তানজীনা ফেরদৌস
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, একটি অভিযোগ দ্রুত মানুষের মুখে মুখে ছড়ায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি জনতা কাউকে অপরাধী ঘোষণা করে নিজেরাই শাস্তি দিতে শুরু করে। উদ্বেগের বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সহিংসতার প্রতি একশ্রেণির মানুষের সমর্থনও দেখা যায়। কেউ মারধরের ঘটনায় উল্লাস প্রকাশ করে, কেউ আবার সেই দৃশ্যের ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে দাবি করে, ‘বিচার হয়ে গেছে’। যখন জনতা একই সঙ্গে বিচারক ও শাস্তিদাতার ভূমিকা নেয়, তখন যে কেউ পরবর্তী হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
সহিংসতার ব্যাপ্তি ও জবাবদিহির ঘাটতি
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে গণপিটুনিতে ১২৮ জন নিহত হন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৯৭ হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মানবাধিকার সহায়তা সংস্থার (এইচআরএসএস) হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ের সরকারি হিসাবে ঘটনার সংখ্যা ৬৩, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ কম।
তবে তথ্য সংগ্রহ ও ঘটনা শ্রেণিবদ্ধ করার পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকায় এসব পরিসংখ্যান সরাসরি তুলনা করা যায় না। বরং এই ব্যবধান সমস্যাটির প্রকৃত চিত্র নিরূপণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
মানুষ কেন নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে?
গণপিটুনির পেছনে রয়েছে সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানা কারণ। দীর্ঘসূত্রতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দায়মুক্তির ধারণা প্রচলিত বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল করে। আদালতে বিচার পাওয়া কঠিন বা বিচারপ্রক্রিয়া অকার্যকর বলে মনে হলে কেউ কেউ প্রতিশোধকেই ন্যায়বিচার বলে ভুল করেন।
জনতার আচরণে ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতাও অনেক সময় আড়ালে চলে যায়। ভিড়ের মধ্যে অংশগ্রহণকারীরা মনে করতে পারেন, দায় সবার মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে, তাই আলাদা করে কারও দায় নেই। গোষ্ঠীগত পরিচয়, আবেগের সংক্রমণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উৎসাহ এই প্রবণতাকে আরও জোরদার করে।
যাচাইহীন অভিযোগও সন্দেহ থেকে সহিংসতার দিকে পরিস্থিতিকে ঠেলে দিতে পারে। চুরি, ডাকাতি, যৌন সহিংসতা, ধর্ম অবমাননা কিংবা শিশু নির্যাতনের মতো অভিযোগ দ্রুত মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করতে পারে। কিন্তু অভিযোগ উঠলেই কেউ অপরাধী হয়ে যান না। প্রমাণ যাচাই, ঘটনার সত্যতা অনুসন্ধান এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হয় আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।
আইনের ঘাটতি, নাকি প্রয়োগের ব্যর্থতা?
বাংলাদেশে গণপিটুনি বা জনতার হাতে হত্যার জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্বতন্ত্র আইন নেই। তবে এ ধরনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিদ্যমান ফৌজদারি আইনের আওতায় বিচারের সুযোগ রয়েছে। ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার শাস্তির বিধান রয়েছে। ঘটনার ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী হত্যাচেষ্টা, বেআইনি সমাবেশ, দাঙ্গা, আক্রমণ এবং অন্যান্য অপরাধসংক্রান্ত ধারাও প্রয়োগ করা যেতে পারে।
সাক্ষীর বক্তব্য, ভিডিও এবং ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণের মাধ্যমে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব। তবে অনেক মানুষ একসঙ্গে হামলায় অংশ নিলে তদন্ত জটিল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে হামলার আয়োজক, উসকানিদাতা এবং সরাসরি হামলাকারীদের আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
এ সমস্যার সমাধানে শুধু নতুন আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। তদন্তের সক্ষমতা বাড়ানো, ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ, সহিংসতার সংগঠক ও উসকানিদাতাদের শনাক্ত করা এবং ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। এ বিষয়ে কোনো বিশেষ আইনি কাঠামো তৈরি করা হলে তা বিদ্যমান ফৌজদারি আইনের পরিপূরক হতে হবে। একই সঙ্গে মৌলিক অধিকার ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সুরক্ষাও অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতার উদ্যাপন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও যাচাইহীন তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ এবং নিজ নিজ গোষ্ঠীর প্রতি আনুগত্য অনেককে সহিংসতায় উৎসাহিত করতে পারে। তদন্তের আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার ফলে তিনি হুমকি, হয়রানি, সামাজিক মর্যাদাহানি ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।
সংবাদমাধ্যমের উচিত মারধর বা হামলার দৃশ্যকে চাঞ্চল্যকরভাবে উপস্থাপন না করা, অভিযোগ যাচাই করা, ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষা করা এবং অভিযোগ ও প্রমাণিত সত্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা। পাশাপাশি তদন্ত, বিচার এবং মামলার পরিণতি সম্পর্কেও ধারাবাহিকভাবে সংবাদ প্রকাশ করা প্রয়োজন। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা মানুষের সামনে তথ্য তুলে ধরে, সহিংসতায় উৎসাহ জোগায় না কিংবা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে না।
সমাজ কেন বিভক্ত অবস্থানে থাকে?
রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক শ্রেণি এবং ব্যক্তিগত ক্ষোভ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। অনেকেই নিজের গোষ্ঠীর কেউ আক্রান্ত হলে প্রতিবাদ করেন, অথচ প্রতিপক্ষের কেউ একই ধরনের সহিংসতার শিকার হলে তা সমর্থন করেন কিংবা উপেক্ষা করেন।
এ ধরনের বেছে নেওয়া প্রতিবাদ ন্যায়বিচারের অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। চুরি, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ে মানুষের ক্ষোভ কখনো কখনো তাৎক্ষণিক শাস্তির পক্ষে জনসমর্থন তৈরি করে। বিশেষত প্রচলিত বিচারব্যবস্থা প্রভাবশালীদের সুবিধা দেয় বলে ধারণা তৈরি হলে এমন প্রবণতা বাড়ে। কিন্তু ক্ষোভ কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বৈধতা দিতে পারে না।
অপরাধের দায় যদি প্রমাণের বদলে জনপ্রিয়তা, পক্ষপাত কিংবা জনতার ক্ষোভের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়, তাহলে বিচার হয়ে পড়ে খামখেয়ালি। আজ কোনো অভিযোগে একজনকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার জনতার হাতে তুলে দিলে, আগামীকাল একই প্রক্রিয়ায় একজন নিরপরাধ মানুষও সহিংসতার শিকার হতে পারেন।
সংস্কারের পথনির্দেশনা
গণপিটুনি মোকাবিলায় সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আদালত, সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে জবাবদিহি। প্রতিটি গুরুতর ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। হামলাকারী, আয়োজক ও উসকানিদাতাদের শনাক্ত করে তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ এবং আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের স্বচ্ছ মানদণ্ড নির্ধারণ, পরিসংখ্যানের অসংগতি নিরসন এবং ঘটনা, তদন্ত, মামলা ও বিচারের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা জরুরি।
ডিজিটাল পরিসরেও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সুস্পষ্ট ও অধিকারসম্মত নীতিমালার আওতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাসযোগ্য হুমকি ও সহিংসতায় উসকানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদারকি থাকতে হবে, যাতে বৈধ সমালোচনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না হয়। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্বকে গণমাধ্যম সম্পর্কে সচেতনতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার গুরুত্ব শেখাতে ভূমিকা রাখতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, অভিযোগের জবাব হতে পারে তদন্ত, জনতার হাতে শাস্তি নয়। সর্বোপরি, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে পারলেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কমবে।
উপসংহার
গণপিটুনি কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি জনআস্থা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মানুষের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধার গভীর সংকটের প্রতিফলন। এ সহিংসতা ঠেকাতে কার্যকর বিচারব্যবস্থা, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, ডিজিটাল পরিসরে জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগী বা অভিযুক্তের পরিচয় ও অভিযোগের ধরন যা-ই হোক, সব ধরনের সহিংসতা প্রত্যাখ্যান করা জরুরি।
গুজবের ভিত্তিতে যদি কোনো জনতা আপনাকে অপরাধী ঘোষণা করে, তাহলে পরদিন সেই গুজব যখন আপনাকে ঘিরে ছড়াবে, তখন আপনাকে রক্ষা করবে কে? যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার পক্ষে দাঁড়ানো মানে অপরাধীকে রক্ষা করা নয়; বরং আইনের অধীনে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করা।
