রুকসানা আখতার
স্বতন্ত্র স্থপতি
বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পকে প্রায়ই দেশের খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষের জীবিকা এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। প্রায় ১০ লাখ উদ্যোক্তা পোলট্রিভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রতি বছর এই খাতে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি ডিম এবং ১৪ লাখ ৬০ হাজার টন মাংস উৎপাদিত হয়।
সংখ্যার বিচারে এই অগ্রগতি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দ্বিতীয় লক্ষ্য, অর্থাৎ ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ার পথে উল্লেখযোগ্য সাফল্য বলে মনে হতে পারে। এই লক্ষ্যের মূল উদ্দেশ্য সবার জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী মূল্যের খাদ্যের নিরবচ্ছিন্ন প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
তবে পোলট্রি খাতের বাস্তব পরিস্থিতিকে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করলে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। টেকসই উৎপাদন, শোভন কর্মসংস্থান, জলবায়ু সহনশীলতা এবং দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। দ্য অনিকেত বুলেটিনে প্রকাশিত পোলট্রি শিল্পবিষয়ক একটি সাম্প্রতিক নিবন্ধের আলোচনাকে সামনে রেখে এই লেখায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
খাদ্যনিরাপত্তা: উৎপাদন বাড়লেও নিশ্চয়তা কতটা?
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দ্বিতীয় লক্ষ্য শুধু পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের কথা বলে না। সারা বছর সব মানুষের, বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে পোলট্রি উৎপাদন বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা উৎপাদনের দিক থেকে ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধি সব সময় খাদ্যনিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না।
কিছু সময়ে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে খরচ প্রায় ১৬০ টাকায় পৌঁছালেও বাজারে বিক্রিমূল্য নেমে এসেছে প্রায় ১৩০ টাকায়। এমন পরিস্থিতিতে খামারিরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন। উৎপাদক পর্যায়ে দীর্ঘস্থায়ী লোকসান দেখা দিলে সরবরাহ ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ভোক্তার জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তাও দুর্বল হয়ে যায়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ খাদ্যব্যবস্থায় মূল্য স্থিতিশীলতা এবং উৎপাদকের আর্থিক সক্ষমতা মৌলিক শর্ত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান পোলট্রি উৎপাদন ব্যবস্থা এখনও আমদানি করা ভুট্টা ও সয়াবিন মিলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ সংকট দেখা দিলে দেশের পোলট্রি খাত সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
প্রাণিসম্পদের স্থায়িত্ব: জলবায়ু ও জীবাণু নিরাপত্তায় ঘাটতি
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১৩ নম্বর লক্ষ্য, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, এবং ১৫ নম্বর লক্ষ্য, স্থলজ প্রতিবেশ সংরক্ষণ, এমন প্রাণিসম্পদ উৎপাদনব্যবস্থার প্রত্যাশা করে যা পরিবেশগত চাপ মোকাবিলায় সক্ষম এবং প্রকৃতির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের পোলট্রি খাত এখনও জলবায়ু ঝুঁকির তুলনায় অনেক বেশি নাজুক। সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহে ব্রয়লার মুরগির মৃত্যুহার প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছায়। ডিম উৎপাদনকারী মুরগির ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ছিল প্রায় ৫ শতাংশ। তীব্র গরমের সময় ডিম উৎপাদন ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
২০২৫ সালের এপ্রিল ও মে মাসের তাপপ্রবাহে শুধু পোলট্রি খাতেই আনুমানিক আড়াই কোটি মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পোলট্রি উৎপাদন ক্ষুদ্র খামারিদের হাতে পরিচালিত হয়। তাঁদের অনেকেরই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, আধুনিক অবকাঠামো বা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা নেই। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
পরিবেশগত দিক থেকেও পোলট্রি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর ক্ষেত্রে আরও কার্যকর বিনিয়োগ প্রয়োজন। এসব বিষয় এখনও খাতটির নিয়মিত ও প্রতিষ্ঠিত চর্চার অংশ হয়ে ওঠেনি।
রোগ নিয়ন্ত্রণ ও জনস্বাস্থ্য: আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা প্রয়োজন
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার তৃতীয় লক্ষ্য, সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, প্রাণিস্বাস্থ্যের সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের সরাসরি সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে। বিশেষ করে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধক্ষমতা একটি বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশের অনেক ছোট পোলট্রি খামারে জীবাণু নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনও দুর্বল। পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ঘাটতির কথাও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে। ফলে রোগ পর্যবেক্ষণ, প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে আরও শক্তিশালী নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
কৃষিভিত্তিক ব্যবসা ও শোভন কর্মসংস্থান: অসম মূল্য শৃঙ্খল
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অষ্টম লক্ষ্য, শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, এবং দ্বাদশ লক্ষ্য, দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদন, কৃষিভিত্তিক মূল্য শৃঙ্খলে ন্যায্য সুবিধা বণ্টন এবং স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়।
বাংলাদেশের পোলট্রি সরবরাহ ব্যবস্থা এখনও একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীল। বাজারমূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে এবং অনেক খামারি পর্যাপ্ত সুরক্ষা পান না। চুক্তিভিত্তিক খামার পরিচালনা এবং প্রাণিসম্পদ বীমা সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে আলোচিত হলেও এখনও ব্যাপকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অনেক ক্ষুদ্র উৎপাদক সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যার মুখোমুখি হন। ফলে উৎপাদনের ঝুঁকি ও লাভের বণ্টনে ভারসাম্যহীনতা থেকে যায়। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দৃষ্টিতে কৃষিভিত্তিক মূল্য শৃঙ্খলে ঝুঁকি ও লাভ আরও ন্যায্যভাবে বণ্টিত হওয়া প্রয়োজন।
তবে এই খাতে রপ্তানিমুখী মূল্য সংযোজনের বড় সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববাজারে হালাল সনদপ্রাপ্ত পোলট্রি পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা, পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ পদ্ধতি এবং মূল্য সংযোজনভিত্তিক পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন বাজার তৈরি করতে পারে। নাগেটস, রান্নার জন্য প্রস্তুত মাংসসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য এই সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ একদিকে শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াবে, অন্যদিকে দায়িত্বশীল উৎপাদন ও মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে পারে।
ব্যবধান কমানোর পথ
বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পের আকার এবং প্রবৃদ্ধি দেশের খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি আঞ্চলিক পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সক্ষমতা রাখে। তবে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মানদণ্ডে বিচার করলে উৎপাদনের পরিমাণের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সহনশীলতা, বাজার স্বচ্ছতা এবং পরিবেশগত দায়িত্বশীলতার মধ্যে এখনও যথেষ্ট ব্যবধান রয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে পশুখাদ্য উৎপাদন বাড়ানো, জলবায়ু সহনশীল খামার অবকাঠামো গড়ে তোলা, জীবাণু নিরাপত্তাবিষয়ক বিধিব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে পণ্যের উৎস শনাক্তকরণ নিশ্চিত করা গেলে এই খাত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশের পোলট্রি খাতের বর্তমান সাফল্য নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু উৎপাদনের পরিমাণ যতটা দ্রুত বেড়েছে, টেকসই কাঠামো ততটা শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য এখন প্রয়োজন প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে খামারির আর্থিক নিরাপত্তা, ভোক্তার সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্যপ্রাপ্তি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু সহনশীলতা সমান গুরুত্ব পাবে।
তথ্যসূত্র
