মনজুরুল কবির
জাতিসংঘ
গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে সামাজিক ও মানবিক অপরাধ, যার মধ্যে নারীর প্রতি সহিংসতা, মানব পাচার, গণপিটুনি ও সাম্প্রদায়িক অস্থিরতাও রয়েছে, এসবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রেই বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গির আগে রাজনৈতিক বিবেচনার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা অনেক মামলা ধীরগতিতে এগিয়েছে, স্থানীয় পর্যায়ে কার হাতে ক্ষমতা রয়েছে তার ওপর তদন্তের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করেছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অগ্রাধিকারও বদলে গেছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় অনুযায়ী।
এই প্রবণতা কোনো একটি সরকার বা নির্দিষ্ট কোনো দলের সময় থেকে শুরু হয়নি, আবার কোনো একটি দলের মধ্যেও সীমাবদ্ধ ছিল না। তবে দুই দশকের বেশি সময় ধরে এমন চর্চার সম্মিলিত প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়েছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে বাংলাদেশে বিচার নিশ্চিত কোনো অধিকার নয়, বরং তা নির্ভর করে ক্ষমতার সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠতা রয়েছে তার ওপর। অপরাধের গুরুত্ব বা প্রমাণের শক্তির চেয়ে ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কই যেন অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো দলকে দায়ী করা নয়। বরং বিষয়টিকে আরও গভীরভাবে এবং সৎভাবে আলোচনায় আনা, যাতে দলীয় দোষারোপের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথ খুঁজে বের করা যায়।
রাজনৈতিক পক্ষপাত কীভাবে প্রতিরোধ ও বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে
অপরাধ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন দ্রুত ও ধারাবাহিক হস্তক্ষেপ। আর বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ আইনি ব্যবস্থা। রাজনৈতিক পক্ষপাত এই দুই ক্ষেত্রকেই দুর্বল করেছে।
স্থানীয় পুলিশে পদায়ন, পদোন্নতি ও মামলা পরিচালনার সঙ্গে যখন রাজনৈতিক আনুগত্যের সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন কর্মকর্তাদের ওপর রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রক্ষা করার চাপ তৈরি হয়। এর ফলে সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে সহিংসতা ও মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিরা অনেক সময় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। বিপরীতে, রাজনৈতিক সুরক্ষা নেই এমন অপেক্ষাকৃত কম প্রভাবশালী অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত, কখনো কখনো অতিরিক্ত কঠোর ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
এই বৈষম্য শুধু নির্দিষ্ট কিছু ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথকে বাধাগ্রস্ত করেনি। পুরো সমাজের কাছেই একটি বার্তা গেছে যে অপরাধের পরিণতি সবসময় অপরাধের ধরন বা গুরুত্বের ওপর নির্ভর করে না, বরং অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় ও যোগাযোগও সেখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
দীর্ঘ সময়ে এই পরিস্থিতি অপরাধ দমনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, অর্থাৎ শাস্তির ভয় বা নিবৃত্তিমূলক প্রভাব, দুর্বল করে দিয়েছে। মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে আইনের আওতায় পড়া বা না পড়া অনেক সময় নির্ভর করে কার সঙ্গে যোগাযোগ আছে তার ওপর।
প্রকৃত ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক প্রচারণাকে আলাদা করা জরুরি
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিষ্ক্রিয়তার প্রতিটি অভিযোগ যে সত্য, তা নয়। আবার দলীয় স্বার্থে কোনো কোনো ঘটনা অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হয়। তাই প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা এবং রাজনৈতিক প্রচারণার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।
অতীতে বিরোধী দলগুলো অনেক সময় বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দলগুলো প্রকৃত পক্ষপাতের ধারাবাহিকতাকেও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। দুই ধরনের প্রবণতাই দীর্ঘমেয়াদি জননিরাপত্তার স্বার্থের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়।
প্রকৃত চিত্র বোঝার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো একই ধরনের মামলার ফলাফল রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে তুলনা করা। তদন্ত শেষ করতে কত সময় লাগছে, গ্রেপ্তারের হার কত, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার কেমন এবং কোনো সন্দেহভাজনের রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে এসব সূচকে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হচ্ছে কি না, এসব তথ্য নিয়মিতভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোনো পক্ষের বেছে নেওয়া ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন অভিযোগের ওপর নির্ভর না করে তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নই হতে পারে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ।
সাফল্য কীভাবে পরিমাপ করা হবে
এই ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের সাফল্য সংবাদ সম্মেলন বা প্রতীকী পদক্ষেপ দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং প্রয়োজন যাচাইযোগ্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কিছু সূচক। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো সন্দেহভাজনের রাজনৈতিক পরিচয় তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার সময়সীমাকে প্রভাবিত করছে কি না; মানুষের আস্থা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুক্তভোগীরা বেশি হারে অভিযোগ জানাতে আগ্রহী হচ্ছেন কি না; এবং গুরুতর সামাজিক অপরাধের ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ওঠানামা করছে কি না।
একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মকর্তা প্রমাণের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় কাজ করেছেন বলে প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।
একবার জনআস্থা নষ্ট হয়ে গেলে তা ফিরিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ। ধারাবাহিক ও দৃশ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেই আস্থা পুনর্গঠন করতে হয়। সংস্কারের প্রকৃত পরীক্ষা তাই ঘোষণা বা প্রতিশ্রুতিতে নয়, দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে কাজ করছে তার মধ্যেই নিহিত।
আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারের করণীয়
জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু আশ্বাস নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন। পুলিশে পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে, যাতে স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ এসব সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে না পারে। অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের ব্যবস্থায় স্বাধীন তদারকি থাকতে হবে, যাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা দেখা দিলে তা চিহ্নিত ও মোকাবিলা করা যায়।
সামাজিক অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের জন্য নিরাপত্তা ও সহায়তার ব্যবস্থা এমন হতে হবে, যা অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ওপর নির্ভর করবে না। একইভাবে, রাজনৈতিক চাপ বা প্রতিক্রিয়ার ভয় ছাড়াই মামলা পরিচালনা করতে সক্ষম একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রসিকিউশন ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
কোনো একটি নীতিগত ঘোষণা দিয়ে এসব পরিবর্তন সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বছরের পর বছর ধরে ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ, যা মানুষ নিজের চোখে দেখতে পারে এবং যার ওপর ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি করতে পারে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পুলিশের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ
বর্তমান সময়ে সতর্ক আশাবাদের কিছু কারণও রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পুলিশ নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রমকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার দিকে কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে অভিযোগ গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও মানসম্মত করার উদ্যোগ এবং কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্য। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে পুলিশ ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে আরও সরাসরি এবং জবাবদিহিমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
কয়েকটি জেলায় দ্রুত সাড়া দেওয়ার প্রবণতা এবং স্থানীয় থানায় যেতে জনগণের নতুন করে আগ্রহ তৈরি হওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এসব পরিবর্তন ইঙ্গিত দেয় যে জনআস্থা, যদিও এখনও ভঙ্গুর, কিছু ক্ষেত্রে পুনর্গঠনের পথে রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগকে পূর্ণাঙ্গ পরিবর্তনের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলোকে সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
জনগণের সহনশীলতা ও সামাজিক সংস্কারের ভূমিকা
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একা সফল হতে পারে না। সমাজকেও এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্রভাবিত চর্চা একটি সরকারের এক মেয়াদেই পুরোপুরি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সংস্কারও জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম, আরও কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং নাগরিকদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে শিক্ষা জোরদার করতে হবে। শুধু সরকারের পদক্ষেপের অপেক্ষায় না থেকে নাগরিক সমাজ, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকেও নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
নাগরিক, স্থানীয় নেতৃত্ব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন একই লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাবে এবং পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও দায়িত্ব ভাগ করে নেবে, তখন বাংলাদেশে সামাজিক ও মানবিক অপরাধ প্রতিরোধ এবং অপরাধের ন্যায়সংগত বিচার কেবল আকাঙ্ক্ষা হয়ে থাকবে না। তা ধীরে ধীরে একটি টেকসই বাস্তবতায় রূপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।
