মেহরান সাজ্জাদ
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার কমে আসাকে জাতীয় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়, এবং তার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে দেশে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রায় ১০০। ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে প্রায় ২০ দশমিক ৭৬-এ এবং ২০২৫ সালে হারটি প্রায় ১৯ দশমিক ৯৫-এ পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সাড়ে তিন দশকে প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস, নিম্ন আয়ের খুব কম দেশই এমন গতিতে অগ্রগতি দেখাতে পেরেছে।
পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হারেও বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। ২০১৯ সালে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে দেশে এই হার ছিল ৩১, যেখানে ভারতের হার ছিল ৩৪ এবং পাকিস্তানের ৬৫। তুলনামূলক সীমিত সম্পদ নিয়েও বাংলাদেশের এই অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ। দ্য অনিকেত বুলেটিনে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নিবন্ধেও বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
তবে একটি জাতীয় গড় কখনো কখনো যতটা প্রকাশ করে, ততটাই আড়ালও করে। প্রশাসনিকভাবে বাংলাদেশ আটটি বিভাগে বিভক্ত। বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেটের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এক নয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ের একটি গড় হার দিয়ে দেশের সব অঞ্চলের বাস্তবতা ব্যাখ্যা করা কঠিন।
এই নিবন্ধে সেই আঞ্চলিক ব্যবধানের বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিবেচনা করা হয়েছে, বিশেষ করে দ্য অনিকেত বুলেটিনে আগে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বিভাগভিত্তিক তুলনার যে সীমাবদ্ধতা ছিল, তা সামনে রেখে।
জাতীয় গড়ের তুলনায় সিলেট
বিভাগভিত্তিক তুলনামূলক তথ্যের ক্ষেত্রে সিলেটের অবস্থান সবচেয়ে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরে বিভাগটি দেশের নবজাতক মৃত্যুর সর্বোচ্চ বোঝা বহন করে এসেছে। ২০০০ সালে সিলেটে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে নবজাতক মৃত্যুর হার ছিল ৮১ দশমিক ৭। ২০১৭ সালে তা কমে ৩৭ দশমিক ৫-এ নেমে আসে। এই অগ্রগতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সময়ে জাতীয় গড়ের তুলনায় সিলেটের হার এখনও অনেক বেশি ছিল।
এর অর্থ হলো, একটি অঞ্চল জাতীয় প্রবণতার সঙ্গে একই দিকে এগোলেও জাতীয় সাফল্যের সমান অবস্থানে পৌঁছাতে নাও পারে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৩ দশমিক ২ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি দেশে নবজাতক মৃত্যুর হার প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে ১২ বা তার নিচে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার ২৫ বা তার নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
২০১৯ সালে বাংলাদেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার ছিল ৩১। জাতীয় প্রবণতা বিবেচনায় দেশটি লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগোচ্ছিল। ২০২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সামগ্রিক অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকলে জাতীয় পর্যায়ে এই লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু সিলেটের ২০১৭ সালের নবজাতক মৃত্যুর হার ছিল ৩৭ দশমিক ৫, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার নির্ধারিত সীমার তিন গুণেরও বেশি। জাতীয় গড়ের সাফল্যের আলোচনায় এই ব্যবধান সহজেই আড়ালে থেকে যায়।
২০১৭ সালের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়ে থাকলেও এত বড় ব্যবধান দ্রুত দূর হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার যথেষ্ট ভিত্তি নেই। কারণ এই অঞ্চলের উচ্চ শিশুমৃত্যুর পেছনে কেবল সাময়িক কোনো কারণ নয়, বরং কিশোরী বয়সে মাতৃত্ব, মায়ের শিক্ষার নিম্ন হার, অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থা এবং দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর মতো দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।
আট বিভাগের তুলনায় কোথায় তথ্য?
এখানেই দ্য অনিকেত বুলেটিনে আগে প্রকাশিত নিবন্ধটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। নিবন্ধটিতে যথার্থভাবেই বাংলাদেশের জাতীয় পরিসংখ্যানের পেছনে থাকা বৈষম্যের বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। গ্রাম ও শহরের ব্যবধান এবং অর্থনৈতিক অবস্থাভেদে শিশুমৃত্যুর পার্থক্যের কথাও সেখানে উঠে আসে।
কিন্তু বিভাগভিত্তিক বাস্তব তথ্যের ক্ষেত্রে আলোচনাটি মূলত সিলেটেই সীমাবদ্ধ। বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুরের কোনো বিভাগকে শিশুমৃত্যুর তথ্যের সঙ্গে নাম ধরে বিশ্লেষণ করা হয়নি।
ফলে পাঠকের মনে এমন একটি ধারণা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে যে, সিলেট হয়তো একমাত্র ব্যতিক্রমী অঞ্চল এবং দেশের বাকি অংশ মোটামুটি জাতীয় গড়ের কাছাকাছি রয়েছে। কিন্তু এই ধারণা যাচাই করার মতো বিভাগভিত্তিক তথ্য সেখানে উপস্থাপন করা হয়নি। এই তথ্যগত ঘাটতি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে দারিদ্র্যের হার, নারীর শিক্ষার সুযোগ, সড়ক যোগাযোগ এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবায় পৌঁছানোর সক্ষমতার ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। শিশুমৃত্যুর কারণ হিসেবে এসব বিষয়কেই সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।
উদাহরণ হিসেবে রংপুর ও ময়মনসিংহের কথা বলা যায়। দেশের দারিদ্র্য মানচিত্রে সিলেটের বাইরে এই অঞ্চলগুলোতেও দারিদ্র্যের উচ্চমাত্রার উপস্থিতি রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, শিশুস্বাস্থ্যের সূচকগুলোও কি জাতীয় গড় থেকে ভিন্ন? কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত করার বা খণ্ডন করার মতো বিভাগভিত্তিক তুলনামূলক তথ্য এখনও পর্যাপ্তভাবে আলোচনায় আসে না।
জাতীয় নীতি, কিন্তু সমস্যা আঞ্চলিক
দ্য অনিকেত বুলেটিনে প্রকাশিত আগের নিবন্ধের নীতিগত সুপারিশগুলোতেও একই সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। ছয়টি সুপারিশের মধ্যে পাঁচটিই জাতীয় পর্যায়ের। কেবল একটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা আঞ্চলিকভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে, যার লক্ষ্যও শুধু সিলেট বিভাগ। কিন্তু শিশুমৃত্যুর মতো একটি সূচক যদি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হয়, তাহলে নীতিগত সমাধানও শুধু জাতীয় গড়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না।
একটি প্রকৃত বিভাগভিত্তিক তুলনামূলক বিশ্লেষণের জন্য প্রতিটি বিভাগের শিশুমৃত্যু ও নবজাতক মৃত্যুর ধারাবাহিক তথ্য প্রয়োজন। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য বিভাগভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করে জাতীয় প্রবণতা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ৩ দশমিক ২-এর নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তাতে স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হবে, দেশের আটটি বিভাগ একই গতিতে এগোচ্ছে কি না।
জাতীয় সাফল্যের ভেতরের প্রশ্ন
বিভাগভিত্তিক তথ্য প্রকাশ ও বিশ্লেষণ নিয়মিত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ শিশুমৃত্যু কমানোর লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে, এমন বক্তব্যকে মূলত জাতীয় গড়ের আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে। শিশুমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন বাস্তব এবং তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের একটি ভালো ফলাফল দিয়ে সব অঞ্চলের অগ্রগতি নিশ্চিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না।
মূল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের আটটি বিভাগ কি একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগোচ্ছে? নাকি তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ ও সুবিধাপ্রাপ্ত অঞ্চলগুলোর ভালো ফল জাতীয় গড়কে নিচে নামিয়ে আনছে, আর কিছু অঞ্চল এখনও লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক দূরে রয়েছে?
জাতীয় সাফল্যের উদ্যাপন তাই প্রয়োজন। তবে সেই সাফল্যের আড়ালে কোনো অঞ্চল পিছিয়ে থাকছে কি না, তা জানার জন্য বিভাগভিত্তিক তথ্য, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং অঞ্চলভিত্তিক নীতিগত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
শিশুমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরবর্তী সাফল্য শুধু জাতীয় গড় আরও কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রকৃত সাফল্য হবে তখনই, যখন দেশের আটটি বিভাগই একইভাবে নিরাপদ মাতৃত্ব, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা এবং শিশুর বেঁচে থাকার সমান সুযোগের দিকে এগোতে পারবে।
তথ্যসূত্র
