সিদ্দিকী বাপ্পী
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট
“উদ্ভাবনেই বাংলাদেশ গঠন: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি”— এই প্রতিপাদ্যকে কেন্দ্র করে আয়োজিত জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ নিঃসন্দেহে একটি সময়োচিত উদ্যোগ। তবে একজন বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, এই স্লোগান কতটুকু কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ এবং কতটুকু বাস্তব নীতিকাঠামোয় প্রোথিত, সেই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারের দ্রুত পরিবর্তনশীল চরিত্রের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে একটি সমালোচনামূলক মূল্যায়ন এখন অপরিহার্য।
বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজার: তথ্য ও বিশ্লেষণ
স্ট্যাটিসটা মার্কেট ফোরকাস্ট(Statista Market Forecast)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের ৮ বিলিয়ন মানুষ ১৮.৫ বিলিয়ন ইউনিট ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করেছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ বিলিয়ন এবং ২০৭৫ সালে ২০০ বিলিয়ন ইউনিট ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এই বিশাল বাজারের প্রায় ৩৫–৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে চীন এবং ভারত দ্রুত ৮–১০ শতাংশে পৌঁছানোর পথে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি উৎপাদনের পরিবর্তে ডিজাইন, গবেষণা ও মানদণ্ড নির্ধারণে কর্তৃত্ব ধরে রাখছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনও নগণ্য এবং প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অর্জনে বিলম্ব ক্রমশ ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।
ঐতিহাসিক শিক্ষা ও পুনরুত্থানের শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৭০০ সালে ভারতের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অবদান ছিল প্রায় ২৩–২৫ শতাংশ, যা ঔপনিবেশিক শাসনের পরিণামে ১৯৪৭ সালে মাত্র ৩ শতাংশে নেমে আসে। চীনও একইভাবে কিং রাজবংশের পতনের পর দীর্ঘ অবনতির শিকার হয়েছিল। আজ উভয় দেশই প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদকে হাতিয়ার করে সেই হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার করছে। বাংলাদেশের জন্য এই ইতিহাস একটি সতর্কবার্তা: রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া কেবল স্লোগান দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সমালোচনামূলক চ্যালেঞ্জ: বিদ্যুৎ ও দক্ষ জনবলের সংকট
বর্তমানে বিশ্বের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ২০ শতাংশই ব্যয় হয় ডিভাইস ও ডাটা সেন্টারে, এবং এই চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন সেই হারে বাড়ছে না। চীন ও ভারত তাদের পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে প্রযুক্তি খাতে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মানব-মেশিন মিথস্ক্রিয়া ম্যানেজার, মেটাভার্স আর্কিটেক্ট, ডেটা ডিটেকটিভ এবং নবায়নযোগ্য শক্তি বিশেষজ্ঞসহ কোটি কোটি নতুন পদ সৃষ্টি হবে। বাংলাদেশ যদি এখনই পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও দক্ষ প্রযুক্তি জনবল তৈরিতে বিনিয়োগ না করে, তাহলে এই সুযোগ অন্যরা গ্রহণ করবে।
সুপারিশ ও উপসংহার
বিশেষজ্ঞ দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি স্পষ্ট যে, “উদ্ভাবনেই বাংলাদেশ গঠন” স্লোগানটিকে কার্যকর করতে হলে শিক্ষা, গবেষণা, শিল্পখাত ও নীতিনির্ধারণ এই চারটি স্তম্ভকে সমন্বিতভাবে শক্তিশালী করতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিক উদযাপনে সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা, গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অ্যাসেম্বলি ল্যাংগুয়েজ থেকে উচ্চতর প্রযুক্তি দক্ষতা পর্যন্ত মানবসম্পদ উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে। তবেই এশিয়ার প্রযুক্তি পরাশক্তি হিসেবে বাংলাদেশের উত্থান সম্ভব। অন্যথায়, এই স্লোগান কেবল ইতিহাসের পাতায় একটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি হয়েই থাকবে।
