ফারজানা নূপুর
স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়
নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এমন এক মুখ পেয়েছিল, যার পোস্টার দেখেই দর্শক সিনেমা হলে ছুটে যেতে প্রস্তুত ছিল। চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, যিনি সালমান শাহ নামেই বেশি পরিচিত, ১৯৯৩ সালে কেয়ামত থেকে কেয়ামত ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন। মাত্র তিন বছরের মতো সময়ের মধ্যে তিনি পর্দায় বাংলাদেশের নায়ক চরিত্রের প্রচলিত ধারণাই বদলে দেন। দীর্ঘদিন ধরে আবেগনির্ভর কাহিনি, অতিনাটকীয়তা ও বড় পরিসরের বীরত্বনির্ভর চরিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ঢালিউডে তিনি নিয়ে আসেন অপেক্ষাকৃত কোমল, আধুনিক শহুরে ও রোমান্টিক এক নায়কসত্তা।
মৌসুমী এবং পরে শাবনূরের সঙ্গে তাঁর জুটি নব্বইয়ের দশকের সবচেয়ে ব্যবসাসফল প্রেমের গল্পগুলোর কয়েকটি উপহার দেয়। তাঁর পোশাক, চুলের স্টাইল এবং পর্দায় উপস্থিতির ধরনও সারা দেশের তরুণদের মধ্যে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
সালমান শাহর তারকাখ্যাতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর অভাবনীয় গতি। তিন বছরেরও কম সময়ে তিনি প্রায় ৩০টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, যার বেশির ভাগই ছিল ব্যবসাসফল। সেই সময় ঢালিউডের সামনে ভারত ও পাকিস্তানের স্যাটেলাইট টেলিভিশনের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমন এক সময়ে একজন নির্ভরযোগ্য তারকার প্রয়োজন ছিল, যিনি দর্শক টানতে পারবেন। সালমান শাহ সেই জায়গাটি পূরণ করেছিলেন। তিনি আধুনিকতার সঙ্গে বাংলাদেশের দর্শকের প্রত্যাশিত আবেগকে মিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন। এক প্রজন্মের দর্শকের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এমন এক চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতীক, যে শিল্প সাময়িকভাবে হলেও আন্তর্জাতিক মানের তারকা তৈরির সক্ষমতা দেখিয়েছিল।
কিন্তু সেই সম্ভাবনার যাত্রা হঠাৎ থেমে যায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ঢাকার নিউ ইস্কাটনের বাসায় ২৪ বছর বয়সে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় সালমান শাহকে। তাঁর স্ত্রী পুলিশকে জানান, ড্রেসিংরুমে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাটি আত্মহত্যা, নাকি আত্মহত্যা হিসেবে সাজানো হত্যাকাণ্ড, সেই প্রশ্ন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সামনে আসে।
যে মামলা শেষ হয় না
তিন দশক পেরিয়ে গেলেও মামলাটির আইনি নিষ্পত্তি হয়নি। তাঁর মতো জনপ্রিয় একজন তারকার মৃত্যুর ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ সময় ধরে মামলা অমীমাংসিত থাকা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী ঘটনা। ২০২০ সালে তদন্তকারীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান, পারিবারিক বিরোধ ও ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের জেরে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন। পরের বছর একজন ম্যাজিস্ট্রেট সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তবে তাঁর পরিবার কখনো সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি।
২০২৫ সালের অক্টোবরে একজন দায়রা জজ পরিবারের আবেদন গ্রহণ করে মামলাটি পুনরায় খোলার নির্দেশ দেন এবং হত্যাকাণ্ড হিসেবে নতুন করে তদন্তের আদেশ দেন। এর ফলে আগের সিদ্ধান্ত কার্যত নতুন তদন্তের মুখে পড়ে। এরপর তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে, আবার থমকেও গেছে। বহু বছর ধরে পলাতক থাকা ডন নামে পরিচিত এক অভিযুক্ত অভিনেতাকে ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার করা হয়। ফলে দীর্ঘদিনের এই রহস্যের সমাধান নিয়ে নতুন করে আশার সৃষ্টি হয়।
তদন্তকারীরা নতুন করে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের জন্য সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতিও আদালত থেকে পেয়েছেন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করাই এই নতুন উদ্যোগের লক্ষ্য। তবু তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা না পড়ায় আদালত একাধিকবার সময় বাড়িয়েছেন। নতুন কোনো সূত্র সামনে আসে, আশার জন্ম দেয়, তারপর আবার প্রক্রিয়াগত জটিলতায় তদন্ত থেমে যায়। দীর্ঘদিনের এই চক্র এখন মামলার ট্র্যাজেডির মতোই এর অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
বিচার ও চলচ্চিত্রের মাঝের শূন্যতা
সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্যের দীর্ঘস্থায়ী অমীমাংসিত অবস্থা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের বিষয় নয়। এর প্রভাব পুরো চলচ্চিত্রশিল্পের ওপর পড়েছে। একজন শিল্পের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকাও যদি এমনভাবে হারিয়ে যান এবং রাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর মৃত্যুর একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সময়োপযোগী ব্যাখ্যা দিতে না পারে, তাহলে সেই শিল্পের মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই আস্থার সংকট তৈরি হয়।
তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হলে অভিনেতা, প্রযোজক ও কলাকুশলীদের মধ্যে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। একই সঙ্গে চলচ্চিত্রশিল্প ও তার সঙ্গে যুক্ত বিচারব্যবস্থা তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে। প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার এই ক্ষয়ের বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্য আছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, বিমা সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আকর্ষণের জন্য যে আস্থা একটি চলচ্চিত্রশিল্পের প্রয়োজন, সেই আস্থাও এতে দুর্বল হয়ে পড়ে।
সালমান শাহর মৃত্যুর সঙ্গে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যা হারিয়েছে, তা শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক নয়। হারিয়েছে একটি সম্ভাবনাময় সৃজনশীল ধারাও। এমন এক সময়ে তিনি সংযত আবেগনির্ভর অভিনয়কে ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তার সঙ্গে মিলিয়েছিলেন, যখন বিদেশি চলচ্চিত্র ও বিনোদনমাধ্যমের প্রতিযোগিতার মধ্যে টিকে থাকতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের নতুন ধরনের নায়ক ও নতুন গল্পের প্রয়োজন ছিল।
পরবর্তী সময়ে খুব কম অভিনেতাই তাঁর মতো বাণিজ্যিক সাফল্যের সঙ্গে আধুনিক ও আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ তারকা ভাবমূর্তি একসঙ্গে তৈরি করতে পেরেছেন। বরং চলচ্চিত্রশিল্প ক্রমেই ছকবাঁধা অ্যাকশনধর্মী ছবি ও পুনর্নির্মাণের দিকে বেশি ঝুঁকেছে। একটি নতুন সৃজনশীল পরিচয়কে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সমমানের তারকার অভাবও এর অন্যতম কারণ হিসেবে আলোচিত হয়েছে।
মামলার দীর্ঘসূত্রতা চলচ্চিত্রশিল্পকে শুধু একটি আইনি সমাপ্তি থেকে বঞ্চিত করছে না, বঞ্চিত করছে একটি প্রয়োজনীয় গল্পের পরিণতি থেকেও। সিনেমা এমন এক শিল্প, যেখানে ভয়হীনভাবে গল্প বলা জরুরি। অথচ সেই শিল্পের সবচেয়ে প্রিয় তারকার নিজের গল্পই এখনো আটকে আছে আইনি ও তদন্তগত অনিশ্চয়তার মধ্যে।
তদন্তের এমন একটি পরিণতি না আসা পর্যন্ত, যা তাঁর পরিবার ও সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বলে গ্রহণযোগ্য হবে, সালমান শাহর উত্তরাধিকার তাঁর অসাধারণ ও উজ্জ্বল স্বল্পস্থায়ী ক্যারিয়ারের পাশাপাশি তাঁর মৃত্যুর রহস্য দিয়েও চিহ্নিত হতে থাকবে।
