রুদাইনা বশির
ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য
সম্প্রতি অনিকেত বুলেটিন-এ প্রকাশিত জহির, এফ. (২০২৬)-এর প্রবন্ধ “ভোজের আড়ালে: বাংলাদেশের খাদ্যমান সংকট” একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছে, যা আরও বিস্তৃত আলোচনার দাবি রাখে। প্রবন্ধটিতে বলা হয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তার সমস্যা শুধু রাস্তার পাশের খাবারের দোকান বা ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এমনকি পরিচ্ছন্ন ও পেশাদার পরিবেশের বলে মনে হওয়া রেস্তোরাঁর রান্নাঘরেও আড়ালে দুর্বল স্বাস্থ্যবিধি বজায় থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
এই সতর্কতা বাংলাদেশের উচ্চমানের আ লা কার্ট ও ফাইন ডাইনিং রেস্তোরাঁ খাতের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। দেশের খাদ্য অর্থনীতির এই অংশটি দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার খাবার বা সাধারণ রেস্তোরাঁর মতো কঠোর নজরদারির বাইরে থেকেছে। কারণ, চকচকে অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, উন্নত সেবা এবং উচ্চমূল্যের খাবার অনেক সময় নিরাপত্তার একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে, যার বাস্তব পরীক্ষা খুব কমই হয়।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একটি প্রয়োজনীয় আলোচনা শুরু করা।
নিরাপত্তার প্রচলিত ধারণা
গুলশান, বনানী বা ধানমন্ডির কোনো অভিজাত রেস্তোরাঁয় খাবার গ্রহণকারী অনেকেই মনে করেন, বেশি দাম মানেই নিরাপদ খাদ্য, মানসম্মত উপকরণ সংরক্ষণ এবং প্রশিক্ষিত রান্নাঘর কর্মী নিশ্চিত। কিন্তু এই ধারণার পেছনে কোনো সুসংগঠিত ও নিয়মিত পরিদর্শন ব্যবস্থা নেই।
ফাইন ডাইনিং রেস্তোরাঁগুলো প্রায়ই বিশেষ ধরনের আমদানিকৃত উপকরণ ব্যবহার করে, যা দীর্ঘ সময় সংরক্ষণে থাকতে পারে। পাশাপাশি জটিল আ লা কার্ট মেনুর কারণে বিভিন্ন খাবারের জন্য আলাদা সংরক্ষণ ও প্রস্তুত প্রক্রিয়া প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে খোলা রান্নাঘর, ছাদ বা বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী নয় এমন স্থানকে রেস্তোরাঁয় রূপান্তর করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
জহির (২০২৬) সাধারণ রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে যে ঝুঁকিগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন, যেমন কাঁচা ও রান্না করা খাবারের মধ্যে দূষণ ছড়িয়ে পড়া, নিরাপদ সীমার বাইরে রান্নার তেল পুনর্ব্যবহার এবং অপর্যাপ্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, একই সমস্যাগুলো ফাইন ডাইনিং রেস্তোরাঁতেও থাকতে পারে। পার্থক্য শুধু এটুকু যে, এসব সমস্যা অনেক সময় উন্নত আলো, সাজসজ্জা ও সেবার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়।
বিপদ যখন দৃশ্যমান হয়
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দেখেছে, এসব গোপন ঝুঁকি যখন কাঠামোগত অবহেলার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন কী ভয়াবহ পরিণতি তৈরি হতে পারে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের বড় অংশ ছিলেন ওই ভবনের রেস্তোরাঁগুলোর অতিথি। ভবনটি মূলত আবাসিক বা অফিস ব্যবহারের জন্য নির্মিত হলেও পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই সেখানে রেস্তোরাঁ পরিচালিত হচ্ছিল।
সেদিন ব্যর্থতা কোনো রাস্তার খাবারের দোকানের ছিল না। বরং একাধিক রেস্তোরাঁ, যার মধ্যে কিছু নিজেদের অভিজাত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রচার করত, এমন একটি ভবনে কার্যক্রম চালাচ্ছিল যেখানে নিরাপত্তা বিধি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি।
পরবর্তী সময়ে কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, একই ধরনের ব্যবস্থা আরও অনেক জায়গায় রয়েছে। গাউসিয়া টুইন পিক ও কেয়ারি ক্রিসেন্ট টাওয়ারের মতো ভবনের ছাদে পরিচালিত রেস্তোরাঁগুলো অগ্নিনিরাপত্তা লঙ্ঘন বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন না থাকার কারণে বন্ধ করা হয়। পরিদর্শনে দেখা যায়, অনেক অভিজাত রেস্তোরাঁ এমন ভবনে পরিচালিত হচ্ছে, যেগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত ছিল।
যে অভিযানগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয় না
বেইলি রোডের অগ্নিকাণ্ডের পরবর্তী পদক্ষেপ বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্কৃতির একটি বড় সমস্যাকে সামনে নিয়ে আসে, তা হলো ধারাবাহিকতার অভাব। ঘটনার পরপরই ঢাকা মহানগর পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শত শত পরিদর্শন পরিচালনা করে। অনেক ভবন সিলগালা করা হয়, জরিমানা করা হয় এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়।
কিন্তু এই ধরনের কঠোর অভিযান সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় না। গণমাধ্যমের মনোযোগ কমে গেলে অভিযানও ধীরে ধীরে কমে আসে। রেস্তোরাঁ মালিকদের অনেকেই এসব উদ্যোগকে সাময়িক চাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা কিছুদিন পর আর আগের মতো থাকে না।
এর আগেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত কিছু রেস্তোরাঁয় বাসি খাবার, মেয়াদোত্তীর্ণ উপকরণ বা অপরিচ্ছন্ন সংরক্ষণ ব্যবস্থার কারণে জরিমানা করেছে। পরে নিয়মিত নজরদারি কমে গেছে, যতক্ষণ না নতুন কোনো বড় দুর্ঘটনা আবারও তৎপরতা শুরু করতে বাধ্য করেছে। দুর্ঘটনার পর প্রতিক্রিয়াশীল অভিযানের ওপর নির্ভরশীল কোনো নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা ফাইন ডাইনিং রেস্তোরাঁর গ্রাহকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। কারণ একজন ভোক্তার পক্ষে জানা সম্ভব নয়, সর্বশেষ কার্যকর পরিদর্শন কখন হয়েছিল।
স্থানীয় প্রশাসনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার
এই সমস্যা সমাধানে সাময়িক অভিযান নয়, প্রয়োজন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
প্রথমত, বর্তমানে রেস্তোরাঁ নিরাপত্তার দায়িত্ব বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, রাজউক, ফায়ার সার্ভিস এবং পুলিশের মধ্যে বিভক্ত। এই দায়িত্ব কাঠামোকে আরও সমন্বিত করে প্রতিটি ওয়ার্ড পর্যায়ে একটি নির্দিষ্ট জবাবদিহিমূলক কর্তৃপক্ষের অধীনে আনা প্রয়োজন। কোনো রেস্তোরাঁর লাইসেন্স প্রদান বা নবায়নের আগে খাদ্য নিরাপত্তা ও অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তারিখসহ নথিভুক্ত পরিদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে। একবার অনুমোদন পাওয়ার পর কোনো ফাইন ডাইনিং প্রতিষ্ঠান যেন বছরের পর বছর নতুন পর্যালোচনা ছাড়া পরিচালিত হতে না পারে।
তৃতীয়ত, প্রতিটি অনুমোদিত রেস্তোরাঁর জন্য প্রকাশ্য স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রেটিং ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। রেস্তোরাঁর প্রবেশপথে এবং অনলাইনে সেই তথ্য প্রদর্শন করতে হবে। এতে উচ্চমূল্যের খাবার মানেই নিরাপদ খাবার, এই ভুল ধারণা দূর হবে।
চতুর্থত, আবাসিক বা অফিস ভবনকে রেস্তোরাঁয় রূপান্তরের ক্ষেত্রে আলাদা কাঠামোগত ও অগ্নিনিরাপত্তা সনদ বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর মাধ্যমে বেইলি রোডের মতো পরিস্থিতির সুযোগ বন্ধ করা সম্ভব হবে।
সবশেষে, পরিদর্শনের সময়সূচি আগাম প্রকাশ করতে হবে এবং প্রতিটি পরিদর্শনের ফলাফল একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল রেজিস্ট্রিতে সংরক্ষণ করতে হবে। এতে নজরদারি কোনো দুর্ঘটনার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া না হয়ে স্থানীয় প্রশাসনের স্থায়ী কার্যক্রমে পরিণত হবে।
বাংলাদেশের ফাইন ডাইনিং খাত তখনই সেই আস্থা অর্জন করতে পারবে, যা তার মূল্য নির্ধারণ ও সেবার মানের মাধ্যমে দাবি করে। আর সেই আস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে কেবল তখনই, যখন নিরাপত্তার মানদণ্ড কোনো দুর্ঘটনার পর নয়, নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হবে।
তথ্যসূত্র
