ডেস্ক রিপোর্ট
গত দুই দশকে বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী, অভিনেতা, শিল্পী ও লেখকদের একটি ধারাবাহিক স্রোত উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে স্থায়ী হয়েছেন। অভিনেতা টনি ডায়াস ১৯৮৯ সালে মঞ্চনাটকে যুক্ত হন। এরপর শত শত টেলিভিশন প্রযোজনায় কাজ করেন এবং পর্দার পরিচিত মুখ থাকা অবস্থাতেই যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। গায়িকা রন্টি দাস ২০০৬ সালে ‘ক্লোজআপ ওয়ান’ প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় চতুর্থ হয়ে পরিচিতি পান। পরে চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠ দিয়েছেন, আন্তর্জাতিকভাবে একক গান প্রকাশ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও কাতারসহ বিভিন্ন দেশে গান পরিবেশন করেছেন। তিনিও একসময় বিদেশে পাড়ি জমান। সাধারণত এসব দেশত্যাগকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু শিল্পের দিক থেকে দেখলে, এই চলে যাওয়া অনেক বড় একটি সংকেত।
বাংলাদেশের শিল্পীরা কেন দেশ ছাড়েন
প্রথম কারণ অর্থনৈতিক। বাংলাদেশে সৃজনশীল কাজ থেকে পাওয়া আয় দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জীবন চালানো কঠিন। শিল্পীদের প্রাপ্য সম্মানী বা রয়্যালটি নিয়মিত নয়, জলদস্যুতার মাধ্যমে কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়া এবং অনুমতি ছাড়া সম্প্রচার ও পরিবেশন ব্যাপক, আর কপিরাইট আইনও যথেষ্ট কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয় না। চুক্তির ক্ষেত্রেও লিখিত নথির বদলে মৌখিক সমঝোতা অনেক সময় দেখা যায়। শিল্পীদের জন্য পেনশন বা অবসরকালীন নিরাপত্তার ব্যবস্থাও নেই। পঞ্চাশ বছর বয়সে একজন গায়ক বা অভিনেতা যে আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন, একজন ব্যাংককর্মী সাধারণত সেই পরিস্থিতিতে পড়েন না।
দ্বিতীয় কারণ বঞ্চনা। শিল্পীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অঙ্গনে কাজ পাওয়ার সুযোগ অনেক সময় রাজনৈতিক শিবির ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে। কারা অভিনয়ের সুযোগ পাবেন বা কোন শিল্পীর কাজ কখন প্রচারিত হবে, তার ওপর এসব গোষ্ঠীর প্রভাব থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিনয়ে সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে যৌন হয়রানি ও শোষণের অভিযোগও বহুদিনের, যার শিকার মূলত নারীরা। অথচ এসব ঘটনায় জবাবদিহির ব্যবস্থা খুবই সীমিত।
তৃতীয় কারণ সামাজিক। অনেক পরিবার এখনো শিল্পচর্চাকে পেশা হিসেবে না দেখে শখ হিসেবে বিবেচনা করে। অর্থ বা বিদেশি স্বীকৃতি পাওয়ার পরই অনেকের সামাজিক মর্যাদা বাড়ে। টনি ডায়াস এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শীর্ষে পৌঁছানো সহজ হলেও সেখান থেকে আরও এগিয়ে যাওয়া কঠিন। একই ধরনের গল্প বারবার করতে থাকায় অভিনয়ও একসময় ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। পরিবারকে তিনি নিজের অগ্রাধিকার হিসেবে দেখেছেন। পেশাগত হতাশা ও ব্যক্তিগত জীবনের অগ্রাধিকার কীভাবে একে অন্যের সঙ্গে মিশে যায়, তারও একটি দিক এখানে দেখা যায়।
আশির ও নব্বইয়ের দশকে কেন এমন ছিল না
আশির ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশন ছিল সারা দেশের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক মঞ্চ। একটি জনপ্রিয় নাটক একজন অভিনেতাকে রাতারাতি ঘরে ঘরে পরিচিত করে তুলতে পারত। চলচ্চিত্রশিল্প ও ক্যাসেটের বাজারও তখন সক্রিয় ছিল এবং শিল্পীদের আয়ের সুযোগ তৈরি করত। ১৯৭১ পরবর্তী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রভাবেও শিল্পচর্চার সঙ্গে নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে দেশ ছাড়াও সহজ ছিল না। বিদেশে যাওয়ার ভিসার সুযোগ সীমিত ছিল, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা কম ছিল এবং বিদেশে থাকা দর্শকদের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর মতো ইন্টারনেটও ছিল না।
দুই হাজার সালের শুরুর দিক থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। পাইরেসির কারণে ক্যাসেটের বাজার ভেঙে পড়ে, একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয় এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বাড়লেও শিল্পীদের পারিশ্রমিক সেই অনুপাতে বাড়েনি। প্রতিভা অন্বেষণভিত্তিক অনুষ্ঠান নতুন শিল্পীর সরবরাহ বাড়িয়েছে, কিন্তু তাদের ধরে রাখার মতো দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত কাঠামো তৈরি হয়নি। একই সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায় বড় হয়েছে, বিদেশে যাওয়ার বিভিন্ন কর্মসূচির সুযোগ বেড়েছে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণও শিল্পের অঙ্গনে সম্পর্ক ও আনুগত্যকে অনেক ক্ষেত্রে দক্ষতার মতো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
দেশ ছাড়ার পর জীবন
বিদেশে পাড়ি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিচিতি সবসময় টিকে থাকে না। টনি ডায়াস এখন যুক্তরাষ্ট্রে নাট্যচর্চা শেখান এবং বাংলাদেশি পণ্যের প্রচারে কাজ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই কাজ তাঁকে নিজের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে সাহায্য করে। অভিনেত্রী মোনালিসা বলেছেন, বিদেশে তিনি নতুন করে জীবন শুরু করেছেন, কিন্তু প্রতিদিনই নিজের দেশ ও পরিবারের জন্য মন কেমন করে। অনেক সংগীতশিল্পী প্রবাসী কমিউনিটির উৎসব ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করেন। পাশাপাশি নিয়মিত চাকরি করে জীবিকা চালান, ফলে শিল্পচর্চা অনেকের কাছেই মূল পেশার বদলে দ্বিতীয় একটি পরিচয়ে পরিণত হয়।
সবচেয়ে নীরবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভাষা। প্রবাসী অনুষ্ঠানে বাংলা টিকে থাকে, কিন্তু সেখানে পরিবেশিত গান অনেক সময় স্মৃতিকাতরতার গণ্ডিতে সীমিত হয়ে পড়ে। বিদেশে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের শিশুরাও স্বাভাবিকভাবেই ইংরেজির দিকে বেশি ঝুঁকে যায়। লেখকদের ক্ষেত্রে বোঝাটা অন্যরকম। কবি তুহিন দাস চরমপন্থীদের হুমকির মুখে দেশ ছেড়ে নির্বাসন থেকে লিখছেন। তাঁর লেখায় বারবার ফিরে আসে নিজের দেশের প্রতি টান। শিল্পীর পরিচিত দর্শক হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টিই হয়তো সবচেয়ে সহজে চোখ এড়িয়ে যায়। দেশে যে করতালি একসময় তাঁর সঙ্গী ছিল, বিদেশের মাটিতে তার জায়গা নেয় অনেক সময় অপরিচিতি।
রন্টি দাসের গানের তালিকা যে চিত্র দেখায়
রন্টি দাসের বিভিন্ন সংগীত পরিবেশনা ও প্রকাশনার তালিকা বর্তমান সময়ের স্বাধীন শিল্পীর জীবনের একটি ছবি তুলে ধরে। স্পটিফাই ও অ্যাপল মিউজিকে ২০১৭ সাল থেকে তাঁর একক গান পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে ‘ডাকাতি’ ও ‘মেঘের দেশে আমার বাড়ি’। ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছে ‘ভুল মানুষ’, ‘অনিকেত’ ও ‘এই এখনই বলোনা যাই’। ২০২৪ সালে কেতন শেখের সঙ্গে করা কয়েকটি দ্বৈত গানসহ আরও কিছু গান প্রকাশিত হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয় ‘ভালোবাসি তোমাকে’। ‘অন্তরঙ্গ’ ও ‘প্রেমের কেন ফাঁসি’র মতো চলচ্চিত্রের গানেও তাঁর কণ্ঠ রয়েছে। তবে প্রকাশনার তালিকায় পূর্ণাঙ্গ কোনো অ্যালবামের দেখা মেলে না। ধারাবাহিকভাবে গান করে যাওয়ার এই চিত্র একজন শিল্পীর সৃজনশীল সক্রিয়তা দেখালেও, শিল্পীর পুরো ক্যারিয়ারকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার মতো কোনো সংগীত প্রকাশনা কাঠামো এখানে চোখে পড়ে না।
সংখ্যাগুলো আরও কঠিন বাস্তবতা সামনে আনে। তথ্য যাচাইয়ের সময় রন্টি দাসের স্পটিফাই পাতায় মাসিক শ্রোতার সংখ্যা ছিল মাত্র নয়জন। অথচ তাঁর ক্যারিয়ারে জাতীয় টেলিভিশনে কাজ, চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠ এবং ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, উপসাগরীয় অঞ্চল ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সংগীত পরিবেশনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংগীত প্ল্যাটফর্মে বাংলা গান বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকে শোনা সম্ভব হলেও সহজলভ্যতা আর শ্রোতা তৈরি হওয়া এক বিষয় নয়। তাঁর প্রকৃত শ্রোতাপরিসর সম্ভবত প্রবাসী দর্শকদের সামনে সরাসরি সংগীত পরিবেশনের মধ্যেই বেশি। শিল্পীরা কেন তাঁদের শ্রোতাদের অনুসরণ করে বিদেশে পাড়ি জমান, সেই বাস্তবতাও এখানে স্পষ্ট হয়।
একটি সমালোচনামূলক ভাবনা
শিল্পীদের দেশ ছাড়ার জন্য শুধু শিল্পখাতকে দায়ী করলে পুরো ছবিটি পাওয়া যাবে না। যারা শিল্প উপভোগ করেন কিন্তু তার মূল্য দিতে চান না, কিংবা কোনো শিল্পী বিদেশে স্বীকৃতি পাওয়ার পরই তাঁর প্রতিভার মূল্য বুঝতে শুরু করেন, দর্শকদেরও সেখানে কিছু দায় রয়েছে। রাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সংস্কৃতিকে অর্থনৈতিক খাত হিসেবে দেখার বদলে অনুষ্ঠান ও আনুষ্ঠানিকতার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। শিল্পীদের পুরস্কার দেওয়া হয়, কিন্তু তাঁদের জন্য কার্যকর আইনি সুরক্ষা বা বার্ধক্যে আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে না।
সমাধানের পথগুলো খুব জটিল নয়। কপিরাইট আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। শিল্পীদের রয়্যালটি সংগ্রহ ও বণ্টনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হবে। শিল্পী নির্বাচন ও চুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নিয়ম চালু করা প্রয়োজন। হয়রানির অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য স্বাধীন প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার। বয়স বাড়ার সঙ্গে শিল্পীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ সহায়তার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
এসব ব্যবস্থা না থাকলে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে কণ্ঠ দেওয়া মানুষগুলো একের পর এক দেশ ছাড়তেই থাকবেন। আর দেশের গান ক্রমেই বেশি শোনা যাবে লং আইল্যান্ড, টরন্টো ও সিডনির মঞ্চ থেকে।
