ড. মুনতাসির ফিরোজ
ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অস্টিন, যুক্তরাষ্ট্র
নতুন সরকারের মেয়াদের ছয় মাস পার হয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র এক অস্বাভাবিক রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। টানা ১৫ বছর দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী থাকা আওয়ামী লীগ এখনও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষিদ্ধ। সংসদের প্রায় প্রতিটি বিতর্কেই সেই অনুপস্থিতির প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে। তিন বছর আগেও এমন রাজনৈতিক বিন্যাসের কথা খুব কম মানুষই ধারণা করেছিলেন।
সংখ্যায় দুর্বল এবং অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত বিরোধী দল গণতন্ত্রকে কতটা শক্তিশালী করতে পারে, এই নিবন্ধে সেই প্রশ্নের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা, সংবিধান সংস্কার এবং স্থানীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা এই আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। নির্বাচনকে মোটের ওপর বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে দেখা হয়েছে। বরং প্রশ্ন হলো, ক্ষমতা কীভাবে অর্জিত হয়েছে তার চেয়ে শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতার জন্য যখন অর্থবহ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা জরুরি হয়ে ওঠে, তখন পরবর্তী পরিস্থিতি কেমন হয়।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন সংসদের হিসাব
সংসদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে বিএনপির বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিরোধী জোটকে সংখ্যার দিক থেকে অনেকটাই কোণঠাসা করেছে। এর বাস্তব ফল হলো, সরকারের উদ্যোগগুলো সংসদে খুব সামান্য বাধা ও আরও কম যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে পাস হচ্ছে।
বিশ্বাসযোগ্য পাল্টা শক্তি ছাড়া কোনো সংসদ অনেক সময় বিরোধিতার অনুপস্থিতিকে ঐকমত্যের উপস্থিতি বলে ভুল করতে পারে। নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশের প্রথম দিককার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তেমন প্রবণতারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
দীর্ঘস্থায়ী চাপ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
বিশ্লেষক ও স্বতন্ত্র আইনপ্রণেতাদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি খুব সামান্য। নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে শত শত অপহরণ ও গুম এবং হাজার হাজার হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ও ঘটনা সামনে এসেছে।
আগের সরকারের কাছ থেকে পাওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর কাঠামোগত সংস্কারও খুব সীমিত। পুরোনো ব্যবস্থার প্রতি সহানুভূতিশীল আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠীর একটি অংশ এখনও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে রয়েছে বলেও ধারণা করা হয়। বাইরে থেকে তারা সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করলেও সংস্কারের ক্ষেত্রে নীরব প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারে।
কার্যকর বিরোধী রাজনৈতিক পরিবেশ থাকলে এমন ব্যর্থতা সংসদে ধারাবাহিক চাপ তৈরি করত এবং মন্ত্রীদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সমালোচনার বড় অংশ আসছে স্বতন্ত্র কণ্ঠ, নাগরিক সমাজ ও বিরোধী নেতাদের কাছ থেকে। সংসদে তাদের সংখ্যাগত শক্তি এতটাই সীমিত যে সরকারের ওপর কার্যকর চাপ তৈরি করা কঠিন।
সংবিধান সংস্কার কোন পথে?
সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রেও একই উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৭ জন ভোটার জুলাই জাতীয় সনদের সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছেন। ফলে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য জনগণের কাছ থেকে স্পষ্ট ম্যান্ডেট পাওয়া গেছে।
কিন্তু বাস্তবায়নের গতি জনসাধারণের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও হতাশা বাড়ছে।
দুর্বল বিরোধী শক্তি এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। একদিকে সময়মতো ও স্বচ্ছ সংস্কারের জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক চাপ প্রয়োজন, তা কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষের কঠোর পর্যালোচনা না থাকায় সংস্কার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানের বদলে ক্ষমতাসীন দলের সুবিধামতো পরিবর্তনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বাস্তব রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া সংস্কার এমন এক সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, যার সংশোধনের লক্ষ্যেই হয়তো সংস্কার আনা হয়েছিল। আগের সরকারের হাতে নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার অভিজ্ঞতা যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের কাছে এই পরিণতি মোটেই অচেনা নয়।
স্থানীয় অর্থনীতিতে স্থবিরতার চিত্র
জবাবদিহির অভাব স্থানীয় অর্থনীতিতেও একই ধরনের স্থবিরতার চিত্র তৈরি করছে। নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে জ্বালানি সংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিং বড় জনঅসন্তোষের কারণ হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বেকারত্ব বাড়ার আশঙ্কা। অথচ নির্বাচনী প্রচারে ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
জ্বালানির দাম বাড়ছে, গ্যাস সরবরাহ এখনও অনিয়মিত এবং জনঅসন্তোষ সংসদে মূলত ব্যঙ্গ ও কটাক্ষের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। শক্তিশালী বিরোধী দল থাকলে যে ধরনের ধারাবাহিক আইনগত ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারত, তার তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন।
এই ধরনের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা রাজনৈতিকভাবে দ্রুত সংশোধন হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে, বিশেষ করে যখন নিষ্ক্রিয়তার রাজনৈতিক মূল্য কম। আর সরকারের সেই মূল্য কম থাকার অন্যতম কারণ হলো, বিরোধী কোনো জোটের হাতে এমন সংখ্যাগত শক্তি নেই, যা সংসদে সরকারের স্বস্তিদায়ক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
একটি শক্তিশালী বিরোধী দল শুধু বাইরে থেকে সরকারের সমালোচনা করে না। বাজেট নিয়ে বিতর্কে প্রভাব ফেলে, মন্ত্রীদের অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য করে এবং জনগণের অভিযোগকে নীতিগত পরিবর্তনে রূপ দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে।
বিরোধী শক্তিই যখন অভ্যন্তরীণ বিভাজনে ব্যস্ত
জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির জোটও জনমনে যথেষ্ট অস্বস্তি তৈরি করছে। ফলে কার্যকর রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় বিরোধী পক্ষের সক্ষমতা আরও দুর্বল হচ্ছে।
একদিকে দীর্ঘ ও বিতর্কিত রাজনৈতিক ইতিহাস থাকা একটি ইসলামপন্থী দল, অন্যদিকে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা তরুণদের নেতৃত্বাধীন একটি রাজনৈতিক আন্দোলন। এমন দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার জোট আদর্শগতভাবে কতটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও পরিষ্কার নয়।
জোট নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির অভ্যন্তরীণ মতবিরোধও সামনে এসেছে। ফলে জোটের ঐক্যকে স্বতঃসিদ্ধ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
নিজেদের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সামলাতেই যদি কোনো বিরোধী দল বেশি ব্যস্ত থাকে, তাহলে সংসদে ধারাবাহিক ও সংগঠিতভাবে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার সক্ষমতা কমে যায়।
উপসংহার
সব দিক বিবেচনায় বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রথম বড় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে বলা যায়, একটি বিশ্বাসযোগ্য ও মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর শাসন নিশ্চিত করার জন্য যে ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রয়োজন, সেই কাঠামো এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে অর্থবহ উন্নতি দেখা যায়নি। এর একটি কারণ হলো, সরকারের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা নীতির ওপর কার্যকর জবাবদিহির চাপ তৈরি করার মতো সংখ্যাগত শক্তি কোনো বিরোধী দলের হাতে নেই। গণভোটে স্পষ্ট জনসমর্থন পাওয়ার পরও সংবিধান সংস্কারের অগ্রগতি জনসাধারণের প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। বিরোধী পক্ষের কার্যকর পর্যালোচনা ও চাপের অভাবও এই ধীরগতির একটি কারণ।
স্থানীয় অর্থনীতিও জ্বালানি সংকট ও বেকারত্বের চাপ সামলাচ্ছে। কিন্তু সংসদে সরকারের ওপর তার রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত। অন্যদিকে বিরোধী শক্তি নিজেই বিভক্ত। একদিকে ইসলামপন্থী দল, অন্যদিকে জোটের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে অস্বস্তিতে থাকা তরুণদের আন্দোলনভিত্তিক দল। ফলে আসনসংখ্যাকে ধারাবাহিক রাজনৈতিক চাপে রূপ দেওয়ার মতো অভ্যন্তরীণ ঐক্যও তাদের মধ্যে এখনও গড়ে ওঠেনি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ব্যর্থ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। তবে নির্বাচনী বৈধতা একা কার্যকর গণতন্ত্রের বিকল্প হতে পারে না। জনগণের ভোটে অর্জিত বৈধতা নিজে থেকেই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সংসদের প্রতিটি অধিবেশনে সেই বৈধতার কার্যকারিতা যাচাই করার মতো শক্তিশালী, সংগঠিত ও দায়িত্বশীল একটি বিরোধী পক্ষও প্রয়োজন।
গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের বিপরীতে প্রশ্ন তোলা, বিকল্প নীতি হাজির করা এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মধ্যে রাখার ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই গণতন্ত্রকে কার্যকর ও টেকসই করে।
