শেখ সেলিম
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
ভূমিকা
২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গ্রিসকে একের পর এক আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি, কঠোর ব্যয়সংকোচন, অর্থনৈতিক সংকোচন এবং ব্যাপক সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা, অস্পষ্ট তথ্য, রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ এবং বৈদেশিক নির্ভরতা কীভাবে একসঙ্গে একটি দেশের জন্য গভীর সংকট তৈরি করতে পারে, গ্রিসের অভিজ্ঞতা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে আছে।
বাংলাদেশ ও গ্রিসের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং উন্নয়নের পর্যায়ে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। তবু গ্রিসের অভিজ্ঞতার কিছু দিক বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। ২০১৬ সালের পর থেকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও বাংলাদেশে সরকারি ঋণ বৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক তথ্যের মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় কোনো আসন্ন সংকটের ইঙ্গিত নয়; বরং ভবিষ্যতে দুর্বলতাগুলো কাঠামোগত সংকটে রূপ নেওয়ার আগেই নজর দেওয়ার মতো কিছু সতর্কসংকেত।
গ্রিসের ঋণ সংকটের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির তুলনা থেকে কী শিক্ষা পাওয়া যেতে পারে, এই আলোচনা সেই প্রশ্নেরই একটি প্রাথমিক অনুসন্ধান।
গ্রিসের ঋণ সংকটের সূত্রপাত
অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়, দীর্ঘদিনের বাজেট ঘাটতি, দুর্বল কর আদায় এবং ব্যাপক ঋণগ্রহণের সম্মিলিত ফল হিসেবে গ্রিসের অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরো অঞ্চলের সদস্যপদ গ্রিসকে বহু বছর তুলনামূলক কম সুদে অর্থায়নের সুযোগ দিয়েছিল। ফলে সরকারগুলো প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার পিছিয়ে দিয়ে ক্রমাগত ঋণ বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল। ২০০৯ সালে গ্রিসের বাজেট ঘাটতির প্রকৃত পরিমাণ আগের প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি বলে প্রকাশ পাওয়ার পর পরিস্থিতির বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভেঙে পড়ে, ঋণের সুদহার দ্রুত বেড়ে যায় এবং বাজার থেকে নতুন অর্থ সংগ্রহ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে গ্রিসকে তিনটি বড় আর্থিক সহায়তা কর্মসূচির ওপর নির্ভর করতে হয়। ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দেশটিকে ঋণখেলাপি হওয়া থেকে রক্ষা করলেও এর মূল্য ছিল অত্যন্ত কঠিন। ব্যাপক সরকারি ব্যয় কমানো, কর বৃদ্ধি এবং অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার জনগণের ওপর চাপ তৈরি করে।
২০১৬ থেকে ২০২৬: বাংলাদেশের ঋণের গতিপথ
বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে মাঝারি সরকারি ঋণের বোঝা নিয়ে বাংলাদেশ এই দশকে প্রবেশ করেছিল। রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং সরকারি বিনিয়োগের ওপর ভর করে অর্থনীতিতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধিও বজায় ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাজেট ঘাটতি পূরণের জন্য সরকারের ঋণগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। জ্বালানি, পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থায় বড় বিনিয়োগ ভবিষ্যতের জন্য সম্ভাবনাময় হলেও এসব প্রকল্প একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য ঋণ পরিশোধের দায় তৈরি করেছে।
বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বেড়েছে। অপেক্ষাকৃত কম সুবিধাজনক শর্তের ঋণের অংশ ধীরে ধীরে বাড়ছে, যদিও বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলক সুবিধাজনক শর্তের ঋণের ওপর নির্ভরশীল। আমদানি বৃদ্ধি ও বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ভবিষ্যতে সরকারের ওপর পরোক্ষ আর্থিক দায় তৈরি করতে পারে। তবে সংকটের আগের সময়ের গ্রিসের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আয়ের তুলনায় বাংলাদেশের ঋণের বোঝা এখনো অনেক কম। তবু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
ঋণ সূচকের তুলনা
প্রধান অর্থনৈতিক সূচকগুলোর তুলনা করলে গ্রিস ও বাংলাদেশের মধ্যে যেমন কিছু মিল পাওয়া যায়, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও স্পষ্ট হয়। গ্রিস সংকটে প্রবেশ করেছিল বিপুল ঋণ এবং দীর্ঘস্থায়ী বাজেট ঘাটতি নিয়ে। অন্যদিকে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কম ঋণ এবং শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। তবে দুই দেশের ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বড় ধরনের সরকারি ব্যয়ের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে। গ্রিসে সরকারি খাতের সম্প্রসারণ ও সামাজিক কল্যাণমূলক ব্যয় ছিল গুরুত্বপূর্ণ, আর বাংলাদেশে অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ হয়েছে।
দুই দেশই বৈদেশিক আস্থার ওপর নির্ভরশীল। গ্রিসের ক্ষেত্রে সেই আস্থা এসেছিল বিনিয়োগকারী ও ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং বিদেশি বিনিয়োগ বড় ভূমিকা পালন করে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা। গ্রিস দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত দুর্বলতায় ভুগেছে। বিপরীতে বাংলাদেশের উৎপাদন খাত এখনো শক্তিশালী, শ্রমব্যয় তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদাও বাড়ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বনাম আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রভাব
গ্রিসের সংকট তার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। ভালো সময়ে এই সদস্যপদ দেশটিকে স্থিতিশীলতা ও অর্থায়নের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু সংকটের সময় একই কাঠামো গ্রিসের নীতিগত নমনীয়তা সীমিত করে দেয়। নিজস্ব মুদ্রার মূল্য কমিয়ে অর্থনীতিকে সামাল দেওয়ার সুযোগ না থাকায় গ্রিসের আর্থিক সিদ্ধান্তগুলো ঋণদাতাদের সঙ্গে আলোচনার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। নিজস্ব মুদ্রা ও মুদ্রানীতির ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ থাকায় অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের তুলনামূলকভাবে বেশি নীতিগত স্বাধীনতা রয়েছে। তবে ভারত, চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অভিবাসন এবং প্রবাসী আয়ের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
গ্রিসের অভিজ্ঞতার শিক্ষা স্পষ্ট: বৈদেশিক অংশীদারদের ওপর নির্ভরতা থাকলে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সক্ষমতাও শক্তিশালী করতে হয়। বাংলাদেশেরও অর্থায়ন, বাণিজ্য কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কোনো একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
দুর্নীতি ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ
গ্রিসের পতনে দুর্নীতি সরাসরি একমাত্র কারণ না হলেও এর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দুর্বল জবাবদিহি অদক্ষ সরকারি ব্যয়, কর ফাঁকি এবং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার ক্ষয়কে উৎসাহিত করেছিল। বাংলাদেশও একই ধরনের কিছু সুশাসনগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, সরকারি ক্রয়ে অনিয়ম, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং ঋণখেলাপির মতো বিষয় সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
বিষয়টি শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়। দুর্নীতি ঋণের স্থায়িত্বকেও হুমকির মুখে ফেলে। অতিরিক্ত ব্যয়ে নির্মিত কিংবা প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ অবকাঠামো প্রকল্প সরকারের ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। গ্রিসের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ঋণ সংকট অনেক সময় কেবল আর্থিক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা থেকে তৈরি হয় না; এর পেছনে গভীরতর সুশাসনগত দুর্বলতাও কাজ করে।
তথ্য প্রকাশ ও পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা
গ্রিসের সংকটের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকগুলোর একটি ছিল সরকারি আর্থিক পরিসংখ্যান ভুলভাবে প্রকাশের বিষয়টি সামনে আসা। সরকারি তথ্যের ওপর বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও গভীর হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋণের পরিমাণ, বাজেট ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি এবং সরকারের সম্ভাব্য আর্থিক দায় সম্পর্কে সঠিক তথ্য ছাড়া কার্যকর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়।
তথ্য যদি রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা বাছাই করা উপস্থাপনার অধীন হয়ে পড়ে, তাহলে নীতিনির্ধারকেরা নতুন ঝুঁকির মাত্রা কম করে দেখতে পারেন। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও সরকারি তথ্যের প্রতি আস্থা কমতে পারে। গ্রিসের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, স্বচ্ছতা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য এটি একটি মৌলিক পূর্বশর্ত।
রাজনৈতিক প্রণোদনা
এথেন্স ও ঢাকার ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক বিবেচনা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে। সরকারের জন্য ইতিবাচক সূচকগুলো সামনে আনা এবং দুর্বলতাগুলোকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দেওয়ার রাজনৈতিক প্রণোদনা থাকে। বড় উন্নয়ন ব্যয় এবং আশাবাদী প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারে। গ্রিসে এমন রাজনৈতিক প্রণোদনাই আর্থিক সংকটের প্রকৃত মাত্রা স্বীকার করার বিষয়টি দীর্ঘায়িত করেছিল। সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয় তখন, যখন সংকট ইতিমধ্যে গভীর হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের উচিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণকে স্বাধীন, তথ্যনির্ভর এবং রাজনৈতিক চাপমুক্ত রাখা। শক্তিশালী সংসদীয় নজরদারি, স্বায়ত্তশাসিত পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান এবং উন্মুক্ত জনআলোচনা সংকট বড় আকার ধারণ করার আগেই সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে সহায়তা করতে পারে।
উপসংহার
গ্রিসের ঋণ সংকট একটি স্পষ্ট শিক্ষা দেয়: শুধু উচ্চ ঋণ কোনো দেশের অর্থনৈতিক পতন ঘটায় না। সংকট তখনই ভয়াবহ রূপ নেয়, যখন উচ্চ ঋণের সঙ্গে দুর্বল সুশাসন, অবিশ্বস্ত তথ্য প্রকাশ, রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ, বৈদেশিক নির্ভরতা এবং বিলম্বিত সংস্কার একসঙ্গে যুক্ত হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশ সংকটপূর্ব ২০০৯ সালের গ্রিসের তুলনায় অনেক বেশি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের ঋণের বোঝা তুলনামূলকভাবে কম, প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা শক্তিশালী এবং নিজস্ব মুদ্রানীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তবু ক্রমবর্ধমান ঋণগ্রহণ, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং সুশাসন নিয়ে উদ্বেগকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।
গ্রিসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, স্থিতিশীল সময়েই দুর্বলতাগুলো মোকাবিলা করতে হয়, সংকট শুরু হওয়ার পর নয়। আর্থিক শৃঙ্খলা, শক্তিশালী সুশাসন, বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান এবং স্বাধীন অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই বাংলাদেশ ভবিষ্যতের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে পারে।
