নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি শুধু গবেষণা বাজেট বা অবকাঠামো নয়; বরং স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক কাঠামো। সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিকে গবেষণার জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ এবং অন্যদিকে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে একজন ডিনের পদত্যাগ, এই দুটি ঘটনা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার একটি গভীর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
মূলত এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হলো গবেষণা অনুদান বৃদ্ধির ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কীভাবে গবেষণা, একাডেমিক স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রভাবিত করে তা বিশ্লেষণ করা। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আরও স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত করণীয় তুলে ধরা।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি স্নাতকোত্তর, এমফিল ও পিএইচডি গবেষকদের জন্য প্রায় ৯৫.৬৬ লাখ টাকা গবেষণা অনুদান বিতরণ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এটি নিঃসন্দেহে গবেষণা সংস্কৃতি শক্তিশালী করার একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু একই সময়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এবং পরবর্তীতে তাঁর পদত্যাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়লেও প্রশাসনিক নিয়োগ যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালিত হয়, তবে সেই বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনটি যুক্তি দেয় যে গবেষণা অনুদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা কখনোই সুশাসন, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং মেধাভিত্তিক প্রশাসনের বিকল্প হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকসই উন্নয়নের জন্য গবেষণা বিনিয়োগের পাশাপাশি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত প্রশাসনিক সংস্কার অপরিহার্য।
গবেষণা অনুদান: উচ্চশিক্ষায় একটি ইতিবাচক অগ্রগতি
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে সীমিত গবেষণা বাজেটের সমস্যায় ভুগছে। সেই বাস্তবতায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
স্নাতকোত্তর, এমফিল এবং পিএইচডি পর্যায়ের শত শত শিক্ষার্থী এই অর্থায়নের মাধ্যমে গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন। গবেষণার মানোন্নয়ন, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় অংশগ্রহণের জন্য এই ধরনের অর্থায়ন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে গবেষণা অনুদানের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সেই অর্থ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।
রাজনৈতিক নিয়োগ ও প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন, চেয়ারম্যান কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তারা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন না; তারা গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন, বাজেট বণ্টন, একাডেমিক পরিকল্পনা এবং শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যদি এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে প্রশাসনের প্রতি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেখিয়েছে যে রাজনৈতিক বিতর্কিত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুরু থেকেই বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। এর ফলে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গবেষণা অনুদান কি প্রশাসনিক সংকটের বিকল্প হতে পারে?
গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু কেবল অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই একটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় না।
উচ্চমানের গবেষণার জন্য প্রয়োজন-
- একাডেমিক স্বাধীনতা;
- মতপ্রকাশের নিরাপত্তা;
- স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো;
- মেধাভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ;
- রাজনৈতিক চাপমুক্ত গবেষণা পরিবেশ।
যদি গবেষণা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক ভিত্তি দুর্বল হয়, তাহলে গবেষণায় বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফলও সীমিত হয়ে যায়।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার চক্র: সমস্যার মূল কোথায়?
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে অপসারণ, উভয় ঘটনাই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের জন্য সমানভাবে ক্ষতিকর। একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবে নিয়োগ এবং অন্য রাজনৈতিক শক্তির চাপের মুখে পদত্যাগ, দুই ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত একাডেমিক মানদণ্ডের পরিবর্তে রাজনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাধীন জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে দুর্বল করে এবং দীর্ঘমেয়াদে গবেষণা ও শিক্ষা উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গবেষণা ও সুশাসনের পারস্পরিক সম্পর্ক
গবেষণা অনুদান এবং সুশাসন একে অপরের বিকল্প নয়; বরং পরিপূরক। যেখানে প্রশাসন স্বচ্ছ, সেখানে গবেষণা অনুদানের ব্যবহারও অধিক কার্যকর হয়। আবার প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেলে গবেষণা মূল্যায়ন, অর্থ বরাদ্দ এবং একাডেমিক সুযোগ বণ্টনের ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্বের ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে গবেষণায় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সংস্কারও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
নীতিগত ভাবে করণীয়
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে-
- ডিন, চেয়ারম্যান ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক এবং প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
- বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর জন্য স্বাধীন নীতিমালা প্রণয়ন করা।
- গবেষণা অনুদান ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।
- শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য রাজনৈতিক চাপমুক্ত একাডেমিক পরিবেশ সৃষ্টি করা।
- বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলকে আরও কার্যকর ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ প্রদান করা।
- গবেষণা অর্থায়নের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনকে বিশ্ববিদ্যালয় মূল্যায়নের অন্যতম সূচক হিসেবে বিবেচনা করা।
উপসংহার
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার একটি মৌলিক বাস্তবতাকে স্পষ্ট করেছে। গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত প্রশাসনিক নিয়োগ সেই অর্জনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় তখনই প্রকৃত অর্থে জ্ঞানচর্চার স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে, যখন প্রশাসনিক পদে নিয়োগ হবে মেধা, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও একাডেমিক যোগ্যতার ভিত্তিতে, কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নয়।
বাংলাদেশ যদি গবেষণানির্ভর অর্থনীতি এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে চায়, তবে গবেষণায় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, সুশাসন এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও সমানভাবে অপরিহার্য।
