ডেস্ক রিপোর্ট
মানসিক স্বাস্থ্য: জনস্বার্থের দায় ও বাজারের চ্যালেঞ্জ
স্বাস্থ্যসেবা কেবল বাণিজ্যিক কোনো পণ্য বা সেবা নয়, এটি মানুষের মৌলিক সামাজিক প্রয়োজন। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যাদের চিকিৎসার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, অনেক সময় তাদের পক্ষেই সেই চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধশিল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়: মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও বৈষম্যহীন করতে এই খাতগুলো যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে কি?
২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিল। জরিপে আরও দেখা যায়, আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশুদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো চিকিৎসা পায়নি। এই পরিসংখ্যান মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন এবং বাস্তবে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগের মধ্যে বড় ব্যবধান তুলে ধরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের বিনিয়োগবিষয়ক প্রতিবেদনেও মানসিক স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে।
সমস্যাটি কেবল চিকিৎসকের স্বল্পতায় সীমাবদ্ধ নয়। দারিদ্র্য, সামাজিক stigma বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, ভৌগোলিক বৈষম্য, সচেতনতার অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয়, সব মিলিয়ে লাখো মানুষকে প্রয়োজনীয় সেবা নেওয়া থেকে দূরে রাখছে।
শিল্পের প্রসার ঘটছে, কিন্তু সেবায় বৈষম্য রয়ে গেছে
বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত চিকিৎসাসেবা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে দেশের ওষুধশিল্প অভ্যন্তরীণ চাহিদার বড় অংশের ওষুধ সরবরাহ করছে। দেশে জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের ফলে অনেক প্রয়োজনীয় ওষুধ তুলনামূলক সাশ্রয়ী হয়েছে। তবে ওষুধের প্রাপ্যতা মানেই পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হওয়া নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশবিষয়ক মূল্যায়নে দেখা যায়, ঐতিহাসিকভাবে দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৬০ জন, প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে যা প্রায় শূন্য দশমিক ১৬ জন। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত পেশাজীবীদের বড় অংশই আবার প্রধান শহরগুলোতে, বিশেষ করে ঢাকায় কেন্দ্রীভূত। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী রোগ নির্ণয়, কাউন্সেলিং, চিকিৎসা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে বাড়তি বাধার মুখে পড়ে।
বেসরকারি হাসপাতাল, মানসিক স্বাস্থ্য ক্লিনিক, কাউন্সেলিং সেন্টার এবং টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্ম এই ঘাটতি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় নিম্ন আয়ের পরিবারের নাগালের বাইরে থেকে যেতে পারে। মূল প্রশ্ন হলো, বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের সঙ্গে জনকল্যাণে ভূমিকা রাখার অঙ্গীকারও সমানতালে বাড়ছে কি না। স্বাস্থ্যসেবার বাজার লাভজনক হলেই তাকে সামাজিকভাবে সফল বলা যায় না, যদি আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বাইরে থেকে যায়।
লোকদেখানো দান নয়, করপোরেট দায়বদ্ধতার নতুন ভাবনা
ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি হাসপাতালগুলো সাশ্রয়ী মূল্যে মানসিক রোগের ওষুধ সরবরাহ, ভর্তুকিতে চিকিৎসকের পরামর্শ, বিশেষ চিকিৎসা প্যাকেজ, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়াতে পারে। তবে মাঝেমধ্যে চিকিৎসা শিবির আয়োজন, অনুদান দেওয়া কিংবা সচেতনতামূলক প্রচার চালানো যথেষ্ট নয়। কারণ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসায় প্রায়ই দীর্ঘ সময় ধরে ওষুধ, কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তার প্রয়োজন হয়।
করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় গ্রামীণ ক্লিনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি, হেল্পলাইন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের প্রশিক্ষণে যৌথ বিনিয়োগ করা যেতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় চাহিদা নিয়ে গবেষণা এবং ব্যয়, সেবাগ্রহীতা ও কার্যকারিতার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
তবে শুধু সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। এ ধরনের উদ্যোগের জন্য সুস্পষ্ট প্রত্যাশা, স্বচ্ছ প্রতিবেদন এবং কর্মসূচিগুলোকে প্রতিষ্ঠানের প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা ঠেকাতে কার্যকর সুরক্ষা থাকতে হবে। ওষুধের নৈতিক প্রচার, গবেষণালব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে ওষুধ ব্যবস্থাপত্র দেওয়া, বাণিজ্যিক স্বার্থের বদলে রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ওষুধের ঝুঁকি ও খরচ সম্পর্কে রোগীকে স্পষ্ট তথ্য জানানোও সমান জরুরি।
সরকারের ভূমিকা
২০১৮ সালের মানসিক স্বাস্থ্য আইন এবং ২০২০ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে নীতিগত ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এসব অঙ্গীকারকে মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা সেবায় রূপ দেওয়া এবং বাস্তব অগ্রগতি পরিমাপ করা। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উচিত ধাপে ধাপে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং প্রতি বছর এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ প্রকাশ করা। ২০২১ সালে জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ ছিল। এ বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে কমিউনিটিভিত্তিক সেবা সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার নিয়মিত অংশ হিসেবেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রাথমিক মূল্যায়ন, মৌলিক চিকিৎসা, প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো এবং পরবর্তী সময়ে রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকা দরকার। জটিল রোগের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
এর পাশাপাশি বেসরকারি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য মানসম্মত চিকিৎসার নীতিমালা প্রণয়ন, ওষুধ ব্যবস্থাপত্রের ওপর নজরদারি, চিকিৎসার খরচ স্পষ্টভাবে জানানো এবং ওষুধের দাম সাশ্রয়ী রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সবশেষে, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বচ্ছ অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের অবদান প্রকাশ এবং স্বাধীন মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকলে প্রকৃত বিনিয়োগের সঙ্গে প্রচারনির্ভর জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের পার্থক্য বোঝা সহজ হবে।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও জরুরি
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার একা মানসিক স্বাস্থ্য ঘিরে থাকা সামাজিক বাধা দূর করতে পারবে না। বিষণ্নতা, উদ্বেগ কিংবা অন্য কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, এমন অনেকে বৈষম্যের শিকার হওয়ার ভয়ে চিকিৎসা নিতে চান না। আবার তাঁদের অনেককে শুনতে হয়, এসব সমস্যা ব্যক্তিগত দুর্বলতারই প্রকাশ।
পরিবার, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, ধর্মীয় নেতা, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান এবং সংবাদমাধ্যম এ ধরনের ভুল ধারণা ভাঙতে ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক সুস্থতার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। কর্মক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ তৈরি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয় সংগঠন ও তরুণেরাও সচেতনতা তৈরি, পারস্পরিক সহায়তা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা শনাক্ত করার কাজে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উদ্যোগে অংশ নেওয়া ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের যেন কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রচারের উপকরণে পরিণত করা না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
দায়বদ্ধতার মাপকাঠি হোক বাস্তব পরিবর্তন
বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের জন্য বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধশিল্পকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। তবে তাদের আর্থিক সামর্থ্য, অভিজ্ঞতা এবং বাজারে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা এই সংকট মোকাবিলায় আরও বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ ও দায়িত্ব তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্যসেবায় দায়িত্বশীলতার মাপকাঠি শুধু প্রতিষ্ঠানের মুনাফা, নির্মিত হাসপাতালের সংখ্যা কিংবা বিক্রি হওয়া ওষুধের পরিমাণ নয়। যাঁদের চিকিৎসার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য নেই, তাঁরাও প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। সরকারকে সরকারি সেবার পরিধি বাড়াতে হবে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যদিকে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে মাঝেমধ্যে দান বা সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিমাপযোগ্য বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে হবে।
মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনেরও বেশি মানুষ যখন চিকিৎসার বাইরে থেকে যান, তখন এই সেবার দায়িত্ব শুধু বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। সুস্থ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে এমন একটি স্বাস্থ্যশিল্প প্রয়োজন, যারা মানসিক সুস্থতাকে কেবল ব্যবসার সম্ভাবনা হিসেবে নয়, বরং সবার সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করবে।
