শেখ সেলিম
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
গত কয়েক দশকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক আঘাত, দেশীয় মূল্যস্ফীতির চাপ, বিনিময় হারের সমন্বয় এবং আর্থিক খাতের নানা সংকট সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, অর্থনীতি এখনও প্রসারিত হচ্ছে, যদিও দীর্ঘমেয়াদি গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় গতি কিছুটা কম। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও ব্যবসায়িক আস্থা এখনও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো, প্রচলিত নীতিমালা বজায় রাখলে এবং দ্রুতগতির সংস্কার করা হলে, উভয় ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাব্য সময়সীমা যাচাই করা। পাশাপাশি কোন সংস্কারগুলো পুনরুদ্ধারের গতি বাড়াতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি যাতে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক থাকে, তা খতিয়ে দেখা।
বাংলাদেশের কাঠামোগত শক্তি এখনও যথেষ্ট মজবুত। বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, প্রতিষ্ঠিত রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাত, ক্রমবর্ধমান সেবা খাত, ঊর্ধ্বমুখী জাতীয় আয় এবং তরুণ শ্রমশক্তি এর মধ্যে অন্যতম। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী মোট দেশজ উৎপাদন ও জাতীয় আয় বাড়ছে, যদিও মূল্যস্ফীতির চাপ এবং কিছুটা মন্থর গতি এখনও প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ করলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে প্রায় তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে। অর্থমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এক আলোচনায় (যা প্রধান দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে) দেওয়া বক্তব্যের চেয়ে এই পূর্বাভাস কিছুটা বেশি সময়ের।
ব্যাংকিং, কর ব্যবস্থা, বিনিয়োগ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, সুশাসন এবং প্রশাসনিক দক্ষতায় ব্যাপক সংস্কার আনা গেলে অর্থবহ পুনরুদ্ধার দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই সম্ভব, যা অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের কাছাকাছি। তবে দ্রুতগতির এই পথ তখনই টেকসই হবে, যখন সংস্কার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করবে, শুধু স্বল্পমেয়াদি উদ্দীপনা প্যাকেজের ওপর নির্ভর করবে না।
বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা
বিবিএসের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উৎপাদন এখনও ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে জিডিপি ৫৫ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, এবং সাম্প্রতিক সামষ্টিক চাপ সত্ত্বেও মাথাপিছু আয় ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। আগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, তবে তা এখনও এতটাই বেশি যে পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ও ব্যবসায়িক ব্যয়কে প্রভাবিত করছে। এই সব সূচক বলছে, অর্থনীতি কাঠামোগত সংকটে পড়েনি, বরং ধীরগতির প্রবৃদ্ধি ও সামষ্টিক সমন্বয়ের একটি পর্যায় পার করছে।
দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি এখনও উপকৃত হচ্ছে উৎপাদন খাতের রপ্তানি, প্রবাসী আয়, কৃষি উৎপাদন, বিস্তৃত হতে থাকা ডিজিটাল সেবা এবং অবকাঠামো বিনিয়োগ থেকে। তবে প্রকৃত পুনরুদ্ধার নির্ভর করছে বিনিয়োগকারী, রপ্তানিকারক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর।
প্রচলিত নীতিমালার অধীনে পুনরুদ্ধার
বর্তমান সংস্কার প্রচেষ্টা যদি বড় ধরনের গতি না পায়, তাহলে বাংলাদেশের পুনরুদ্ধার ধীরগতিতেই হবে বলে ধারণা করা যায়। একটি যুক্তিসঙ্গত প্রাথমিক পূর্বাভাস হলো, সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্বাভাবিকীকরণে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে। এই সময়ে মূল্যস্ফীতি ধাপে ধাপে কমবে, বেসরকারি বিনিয়োগ ধীরে ধীরে ফিরে আসবে, রপ্তানি মাঝারি গতিতে বাড়তে থাকবে এবং আর্থিক খাতের সমন্বয় ক্রমান্বয়ে এগোবে। এই হিসাব ধরে নেয় যে কোনো বড় কাঠামোগত ধাক্কা আসবে না, এমনকি বাহ্যিক কোনো ধাক্কাও না, যা চলমান বৈশ্বিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বেশ আশাবাদী একটি অনুমান বলা যায়।
এমন পুনরুদ্ধারে সাধারণত সতর্ক ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, মাঝারি কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি, ভোক্তা আস্থার ধীর উন্নতি এবং রাজস্ব শৃঙ্খলা বজায় থাকার প্রবণতা দেখা যায়। এই পথে দ্রুত নীতিগত পরিবর্তনের ঝুঁকি কম থাকলেও, প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধীর থেকে যেতে পারে এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেও দেরি হতে পারে।
দ্রুতগতির সংস্কারের পথে পুনরুদ্ধার
কাঠামোগত সংস্কার যদি দৃঢ়ভাবে ও ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে দ্রুত পুনরুদ্ধারও সম্ভব। সুশাসন উন্নয়ন, খেলাপি ঋণ কমানো, নিয়ন্ত্রক তদারকি জোরদার করা এবং ঋণ বরাদ্দ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক সংস্কার আনা গেলে আর্থিক আস্থা বাড়বে। তবে এর জন্য রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের চাপ মোকাবিলা করতে হবে।
দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুততর হলে নতুন শিল্প কার্যক্রম উৎসাহিত হবে, আর কর প্রশাসনে সংস্কার এলে উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের ওপর বাড়তি বোঝা না চাপিয়েই রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব হবে। সাধারণ বুদ্ধি তো তাই বলে। কিন্তু বাংলাদেশে সাধারণ বুদ্ধির প্রয়োগটাই যেন অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়।
রপ্তানি বহুমুখীকরণ হওয়া উচিত আরেকটি জাতীয় অগ্রাধিকার। তৈরি পোশাক এখনও অর্থনীতির বড় শক্তি হলেও, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ নির্মাণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিকস এবং উচ্চ মূল্যমানের উৎপাদন খাত বিস্তৃত করা গেলে সীমিত কয়েকটি রপ্তানি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমবে। এমন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী বেসরকারি বিনিয়োগ, বর্ধিত কর্মসংস্থান এবং উন্নত উৎপাদনশীলতার সহায়তায় দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পুনরুদ্ধার সম্ভব।
পুনরুদ্ধারকে ত্বরান্বিত করতে পারে যেসব সংস্কার
বেশ কিছু সংস্কার পুনরুদ্ধারের গতি বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও শক্তিশালী করতে পারে। আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, কর্পোরেট সুশাসন, ঋণ আদায় ব্যবস্থা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আরও উন্নতি দরকার। স্থিতিশীল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায় এবং উৎপাদনশীল অর্থায়নের সুযোগ সহজ করে।
লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করা, নজরদারি ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রশাসনিক বিলম্ব কমানো, ডিজিটাল সরকারি সেবা সম্প্রসারণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর মাধ্যমে সরকারি প্রশাসন আরও দক্ষ হতে পারে। পূর্বানুমানযোগ্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ব্যবসায়িক ব্যয় কমায় এবং উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করে।
শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের দিকেও আরও মনোযোগ প্রয়োজন। কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা, প্রকৌশল, লজিস্টিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণকে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে আরও ভালোভাবে সংগতিপূর্ণ করতে হবে। গবেষণা, উদ্ভাবন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লজিস্টিকস অবকাঠামো এবং শিল্প প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ালে উৎপাদনশীলতা আরও জোরদার হবে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়বে।
সবশেষে, মূল্য স্থিতিশীলতা, দায়িত্বশীল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং পূর্বানুমানযোগ্য বিনিয়োগ পরিবেশ বজায় রাখার মতো ধারাবাহিক সামষ্টিক নীতিমালা টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য অপরিহার্য হয়ে থাকবে।
বিভিন্ন পুনরুদ্ধার সময়সীমার স্থিতিশীলতা তুলনা
পুনরুদ্ধারের স্থিতিশীলতা শুধু গতির ওপর নয়, বরং সংস্কারের গুণগত মান ও জবাবদিহিতার ওপরও নির্ভর করে। তিন থেকে পাঁচ বছরের ধীরগতির পুনরুদ্ধার প্রতিষ্ঠান, আর্থিক বাজার এবং ব্যবসাগুলোকে নীতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বেশি সুযোগ দেয়। এই পথে বাস্তবায়নের ঝুঁকি সাধারণত কম থাকে এবং সংস্কার আরও গভীরভাবে প্রোথিত হতে পারে। তবে দীর্ঘায়িত সমন্বয়ের কারণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীর হয়ে যেতে পারে এবং পারিবারিক আয়ের উন্নতিতেও দেরি হতে পারে।
অন্যদিকে দুই থেকে তিন বছরের দ্রুতগতির পুনরুদ্ধার বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং ব্যবসায়িক আস্থায় আগেভাগেই লাভ এনে দিতে পারে। তবে এই দ্রুত পুনরুদ্ধার টেকসই থাকবে তখনই, যখন তা অতিরিক্ত সরকারি ঋণ, সাময়িক ভর্তুকি বা স্বল্পমেয়াদি মুদ্রানীতির সম্প্রসারণের বদলে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর ভিত্তি করে চালিত হবে। টেকসই ত্বরণের জন্য আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুদৃঢ় আর্থিক নিয়ন্ত্রণ, উন্নত সুশাসন এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বাস্তবে সবচেয়ে টেকসই ফলাফল সেটাই, যেখানে সংস্কারের তাগিদ এবং সতর্ক বাস্তবায়ন একসঙ্গে যুক্ত থাকে, যা সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ও জনআস্থাকে সুরক্ষিত রাখে। এই প্রবন্ধে আলোচিত অনেক বিষয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনী ইশতেহারেরও অংশ, যে দলটি বর্তমান সরকার গঠন করেছে। সেই ইশতেহারে সময়সীমা খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না, যদিও পরবর্তী আলোচনাগুলোতে বেশিরভাগ সময়সীমা নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছে।
উপসংহার
সফল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক কাঠামোগত সুবিধা বাংলাদেশের রয়েছে, যেমন বৈচিত্র্যময় উৎপাদন ভিত্তি, প্রসারিত অভ্যন্তরীণ বাজার, উন্নত হতে থাকা অবকাঠামো এবং অনুকূল জনমিতিক বৈশিষ্ট্য। বিবিএসের সাম্প্রতিক সূচকগুলো বলছে, অর্থনীতি সংকোচনের বদলে সমন্বয়ের একটি পর্যায় পার করছে, প্রবৃদ্ধিও অব্যাহত রয়েছে। প্রচলিত নীতিমালার অধীনে সামগ্রিক পুনরুদ্ধারে সম্ভবত তিন থেকে পাঁচ বছর লাগবে। ব্যাংকিং, বিনিয়োগ, সুশাসন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক দক্ষতায় দৃঢ় কাঠামোগত সংস্কার হলে এই সময়সীমা দুই থেকে তিন বছরে নামিয়ে আনা সম্ভব।
উভয় পথের চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে শুধু পুনরুদ্ধারের গতির ওপর নয়, বরং সেই প্রবৃদ্ধি আদৌ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উচ্চতর উৎপাদনশীলতা, সুশাসন এবং জাতীয় সমৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সহনশীলতার স্থায়ী উন্নতি নিশ্চিত করা নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত কি না, তার ওপরও। এসব অর্জনযোগ্য কি না, সেই প্রশ্নের জন্য আর অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এগুলো অর্জন করতেই হবে। প্রশ্ন থেকে যায় শুধু, আমরা কোন সময়সীমা বেছে নিচ্ছি, এবং সেই সময়সীমা মেনে নেওয়ার ধৈর্য, সহনশীলতা ও মধ্যবর্তী সময়ের ব্যয় বহন করার সামর্থ্য আমাদের আছে কি না।
