ড. নুরুজ্জামান খান
অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া
দক্ষিণ এশিয়ায় আইনসভায় নারীর প্রতিনিধিত্ব দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিচিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, সংরক্ষিত সংসদীয় আসন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ, যাদের ঔপনিবেশিক ও সাংবিধানিক ঐতিহ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে, উভয় দেশই নারীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বঞ্চনা মোকাবিলার উপায় হিসেবে এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
কিন্তু দ্য অনিকেত বুলেটিন-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, কেবল সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্ব গণতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত করে না এবং তা নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতায়নেরও নিশ্চয়তা দেয় না (পারভিন, নাঈমা। “প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব থেকে গণতান্ত্রিক সার্বভৌমত্ব: বাংলাদেশের সংসদে নারীর প্রকৃত রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনর্গঠনের প্রশ্ন”, দ্য অনিকেত বুলেটিন, মে ২০২৬)।
বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে উপস্থাপিত সেই বিশ্লেষণ পাকিস্তানের সমান্তরাল সাংবিধানিক কাঠামো মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও একটি কার্যকর দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। একই সঙ্গে প্রতীকী অন্তর্ভুক্তি থেকে কার্যকর প্রতিনিধিত্বের পথে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাব্য সংস্কার নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু করার সুযোগ সৃষ্টি করে। এই নিবন্ধ সেই আলোচনার সূচনা করার উদ্দেশ্যে রচিত।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো
বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদে নারীদের জন্য ৫০টি সংরক্ষিত সংসদীয় আসনের বিধান রয়েছে। এসব আসনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন হয় না; বরং সংসদে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর আসনসংখ্যার অনুপাতে সদস্য মনোনয়ন দেওয়া হয়।
পারভিন (২০২৬) উল্লেখ করেছেন, এই ব্যবস্থায় নির্বাচিত নারীরা কোনো নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করেন না। ফলে ভোটারদের প্রতি তাদের সরাসরি জবাবদিহি থাকে না এবং রাজনৈতিকভাবে তারা অনেকাংশে দলীয় নেতৃত্বের মনোনয়ন ও সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
২০১৮ সালের সপ্তদশ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বাড়িয়ে ২০৪৩ সাল পর্যন্ত কার্যকর রাখা হয়েছে। ফলে শুরুতে যে ব্যবস্থা সাময়িক বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল, তা দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক কাঠামোয় পরিণত হয়েছে।
এ ধরনের ব্যবস্থার সংস্কারও সহজ নয়। কারণ সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাংবিধানিক সংশোধনের জন্য সংসদে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। বাস্তবে বড় রাজনৈতিক দলগুলো নিয়োগভিত্তিক সংরক্ষিত আসনের রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করায় বিদ্যমান ব্যবস্থা বহাল রাখার প্রবণতাই বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
পাকিস্তানের সমান্তরাল ব্যবস্থা
পাকিস্তানের কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে মিল বহন করে। দেশটির সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ৩৪২ সদস্যের জাতীয় পরিষদে নারীদের জন্য ৬০টি সংরক্ষিত আসন রয়েছে। এসব আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচন হয় না; রাজনৈতিক দলগুলোর আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে দলীয় তালিকা থেকে সদস্য মনোনীত করা হয়। একই ধরনের ব্যবস্থা প্রাদেশিক পরিষদগুলোতেও ১০৬ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে কার্যকর রয়েছে।
বাংলাদেশের মতো পাকিস্তানেও সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা মূলত দলীয় নেতৃত্বের মনোনয়নের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ভোটারের পরিবর্তে দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। পারভিন (২০২৬) যে পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর রাজনৈতিক কাঠামোর কথা উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তানেও সেই বাস্তবতা নারীদের আইন প্রণয়ন ও সংসদীয় কমিটিতে কার্যকর ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে।
২০০২ সালের পলিটিক্যাল পার্টিজ অর্ডার রাজনৈতিক দলগুলোকে সাধারণ আসনে নারীদের জন্য ন্যূনতম সংখ্যক মনোনয়ন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করলেও বাস্তবে সেই বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই নারী প্রার্থীদের এমন আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়, যেখানে বিজয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন পাকিস্তানের ব্যবস্থার আরেকটি দুর্বলতাও সামনে নিয়ে আসে। একটি বড় রাজনৈতিক দল সংরক্ষিত আসনের জন্য যোগ্য কি না, সেই প্রশ্নে দেশের সুপ্রিম কোর্টকে সংবিধানের ৫১ ও ১০৬ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিতে হয়। ফলে স্পষ্ট হয়, বাংলাদেশের তুলনায় পাকিস্তানের সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা সাংবিধানিক কাঠামোর পাশাপাশি বিচারিক ও প্রক্রিয়াগত অনিশ্চয়তারও মুখোমুখি হতে পারে। এর ফলে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃহত্তর রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অভিন্ন কাঠামোগত দুর্বলতা
দুই দেশেই এমন একটি বাস্তবতা দেখা যায়, যাকে পারভিন (২০২৬) “সুরক্ষার বৈপরীত্য” হিসেবে অভিহিত করেছেন। সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারীদের আলাদা পথ নির্ধারণ করা পরোক্ষভাবে এমন ধারণা সৃষ্টি করে যে, তারা সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য যথেষ্ট সক্ষম নন।
কিন্তু বাংলাদেশের শেখ হাসিনা এবং পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টোর মতো নারী নেত্রীরা সরাসরি নির্বাচনের মধ্য দিয়েই দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী নেতৃত্বে পৌঁছেছেন। ফলে সেই ধারণার বাস্তব ভিত্তি দুর্বল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুই দেশের কোনো সংবিধানেই সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, কার্যকারিতা মূল্যায়নের বাধ্যতামূলক বিধান কিংবা সাধারণ আসনে নারীর নির্বাচিত হওয়ার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সংযুক্ত পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা নেই। একই সঙ্গে উভয় দেশের বিচারব্যবস্থা সাধারণত সংসদের গঠনকে আইনসভার নিজস্ব এখতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেছে; মৌলিক অধিকারভিত্তিক বিচারযোগ্য প্রশ্ন হিসেবে নয়।
কাঠামোগত সংস্কারের পথে
বাংলাদেশের জন্য পারভিন (২০২৬) যে সংস্কার প্রস্তাব করেছেন, তার অনেকগুলোই বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয় দেশের জন্য প্রাসঙ্গিক।
প্রথমত, সংরক্ষিত আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। নারী সংরক্ষিত নির্বাচনী এলাকা, একাধিক এলাকা নিয়ে গঠিত আঞ্চলিক আসন অথবা দ্বৈত ব্যালট পদ্ধতির মতো বিভিন্ন মডেল বিবেচনায় আনা সম্ভব, যাতে ভোটাররা একই সঙ্গে একজন সাধারণ প্রতিনিধি এবং একজন নারী প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, সাধারণ আসনে রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নের ক্ষেত্রে কার্যকর ও বাধ্যতামূলক নারী কোটার বিধান প্রবর্তন করা প্রয়োজন। এতে প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি পূরণের পরিবর্তে সমস্যার মূল কারণ, অর্থাৎ বৈষম্যমূলক প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ার সংস্কার সম্ভব হবে।
তৃতীয়ত, সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা বহাল থাকলে তার সঙ্গে সাংবিধানিক মেয়াদসীমা এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর মূল্যায়নের বাধ্যতামূলক বিধান যুক্ত করা উচিত। পরিমাপযোগ্য অগ্রগতির ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ থাকলে সাময়িক ব্যবস্থা স্থায়ী কাঠামোয় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
পারভিন (২০২৬)-এর আলোচনায় উদ্ধৃত রুয়ান্ডার সফল কোটা ব্যবস্থা এবং সুইডেনে রাজনৈতিক দলগুলোর মূলধারার প্রতিযোগিতার মধ্যে লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করার অভিজ্ঞতা দেখায়, কোটা তখনই কার্যকর হয় যখন তা নারীদের স্বাধীন গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট সৃষ্টি করে, কেবল প্রতীকী নিয়োগ নয়।
উপসংহার
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয় দেশের জন্য প্রকৃত গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হলে নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধিত্বের সীমা অতিক্রম করতে হবে। প্রয়োজন এমন একটি নির্বাচন ব্যবস্থা, যেখানে নারী আইনপ্রণেতারা নিজেদের নির্বাচনী এলাকা থেকে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন, ভোটারদের প্রতি জবাবদিহি করবেন এবং নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রণয়নে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বাধীন ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।
সংখ্যাগত উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রকৃত গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন প্রতিনিধিত্বের ভিত্তি হবে জনগণের প্রত্যক্ষ আস্থা, দলীয় মনোনয়ন নয়।
