা তৈরি করে। যেসব দেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করে, সেসব দেশে প্রশিক্ষণ, জনসংযোগ, গণমাধ্যমে উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর প্রতিষ্ঠান কাজ করে। ভারতের ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া এবং শ্রীলঙ্কার মডেলশপ এমনই দুটি প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম। বাংলাদেশ এখনও সেই ধরনের ধারাবাহিকতা গড়ে তুলতে পারেনি।
নীতিগত শূন্যতা কোথায়
সবচেয়ে বড় ঘাটতি নীতিগত। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক, পর্যটন এবং ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু মডেলিং, ফ্যাশন, ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বকে সৃজনশীল অর্থনীতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে কোনো জাতীয় কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে বাংলাদেশ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করলেও ফ্যাশন ব্র্যান্ডিং, সেলিব্রিটি ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজনের বড় অংশ অন্য দেশগুলোর হাতে চলে যাচ্ছে।
অনেকেই আন্তর্জাতিক সুন্দরী প্রতিযোগিতাকে শুধুমাত্র বিনোদন হিসেবে দেখেন। বাস্তবে এই প্রতিযোগিতাগুলো ফ্যাশন, চলচ্চিত্র, গণমাধ্যম, পর্যটন এবং ভোক্তা পণ্যের বিশাল শিল্পে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ। প্রতিযোগীরা পরবর্তীকালে অভিনেতা, উপস্থাপক, উদ্যোক্তা এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁদের জনপ্রিয়তা দেশের ভাবমূর্তি শক্তিশালী করে এবং দেশীয় ব্যবসার জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা কম নয়। দেশের তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে ডিজাইনার, আলোকচিত্রী, স্টাইলিস্ট এবং গণমাধ্যম পেশাজীবীদের একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠছে। কিন্তু উৎপাদনশিল্পকে আন্তর্জাতিক পরিচিতির সঙ্গে যুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ট্যালেন্ট এজেন্সি, ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত ব্র্যান্ডিংয়ের অবকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা
সামাজিক পরিবেশও বড় বাধা হয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়তে হয়, বিশেষ করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার নিয়ম স্থানীয় রক্ষণশীল প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে। এমন পরিস্থিতি অনেক মেধাবী তরুণীকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত করে এবং মডেলিং ও বিনোদনকে পেশা হিসেবে সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার পথ কঠিন করে তোলে। একই ধরনের মানসিকতা পুরুষ মডেল ও পারফর্মারদের ক্ষেত্রেও সুযোগ সীমিত করেছে। ফলে ভারতের মতো শক্তিশালী ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি।
এটি শুধু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন নয়; অর্থনৈতিক নীতিরও প্রশ্ন। বর্তমান বিশ্বে দেশগুলো কেবল পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে নয়, সংস্কৃতি, বিনোদন এবং বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের মাধ্যমেও প্রতিযোগিতা করছে। আন্তর্জাতিক পরিচিতি পর্যটন, বিনিয়োগ এবং জাতীয় ভাবমূর্তি শক্তিশালী করে। বাংলাদেশ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে, কিন্তু সেই শিল্পকে বৈশ্বিক পরিসরে উপস্থাপন করতে পারে এমন মানবসম্পদ গড়ে তুলতে তুলনামূলকভাবে অনেক কম মনোযোগ দিয়েছে।
প্রতিযোগিতামূলক সৃজনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার পথ
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য বিচ্ছিন্ন আয়োজন নয়, দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রয়োজন। মডেলিং, ফ্যাশন, ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্বকে জাতীয় সৃজনশীল অর্থনীতি কৌশলের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। একই সঙ্গে সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজক প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে, যাতে রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবর্তনের কারণে তাদের কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।
প্রতিভা বিকাশেও বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এমন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে গ্রুমিং, যোগাযোগ দক্ষতা, স্টাইলিং, ডিজিটাল গণমাধ্যম, বিদেশি ভাষা এবং আন্তর্জাতিক আচরণবিধির ওপর পেশাদার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে অংশগ্রহণকারী, আয়োজক এবং পৃষ্ঠপোষকদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন।
গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকে বিতর্কের বিষয় হিসেবে নয়, বরং একটি পেশাগত অর্জন হিসেবে তুলে ধরা উচিত। পাশাপাশি শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিকর্মী, শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে গঠনমূলক জনআলোচনা বাংলাদেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বাস্তবতার মধ্যে এই পেশাগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
সবশেষে, বাংলাদেশের ফ্যাশন ও সৌন্দর্য শিল্পের উচিত বিদেশি সৌন্দর্যের মানদণ্ড অনুসরণ না করে দেশের নিজস্ব বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দেওয়া। বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ, ভিন্ন ত্বকের রং এবং ভিন্ন শারীরিক গঠনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয় আরও শক্তিশালী হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলাদা স্বাতন্ত্র্য তৈরি হবে।
জনসংখ্যা, সৃজনশীল প্রতিভা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং উদ্যোক্তা সম্ভাবনা বাংলাদেশের রয়েছে। এখন প্রয়োজন এমন একটি নীতিগত কাঠামো, স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান এবং আত্মবিশ্বাসী সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা ব্যক্তিগত সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় প্রভাব ও অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে সক্ষম হবে।
