তানজীনা ফেরদৌস
অনিকেত বুলেটিন
শুধু বেতন বাড়ানো নয়, প্রয়োজন একটি টেকসই সরকারি পারিশ্রমিক কাঠামো। বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গ্রেডভেদে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশের মধ্যে এবং নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যভান্ডারে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
কাগজে হিসাবটি আকর্ষণীয়। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের বেতনব্যবস্থার সাফল্য কেবল এই প্রশ্নে মাপা যায় না, বেতন কত শতাংশ বাড়ল? বরং আরও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আনতে হয়। এই বেতন কি একজন সরকারি কর্মচারীর পরিবারের ন্যূনতম জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা দেবে? বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত ও সন্তানের ভবিষ্যৎ ব্যয়ের সম্পর্ক কী? একজন তরুণ মেধাবী চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসক কিংবা প্রযুক্তিবিদকে সরকারি চাকরিতে ধরে রাখার মতো প্রতিযোগিতামূলক পারিশ্রমিক কি তৈরি হবে? অবসর নেওয়ার পরও কি সেই কর্মচারীর ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষিত থাকবে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, রাষ্ট্র কি এমন একটি বেতনব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে, যেখানে প্রতি এক দশক পরপর একটি বিশাল বেতন কমিশনের অপেক্ষা করতে হবে না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আসলে নবম পে-স্কেলের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ করবে।
বেতন স্কেল মানেই শুধু মূল বেতন নয়
বাংলাদেশে বেতন নিয়ে আলোচনা প্রায়ই মূল বেতনের অঙ্কে আটকে যায়। অথচ একজন সরকারি কর্মচারীর প্রকৃত আর্থিক অবস্থান নির্ধারিত হয় তাঁর মোট পারিশ্রমিক কাঠামো দিয়ে। মূল বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত সুবিধা, উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা, শিক্ষা সংক্রান্ত সুবিধা, ঝুঁকি বা দায়িত্বভিত্তিক ভাতা, পেনশন এবং অবসর পরবর্তী সুবিধা, সব মিলিয়েই একজন কর্মচারীর প্রকৃত পারিশ্রমিক কাঠামো।
ফলে নতুন পে-স্কেলের মূল্যায়নে শুধু “সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার” অথবা “সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার”, এই দুটি সংখ্যা যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, একজন ২০তম গ্রেডের কর্মচারীর হাতে মাস শেষে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা থাকে এবং তাঁর পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে কত টাকা প্রয়োজন?
একইভাবে প্রথম গ্রেডের একজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে প্রশ্ন হওয়া উচিত, রাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দায়িত্ব, দক্ষতা, জবাবদিহি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার তুলনায় তাঁর মোট পারিশ্রমিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় শ্রমবাজারে কতটা প্রতিযোগিতামূলক?
অর্থাৎ, বেতন কাঠামোর পরবর্তী সংস্কারে মূল বেতন এবং মোট পারিশ্রমিক, দুটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
দশ বছরের ব্যবধান কেন একটি কাঠামোগত সমস্যা
২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল প্রকাশের পর নতুন কাঠামোর জন্য প্রায় এক দশক অপেক্ষা করতে হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের বিভিন্ন কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট আদেশ সংরক্ষিত আছে। এখানেই বাংলাদেশের বেতননীতি নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। বেতন কমিশন কি একটি ঘটনাভিত্তিক ব্যবস্থা হবে, নাকি একটি চলমান অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে?
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় সরকারি পারিশ্রমিক ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত পর্যালোচনা, শ্রমবাজারের সঙ্গে তুলনা, কর্মসংস্থান কাঠামো এবং রাজস্ব সক্ষমতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের গবেষণাতেও সরকারি বেতন ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থাপনাকে কেবল বেতন বাড়ানোর বিষয় নয়, বরং আর্থিক পরিকল্পনা, জনসেবা ও প্রতিযোগিতামূলক পারিশ্রমিকের সঙ্গে যুক্ত একটি কাঠামোগত নীতি হিসেবে দেখা হয়েছে।
বাংলাদেশে তাই দশ বছর পরপর একটি বড় বেতন কমিশন গঠন করার পরিবর্তে একটি স্থায়ী বেতন পর্যালোচনা ব্যবস্থা প্রয়োজন। যেখানে প্রতি বছর মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, শ্রমবাজারের মজুরি এবং রাজস্ব সক্ষমতার ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট সমন্বয় হবে। আর প্রতি তিন বা পাঁচ বছর পর হবে পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামোর পুনর্মূল্যায়ন।
এতে হঠাৎ করে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ বেতন বাড়ানোর প্রয়োজন কমবে এবং রাষ্ট্রের ওপর আকস্মিক আর্থিক চাপও কমবে।
৫ শতাংশ বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি কি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
বাংলাদেশের সরকারি বেতন কাঠামোয় বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির ধারণাটি নতুন নয়। ২০১৫ সালের বেতন কাঠামোয়ও গ্রেডভেদে নির্দিষ্ট হারে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক অসামঞ্জস্য রয়েছে। যদি কোনো কর্মচারীর বেতন বছরে ৫ শতাংশ বাড়ে, অথচ একই সময়ে তাঁর জীবনযাত্রার ব্যয় গড়ে তার চেয়ে বেশি হারে বাড়ে, তাহলে কাগজে বেতন বাড়লেও বাস্তবে তাঁর আর্থিক সক্ষমতা কমতে পারে। এখানে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সমন্বয়, দুটিকে আলাদা করতে হবে।
বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি হতে পারে অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও পদোন্নতির প্রতিফলন। আর জীবনযাত্রার ব্যয় সমন্বয় হবে মূল্যস্ফীতির ক্ষতিপূরণ। দুটিকে এক করে ফেললে কর্মচারীর দক্ষতার মূল্যায়ন এবং মূল্যস্ফীতির ক্ষতিপূরণ, দুটিই দুর্বল হয়ে যায়। তাই ভবিষ্যৎ কাঠামোয় একটি দ্বিস্তরীয় বেতন সমন্বয় ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত: নির্দিষ্ট বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি। দ্বিতীয়ত: মূল্যস্ফীতির ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় জীবনযাত্রার ব্যয় সমন্বয়।
ঢাকার বেতন দিয়ে পুরো বাংলাদেশের জীবন মাপা যায় না
বাংলাদেশের বর্তমান বেতন কাঠামোর আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো, একই গ্রেডের কর্মচারী ঢাকায় এবং প্রত্যন্ত জেলায় একই মূল বেতন পেলেও তাঁর জীবনযাত্রার ব্যয় এক নয়।
আবার কিছু ক্ষেত্রে উল্টো চিত্রও আছে। কোনো কোনো জেলা বা শহরে বাসাভাড়া কম হলেও যাতায়াত, শিক্ষা, চিকিৎসা অথবা নির্দিষ্ট পণ্য ও সেবার ব্যয় তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
তাই ভবিষ্যতের বেতনব্যবস্থায় অঞ্চলভিত্তিক জীবনযাত্রা ভাতা বা আঞ্চলিক জীবনযাত্রার ব্যয়ভিত্তিক ভাতার ধারণা বিবেচনা করা যেতে পারে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, অন্যান্য বড় শহর এবং প্রত্যন্ত বা দুর্গম অঞ্চলের জন্য পৃথক ব্যয় সূচক তৈরি করা সম্ভব।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ভোক্তা মূল্যসূচক, মজুরি হার সূচক এবং বাড়িভাড়া সূচক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বর্তমানে এসব সূচক সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে এবং ২০২১ থেকে ২০২২ ভিত্তিবর্ষে এসব সূচকের পুনর্বিন্যাসও করেছে।
অর্থাৎ, ভবিষ্যতের বেতননীতিতে শুধু “কত টাকা বেতন” নয়, কোন শহরে, কোন ব্যয়পরিবেশে, কত টাকা বেতন, এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই নিবন্ধের দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করব পে-স্কেল ও পেনশন সংস্কারের সঙ্গতি ও সামঞ্জস্য নিয়ে।
