নাঈমা অনামিকা
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
ঢাকা আজ কেবল একটি ঘনবসতিপূর্ণ মহানগর নয়, এটি একটি পরিবেশগত সংকটের জীবন্ত প্রতীক। আন্তর্জাতিক বায়ুমান সূচকে (AQI) ঢাকার নিয়মিত অবস্থান বিশ্বের সর্বোচ্চ দূষিত শহরগুলোর শীর্ষে, যা শুধু পরিসংখ্যানগত উদ্বেগ নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত নীতিব্যর্থতার সাক্ষ্য বহন করে। এই বায়ুমণ্ডলীয় সংকট আজ জনস্বাস্থ্যের কাঠামোগত ঝুঁকিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যার দায় কেবল প্রকৃতির উপর নয়, বরং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং দুর্বল পরিবেশ সুশাসনের উপর বর্তায়।
সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর উপর বৈষম্যমূলক প্রভাব
ঢাকার বায়ু দূষণ সূচক প্রায়ই ১২৩ ছাড়িয়ে বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছায়। এই পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে ক্ষতিকর হলেও শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী এবং শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য এর প্রতিক্রিয়া বিশেষভাবে মারাত্মক। গবেষণার পরিভাষায় এটি ‘ডিফারেন্সিয়াল ভালনারেবিলিটি’ বা বৈষম্যমূলক ঝুঁকি, যেখানে সমাজের অপেক্ষাকৃত দুর্বল শ্রেণি দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসীয় ব্যাধি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস এবং বিকাশজনিত সমস্যার শিকার হচ্ছে। এটি একটি পরিবেশগত অবিচার, যার কাঠামোগত সমাধান না হলে সামাজিক বৈষম্য আরও গভীর হবে।
কাঠামোগত কারণ: তিনটি সংকটের সংযোগ
ঢাকার বায়ুদূষণ বিশ্লেষণ করলে তিনটি পরস্পর সংযুক্ত কারণ স্পষ্ট হয়। প্রথমত, প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৩৮,০০০ জনের বসবাস শহরটির পরিবেশগত ধারণক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে অতিক্রম করেছে। দ্বিতীয়ত, প্রায় ৪০ লক্ষ নিবন্ধিত যানবাহনের নির্গমন বায়ুমণ্ডলে পিএম ২.৫-এর মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনকভাবে, গবেষণা অনুযায়ী ঢাকার বায়ুদূষণের প্রায় ৫৮ শতাংশের উৎস শহর সংলগ্ন অবৈধ ইটভাটা, যেখানে স্বল্পমেয়াদী অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত অখণ্ডতাকে বলি দেওয়া হচ্ছে।
বাস্তুসংস্থানিক অবক্ষয়ের গভীরতা
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর গবেষণা অনুযায়ী, গত তিন দশকে ঢাকার জলাভূমি ২০ শতাংশ থেকে মাত্র ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। যেখানে একটি বাসযোগ্য নগরের জন্য ন্যূনতম ১৫ শতাংশ সবুজ আচ্ছাদন প্রয়োজন, সেখানে ঢাকার বর্তমান সবুজ আচ্ছাদন মাত্র ৯ শতাংশ। এই ‘ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট’-এর বিপজ্জনক ভারসাম্যহীনতা প্রমাণ করে যে শহরটি বাসযোগ্যতার ন্যূনতম মানদণ্ড থেকে ক্রমশ বিচ্যুত হচ্ছে।
নীতিগত বাধ্যবাধকতা ও রূপান্তরের পথ
বিদ্যমান আইনি কাঠামো যেমন জাতীয় পরিবেশ নীতি ২০১৮, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এবং ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ আদর্শগতভাবে পর্যাপ্ত হলেও বাস্তব প্রয়োগে এগুলো মারাত্মকভাবে ব্যর্থ। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, প্রয়োজন একটি ‘ডিজিটাল ও পরিবেশগত কিউরেশন ফ্রেমওয়ার্ক’, যা রিয়েল-টাইম বায়ুমান পর্যবেক্ষণ, অবৈধ উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং সবুজায়ন নিশ্চিতকরণকে একই কাঠামোর অধীনে এনে ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’-এর লক্ষ্যমাত্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলবে।
উপসংহার: প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ শাসনের অপরিহার্যতা
ঢাকার বায়ুদূষণ সমস্যা একটি প্রযুক্তিগত বিষয়ের চেয়ে গভীরভাবে একটি রাজনৈতিক ও নীতিগত সংকট। ব্যক্তিগত সচেতনতা এখানে যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ‘এনভায়রনমেন্টাল গভর্ন্যান্স’ বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ শাসনের কঠোর ও জবাবদিহিমূলক প্রয়োগ। উন্নয়ন ও পরিবেশের দ্বন্দ্বে যদি পরিবেশকে অগ্রাধিকার না দেওয়া হয়, তাহলে ঢাকার বর্তমান নাগরিক কাঠামো যে ভঙ্গুর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে পরিত্রাণ অসম্ভব হয়ে উঠবে।
