ডেস্ক রিপোর্ট
বাংলাদেশের তথ্য ও সংবাদ পরিবেশে গত কয়েক বছরে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ইউটিউবে নিজেদের সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচয় দেওয়া অসংখ্য চ্যানেল গড়ে উঠেছে। এসবের অনেকগুলোই কোনো সুস্পষ্ট সম্পাদকীয় নীতিমালা, তথ্যসূত্র যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কিংবা কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।
শুরুতে এই প্রবণতাকে গণমাধ্যমে প্রবেশের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে গণতন্ত্রায়নের একটি সম্ভাবনাময় দিক হিসেবে দেখা হয়েছিল। ধারণা ছিল, প্রচলিত গণমাধ্যমে প্রবেশের বাধা কমবে এবং আরও বেশি মানুষ সংবাদ পরিবেশনের সুযোগ পাবেন। কিন্তু উদ্বেগজনক সংখ্যক ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা এখন এমন এক ব্যবসায়িক মডেলে রূপ নিয়েছে, যেখানে জনস্বার্থের পরিবর্তে মুনাফাই প্রধান লক্ষ্য। বানানো ক্ষোভ, যাচাইহীন বা সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাকে ব্যবহার করে দর্শক টানা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।
ভাইরাল হওয়ার অর্থনীতি
এই প্রবণতার মূল চালিকাশক্তি অর্থনীতি। ইউটিউবের বিজ্ঞাপন আয়ের একটি বড় অংশ মার্কিন ডলারে পরিশোধ করা হয়। মুদ্রার ওপর চাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো বাস্তবতার মধ্যে থাকা বাংলাদেশের কনটেন্ট নির্মাতাদের কাছে একটি ভাইরাল ভিডিও থেকে ডলারে আয় করা শক্তিশালী প্রণোদনা হিসেবে কাজ করছে।
চটকদার শিরোনাম, সম্পাদিত বা বিকৃত ছবি এবং মনগড়া ‘জরুরি সংবাদ’ প্রচার অনেক সময় সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রতিবেদনের তুলনায় বেশি দর্শক ও প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। আর বিজ্ঞাপননির্ভর ব্যবস্থায় দর্শকের সম্পৃক্ততাই সবচেয়ে বেশি পুরস্কৃত হয়।
ফলে নির্ভুলতার চেয়ে দ্রুততা ও চমককে অগ্রাধিকার দেওয়ার সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা তৈরি হচ্ছে। যে চ্যানেলের কোনো সংবাদকক্ষ নেই, প্রকাশিত তথ্যের জন্য আইনি দায় নেওয়ার স্পষ্ট ব্যবস্থা নেই এবং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সুনামও নেই, তাদের কাছে একটি মিথ্যা তথ্য ভাইরাল হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। বরং লাভের সম্ভাবনাই বেশি।
বিনোদন থেকে রাজনৈতিক হাতিয়ার
এই সংকটকে নিছক অর্থনৈতিক প্রবণতার চেয়ে বড় করে তুলেছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একই ব্যবস্থাকে ব্যবহার করার সুযোগ। শুধু বিজ্ঞাপন আয় করার জন্য তৈরি অনেক চ্যানেল ধীরে ধীরে সমন্বিত অপতথ্য ছড়ানোর মাধ্যম হয়ে উঠছে। জনপরিচিত ব্যক্তিদের নামে মনগড়া বক্তব্য প্রচার, পুরোনো বা বিকৃত ভিডিওকে সরাসরি সম্প্রচারিত ঘটনার দৃশ্য হিসেবে দেখানো এবং ষড়যন্ত্রের নানা গল্প ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন, বিক্ষোভ কিংবা জাতীয় সংকটের মতো উত্তেজনাপূর্ণ সময়কে সামনে রেখে এসব প্রচারণা আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
এসব চ্যানেল প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন বা সম্প্রচার অনুমোদন ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সংশোধনী প্রকাশ, ভুল তথ্য প্রত্যাহার কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয় না। ফলে কোনো মিথ্যা রাজনৈতিক বক্তব্য দিনের পর দিন ছড়িয়ে পড়তে পারে, অথচ তার প্রতিবাদ বা সত্য তথ্য একই পরিমাণ দর্শকের কাছে পৌঁছাতে অনেক বেশি সময় লাগে।
মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি
ভুল তথ্য ছড়ানোর ক্ষতি শুধু তথ্যগত বিভ্রান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীর সামাজিক ও মানসিক প্রভাবও রয়েছে। সংবাদ গ্রহণের ধরন নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় এমন এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরির প্রভাবের কথা উঠে এসেছে, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে উদ্বেগজনক ও যাচাইহীন তথ্যের সংস্পর্শে থাকলে ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের মধ্যে স্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। সচেতনতা বাড়ার বদলে তৈরি হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ।
যখন এসব তথ্যের বড় অংশ শুধু নেতিবাচক নয়, বরং সম্পূর্ণ মনগড়া, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। মানুষ একদিকে বাস্তবে কী ঘটছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ধারণা হারায়, অন্যদিকে বৈধ ও বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যমসহ কোনো উৎসের ওপরই আস্থা রাখা যায় কি না, সেই প্রশ্নও তৈরি হয়।
আস্থার এমন ক্ষয় শুধু গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার সমস্যা নয়। জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণের জন্যও তা গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের কারণ। কোনো জনগোষ্ঠী যখন যাচাই করা তথ্য ও পরিকল্পিত আতঙ্কের মধ্যে নির্ভরযোগ্যভাবে পার্থক্য করতে পারে না, তখন মানুষের উদ্বেগ বাড়ে, সমাজে বিভাজন তীব্র হয় এবং সম্মিলিতভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
শুধু গণমাধ্যম সচেতনতা দিয়ে কেন সমাধান হবে না
নাগরিকদের তথ্যসূত্র যাচাই করতে বলা কিংবা চটকদার ও উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্ট থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া সাধারণ প্রতিকার হিসেবে সামনে আসে। তবে এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে সমস্যার মানসিক ক্ষতি কমাতে কতটা সক্ষম, তার পক্ষে এখনো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট এড়িয়ে চলার তুলনায় শুধু গণমাধ্যম সচেতনতার প্রশিক্ষণ মানুষের ওপর তার মানসিক ক্ষতি কতটা কমাতে পারে, সে বিষয়ে প্রমাণও সীমিত। ফলে জনসচেতনতা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু তার ওপর নির্ভর করে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। প্ল্যাটফর্ম এবং নিয়ন্ত্রক পর্যায়ে কাঠামোগত উদ্যোগও প্রয়োজন।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য নীতিগত উদ্যোগের প্রয়োজন
এই বাস্তবতায় নতুন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর সামনে জনসচেতনতা কর্মসূচির পাশাপাশি কাঠামোগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ এবং দায়িত্ব দুটোই রয়েছে।
একটি বিশ্বাসযোগ্য নীতিকাঠামোর আওতায় নির্দিষ্ট সংখ্যক গ্রাহক বা দর্শক অতিক্রম করা আয়ভিত্তিক সংবাদধর্মী ইউটিউব চ্যানেলগুলোর বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রকাশিত কনটেন্টের জন্য একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়বদ্ধ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে দ্রুত তথ্য যাচাইয়ের জন্য একটি বিশেষ ইউনিট গঠন করা যেতে পারে। এই ইউনিট কয়েক দিনের পরিবর্তে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করে জনসমক্ষে সংশোধনী প্রকাশ এবং মিথ্যা কনটেন্ট চিহ্নিত করতে সক্ষম হবে। কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীন তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। শুধু ঘটনার পরে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর নির্ভর করলে চলবে না।
পাশাপাশি ইউটিউব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের নামে বানানো বক্তব্য কিংবা বিকৃত ভিডিও প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেলে দ্রুত সেই কনটেন্ট সরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে কীভাবে এবং কোন ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে নিয়মিত জনসমক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি। ফলে নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াটিও যেন স্বেচ্ছাচারী না হয়ে জবাবদিহির আওতায় থাকে।
শৃঙ্খলা ও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের মাঝের সীমারেখা
তবে এমন কোনো কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। মিথ্যা প্রচারণা সরানোর জন্য তৈরি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যথাযথ সীমারেখা ছাড়া প্রয়োগ করা হলে বৈধ সমালোচনা, ভিন্নমত কিংবা স্বাধীন সাংবাদিকতাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
একটি টেকসই নীতিতে যাচাইযোগ্য মিথ্যাচার এবং মতামত, ব্যঙ্গ কিংবা সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকতে হবে। বিকৃত ভিডিও কিংবা মনগড়া বক্তব্যের মতো প্রমাণযোগ্য মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এক বিষয়, আর সরকারের সমালোচনা বা ভিন্নমত প্রকাশকে দমন করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তের ওপর স্বাধীন নজরদারির ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় নিয়ন্ত্রণের কাঠামো রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
নিয়ন্ত্রণহীন ও মুনাফানির্ভর ইউটিউব সংবাদ চ্যানেলের উত্থান অর্থনৈতিক প্রণোদনা ও রাজনৈতিক সুযোগের এক বাস্তব সংযোগকে সামনে এনেছে। এর সামাজিক মূল্যও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে, মানুষের আস্থা কমছে, উদ্বেগ বাড়ছে এবং তথ্যের সত্যতা নিয়ে বিভ্রান্তি গভীর হচ্ছে।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের সামনে এখন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। তবে সেই সাফল্য নির্ভর করবে কতটা নির্ভুল ও স্বচ্ছভাবে মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় তার ওপর। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের প্রয়োজনীয় স্বাধীন, সমালোচনামূলক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জন্য পর্যাপ্ত পরিসরও নিশ্চিত করতে হবে।
তথ্যসূত্র:
