নিশিতা শুক্লা
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ ও ২০০০ সালের শুরুর দিকে বেসরকারি টেলিভিশন খাত উন্মুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশে টেলিভিশন সংবাদ শিল্পে ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। বর্তমানে অসংখ্য চ্যানেল দর্শক, বিজ্ঞাপন আয় এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় রয়েছে।
এই সম্প্রসারণ একদিকে যেমন তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়িয়েছে এবং দর্শকদের সামনে বিভিন্ন মত ও কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছে, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, তথ্য যাচাইয়ের মান এবং মালিকানা কাঠামো সংবাদ পরিবেশনে কতটা প্রভাব ফেলে, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও গভীর আলোচনা উৎসাহিত করা।
সংবাদমান ও তথ্যের সত্যতা
বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সংবাদ উপস্থাপনার প্রযুক্তিগত মান, সরাসরি সম্প্রচার সক্ষমতা এবং দ্রুত সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ব্রেকিং নিউজ, আবহাওয়া পরিস্থিতি এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি প্রতিবেদন অনেক ক্ষেত্রেই সময়োপযোগী ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত, যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মানের সঙ্গে তুলনীয়।
কিছু ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দুর্নীতি, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং জনস্বাস্থ্য ব্যর্থতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে, যেগুলো রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে সাধারণত কম গুরুত্ব পায়। তবে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা সংবাদ পরিবেশনের ধারাবাহিক মানকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক সংবাদকক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য যাচাইয়ের অবকাঠামো নেই এবং দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতা অনেক সময় সঠিকতার চেয়ে অগ্রাধিকার পায়।
আন্তর্জাতিক মানের বড় সংবাদ প্রতিষ্ঠানে যে ধরনের আলাদা তথ্য যাচাই বিভাগ থাকে, বাংলাদেশে তার প্রচলন এখনও সীমিত। অনেক সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র বা যাচাইহীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য যথাযথ অনুসন্ধান ছাড়াই সংবাদে ব্যবহার করা হয়। ভুল তথ্য প্রচারিত হলে সংশোধনী বা প্রত্যাহারের সংস্কৃতিও এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। ফলে তথ্যগত ভুলের জন্য চ্যানেলগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার মতো কার্যকর শিল্পব্যাপী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
পক্ষপাতের সমস্যা
বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশনে সংবাদ পক্ষপাতের ক্ষেত্রে মালিকানা কাঠামো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। বেশিরভাগ টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকানা রয়েছে এমন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে, যাদের আবাসন, তৈরি পোশাক, ব্যাংকিং বা নির্মাণ খাতে ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। অনেক মালিকের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে অথবা সম্প্রচার লাইসেন্স ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের জন্য সরকারের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়।
এই পরিস্থিতি এমন এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা স্বনিয়ন্ত্রণ তৈরি করে, যেখানে ক্ষমতাসীন সরকার বা চ্যানেলের নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বিব্রতকর বিষয়গুলো নিয়ে সংবাদ পরিবেশনে অনীহা দেখা দিতে পারে। ফলে বাংলাদেশের টেলিভিশন সংবাদ পরিবেশনে প্রায়ই দৃশ্যমান রাজনৈতিক বিভাজন লক্ষ্য করা যায়। কিছু চ্যানেলকে বর্তমান সরকারের প্রতি তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল হিসেবে দেখা হয়, আবার কিছু চ্যানেল বিরোধী রাজনৈতিক দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তা তৈরি করেছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়ন্ত্রক চাপ এবং লাইসেন্স সংক্রান্ত প্রভাবের কারণে কার্যকর সমালোচনামূলক ও বিরোধী মতের সংবাদ পরিবেশনের পরিসর অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশি টেলিভিশনের অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ফরম্যাট টক শো। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এসব অনুষ্ঠান ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার পরিবর্তে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়িয়ে তোলে। আলোচকরা অনেক সময় পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বক্তব্য দেন, ফলে প্রকৃত অর্থে গঠনমূলক বিতর্কের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকলেও সেগুলোকে অনেকেই পর্যাপ্ত স্বাধীন নয় বলে মনে করেন। সাংবাদিকরা সরাসরি ও পরোক্ষ চাপের কথা জানান, যার মধ্যে রয়েছে তথ্যপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা, আইনি হুমকি এবং বিস্তৃত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগের আশঙ্কা। এসব বিষয় সংবেদনশীল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা
বিবিসি বা সিএনবিসির মতো আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর তুলনা করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে আসে। তবে এই তুলনা সতর্কতার সঙ্গে করা প্রয়োজন, কারণ এসব প্রতিষ্ঠানেরও নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা রয়েছে।
বিবিসি মূলত একটি জনঅর্থায়নভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, যা সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত। এর রয়েছে সম্পাদকীয় নীতিমালা, অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং ভুল শনাক্ত হলে প্রকাশ্যে সংশোধনের সংস্কৃতি। বিবিসির সাংবাদিকদের সাধারণত তথ্যের উৎস উল্লেখ করা, বিতর্কিত বিষয়ে বিভিন্ন মত উপস্থাপন করা এবং বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য ও সরাসরি সংবাদ প্রতিবেদনের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখার প্রত্যাশা করা হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বিবিসি সম্পূর্ণ পক্ষপাতমুক্ত। বাম ও ডান উভয় রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচকরাই এর সংবাদ উপস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি উন্নত।
সিএনবিসি একটি বাণিজ্যিক মালিকানাধীন আর্থিক সংবাদ নেটওয়ার্ক। ফলে বিজ্ঞাপনদাতা, করপোরেট স্বার্থ এবং ব্যবসায়িক দর্শকের চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু চাপ তার ওপরও রয়েছে। এর সংবাদ কাভারেজ স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসা ও বাজারকেন্দ্রিক।
তবে এখানেও তথ্যের উৎস হিসেবে নির্দিষ্ট বিশ্লেষকের নাম উল্লেখ করা, স্বার্থের সংঘাত প্রকাশ করা এবং মতামতভিত্তিক অনুষ্ঠান ও সংবাদ প্রতিবেদনের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখার মানদণ্ড তুলনামূলকভাবে কঠোর। মূল পার্থক্য ব্যক্তিগত সাংবাদিকদের দক্ষতার ক্ষেত্রে নয়। বাংলাদেশে অনেক দক্ষ, সাহসী ও পেশাদার সাংবাদিক রয়েছেন। পার্থক্য মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ক্ষেত্রে।
বিশ্বমানের সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণত একাধিক স্তরের সম্পাদকীয় পর্যালোচনা, পৃথক তথ্য যাচাই দল, আনুষ্ঠানিক সংশোধনী নীতি এবং মালিকানাগত স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে তুলনামূলক স্বাধীনতা থাকে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অনেক বেসরকারি চ্যানেলে সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এমন মালিকদের প্রভাবের মধ্যে পরিচালিত হয়, যাদের রাজনৈতিক ফলাফল নিয়ে সরাসরি আগ্রহ রয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত সংবাদ প্রকাশ বা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক সংবাদ পরিবেশনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
উন্নয়নের সম্ভাব্য পথ
বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন সংবাদ খাতে মানোন্নয়নের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, সংবাদ যাচাই ও ভুল সংশোধনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড শিল্পব্যাপী গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা কাঠামো এবং মালিকদের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক সম্পর্কে অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি দর্শকদের ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যম সম্পর্কে সচেতনতা ও তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়লে দর্শকরাও আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ দাবি করবেন। দীর্ঘমেয়াদে দর্শকের এই পরিবর্তিত প্রত্যাশাই বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রাতিষ্ঠানিক মানের আরও কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।
