সুমাইয়া হাসি
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
গত এক দশকে বাংলাদেশের বিনোদনজগতে নীরব অথচ গুরুত্বপূর্ণ এক পরিবর্তন ঘটেছে। একসময় সিনেমা হল ও টেলিভিশনের পর্দায় বিনোদনমূলক কনটেন্ট পৌঁছানোর আগে সেন্সর বোর্ডের অনুমোদনের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। এখন সেই জায়গা দখল করেছে মুঠোফোন ও কম্পিউটারের পর্দা, যেখানে নিয়ন্ত্রণের পরিধি অনেকটাই সীমিত। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনলাইন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো এমন এক পথ খুলে দিয়েছে, যার মাধ্যমে প্রচলিত যাচাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে দর্শকের কাছে কনটেন্ট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
শুরুতে বিষয়টি ছিল অনেকটা প্রযুক্তিগত ফাঁকফোকরের মতো। তবে সময়ের সঙ্গে অনেক নির্মাতার কাছে তা পরিণত হয়েছে সচেতন কৌশলে। যে কনটেন্ট সেন্সর বোর্ডের অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা কম, তা এখন মুহূর্তের মধ্যে লাখো দর্শকের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। সেই কনটেন্ট ঘিরে তৈরি বিতর্কও অনেক সময় বিনা খরচের প্রচারণা হিসেবে কাজ করে। গণমাধ্যমের ভেতরে এই প্রবণতাকে আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।
এক দশকের পর্দায় অপরাধ, দুর্নীতি ও বিভাজন
গত এক দশকে বাংলাদেশের ওটিটি নাটক ও ওয়েব চলচ্চিত্রে এমন অনেক বিষয় উঠে এসেছে, যেগুলো একসময় মূলধারার বিনোদনে অতিসংবেদনশীল বলে বিবেচিত হতো। সংগঠিত অপরাধ, হেফাজতে নির্যাতন, রাজনৈতিক দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং পারিবারিক সহিংসতার মতো বিষয় এখন অনেক বেশি খোলামেলাভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। এর বড় একটি অংশের পেছনে রয়েছে অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে সামনে আনার প্রকৃত শিল্পীসুলভ আকাঙ্ক্ষা। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম যে বিষয়গুলো দীর্ঘদিন এড়িয়ে গেছে, সেসব নিয়েও কথা বলার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
তবে একই সঙ্গে এমন কিছু কনটেন্টও তৈরি হচ্ছে, যেখানে গল্প বলার চেয়ে চমক সৃষ্টি করাই যেন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্যাতনের দৃশ্য কখনো কখনো এমন দীর্ঘ ও বিস্তারিতভাবে দেখানো হয়, যার জন্য গল্পের প্রয়োজনীয়তা খুঁজে পাওয়া কঠিন। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাকে কখনো এমন দাপুটে চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়, যা প্রশংসার অনুভূতিও তৈরি করতে পারে। আবার সাম্প্রদায়িক কিংবা শ্রেণিগত বিভাজন এমনভাবে উপস্থাপিত হয়, যা গভীরতর বোঝাপড়ার বদলে মানুষের আবেগকে উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পর্যালোচনা ব্যবস্থা না থাকায় কোনো দৃশ্য গল্পের প্রয়োজন মেটাচ্ছে, নাকি সামাজিক মাধ্যমে সহজে ছড়িয়ে পড়ার মতো চমক তৈরি করছে, তা যাচাই করার কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তার হিসাবও অনেক সময় এমন কনটেন্টকে উৎসাহিত করে, যা বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে।
মানবাধিকার কোথায় এসে যুক্ত হচ্ছে
এখানেই আলোচনাটি শুধু শিল্পের স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং মানবাধিকারের প্রশ্নও সামনে আসে। কয়েকটি প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
প্রথমত, বাস্তব অপরাধকে কেন্দ্র করে নির্মিত অনেক নাটক ও চলচ্চিত্রে প্রকৃত ভুক্তভোগী এবং অপরাধীদের জীবনকে খুব সামান্য সম্মতি বা মর্যাদা রক্ষার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে উপস্থাপন করা হয়। ফলে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা আবারও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন। ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি পরিণত হয় বিনোদনের উপকরণে।
দ্বিতীয়ত, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং হেফাজতে নির্যাতনের মতো গুরুতর বিষয় অনেক সময় যথাযথ প্রেক্ষাপট, পরিণতি বা অপরাধীর জবাবদিহি ছাড়াই দেখানো হয়। ফলে দর্শকের কাছে এসব ঘটনাকে নিন্দনীয় অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠার বদলে কখনো কখনো স্বাভাবিক বা বিনোদনমূলক বিষয় হিসেবে গ্রহণ করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তৃতীয়ত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নারীদের কখনো কখনো সরলীকৃত, একপেশে কিংবা নেতিবাচক ধারণা জোরদার করে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়। ফলে সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য ও কুসংস্কার আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
যখন কোনো কনটেন্টকে সেন্সর বোর্ডের আপত্তি এড়ানোর উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে তৈরি করা হয়, তখন প্রশ্নটা শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নয়। বরং সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয়, ব্যক্তিগত বেদনা ও অভিজ্ঞতাকে সুরক্ষা ছাড়া বাণিজ্যিক বিনোদনে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
কনটেন্ট রেটিং কি যৌক্তিক সমাধান?
সেন্সরশিপ ও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীনতার মাঝামাঝি একটি পথ হিসেবে অনেকেই স্বেচ্ছামূলক কনটেন্ট রেটিং ব্যবস্থা চালুর কথা বলেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলচ্চিত্র ও বিনোদনমূলক কনটেন্টে এমন ব্যবস্থা চালু আছে। এর কিছু যৌক্তিকতা রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকের নিজস্ব পছন্দের স্বাধীনতা বজায় রাখার পাশাপাশি অভিভাবক ও ঝুঁকিপূর্ণ দর্শকদের নির্দিষ্ট কনটেন্ট থেকে দূরে থাকার সুযোগ দেওয়া যায়।
তবে শুধু রেটিং ব্যবস্থা দিয়ে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো সম্ভব নয়। বাস্তব অপরাধের শিকার মানুষের জীবন ও ঘটনা তাদের সম্মতি ছাড়া নাটক বা চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হলে রেটিং ব্যবস্থা তাদের সুরক্ষা দিতে পারে না। একইভাবে, গণমাধ্যমে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি এবং তার প্রভাব নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় যে উদ্বেগ উঠে এসেছে, সেখানেও শুধু রেটিং যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে পরিবারের সবার ব্যবহৃত একই মুঠোফোন, কম্পিউটার বা টেলিভিশনের মাধ্যমে কিশোররা সহজেই প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নির্ধারিত কনটেন্টে পৌঁছে যেতে পারে।
কনটেন্ট রেটিং দর্শকের পছন্দের স্বাধীনতাকে সহায়তা করতে পারে। তবে নৈতিক নির্মাণনীতি, ভুক্তভোগীর অধিকার রক্ষা এবং আইনি জবাবদিহির বিকল্প হিসেবে রেটিং ব্যবস্থা কাজ করতে পারে না।
বাস্তব অপরাধ দেখানো কি অপরাধ কমায়, নাকি তা আকর্ষণীয় করে তোলে?
বাস্তব অপরাধভিত্তিক গল্পের সমর্থকেরা যুক্তি দেন, অপরাধ, দুর্নীতি ও অপরাধীচক্রকে পর্দায় তুলে ধরার মাধ্যমে সমাজের মানুষ এসব বিষয়ে সচেতন হয় এবং সংস্কারের জন্য জনমত তৈরি হয়। এই যুক্তির কিছু ভিত্তিও রয়েছে। কিছু নাটক ও চলচ্চিত্র সত্যিই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নিয়ে জনপরিসরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা তৈরি করেছে।
তবে অনেক ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের উপস্থাপনা সেই উদ্দেশ্যের বিপরীত ফলও তৈরি করতে পারে। যখন সহিংসতাকে নান্দনিক ও আকর্ষণীয় করে দেখানো হয়, অপরাধীদের ব্যক্তিত্বময় ও আকর্ষণীয় চরিত্র হিসেবে তুলে ধরা হয় এবং অপরাধের পরিণতি আড়াল করে গল্পের উত্তেজনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন দর্শকের কাছে অপরাধ সতর্কবার্তার বদলে আকর্ষণীয় বা অনুসরণযোগ্য বলেও মনে হতে পারে।
গণমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সহিংসতার পুনরাবৃত্তি এবং তা আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা দর্শকের সংবেদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে সহজে প্রভাবিত হয় এমন দর্শকদের মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণের প্রতি সহনশীলতা বাড়ার সঙ্গে এমন কনটেন্টের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অস্বস্তিকর সত্য হলো, অপরাধভিত্তিক নির্মম ও বাস্তবধর্মী কনটেন্টের মাধ্যমে কিছু দর্শক হয়তো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা সম্পর্কে জানতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সেই কনটেন্ট অপরাধ ও নৈতিক সীমালঙ্ঘনকে এমনভাবে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে, যাতে মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার মতো নীরব অথচ কঠিন কাজগুলো তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।
সরকার কী করতে পারে
ডিজিটাল যুগের জন্য পুরোনো সেন্সর বোর্ডকে নতুন করে ফিরিয়ে আনা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং দায়িত্বশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
প্রথম ধাপে সরকার স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি যৌথ নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। বিশেষ করে বাস্তব অপরাধ, ভুক্তভোগী এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কী ধরনের নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে, সেই বিষয়ে কার্যকর ও প্রয়োগযোগ্য নির্দেশনা প্রণয়ন করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, বাস্তব ভুক্তভোগীদের জীবন বা ঘটনা অবলম্বনে কোনো কনটেন্ট তৈরি হলে তাদের সম্মতি এবং মর্যাদা সুরক্ষার বিষয়টি আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। শোষণমূলক বা অসম্মানজনকভাবে ভুক্তভোগীর গল্প ব্যবহারের ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে জাতীয় পর্যায়ে গণমাধ্যম সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে, তারা যে সহিংসতা, অপরাধ ও নৈতিক বার্তা দেখছে, সেগুলো কীভাবে সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তরুণ দর্শকদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়, তাদের সচেতন দর্শক হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে।
এই পদক্ষেপগুলো একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে সৃজনশীল স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখেই বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান গল্প বলার জগতকে আরও দায়িত্বশীল পথে নেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে নিশ্চিত করা যাবে, যে মাধ্যম মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলছে, সেই মাধ্যমের বিকাশ যেন শেষ পর্যন্ত মানুষের অধিকার, ব্যক্তিগত মর্যাদা ও ভুক্তভোগীর নিরাপত্তার বিনিময়ে না হয়।
