সিদ্দিকী বাপ্পী
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বিদ্যুৎ উৎপাদন কাঠামো: সংখ্যা ও বাস্তবতা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাত বর্তমানে উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি বৈচিত্র্য এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় ১৩৬টি। তবে ক্যাপটিভ ও অফ-গ্রিডসহ মোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১৫০–১৮০টিরও বেশি।
বাংলাদেশের মোট স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩২,০০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ খুবই সীমিত এবং তা প্রায় ৪-৬%(মূলত সৌর ও জলবিদ্যুৎ)। বিপরীতে প্রায় ৯৪–৯৬% বিদ্যুৎ আসে গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক অনবায়নযোগ্য উৎস থেকে।
চাহিদা বনাম উৎপাদন: ঘাটতির প্রকৃতকারণ
দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে এখনও একটি ঘাটতি বিদ্যমান। গড় হিসাবে দেশে দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৫,০০০ মেগাওয়াট, কিন্তু উৎপাদন থাকে প্রায় ১৪,০০০-১৪,৪০০ মেগাওয়াটের মধ্যে। সর্বোচ্চ চাহিদা ২০২৫ সালে প্রায় ১৬,৭৯৪ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।
এখানেই মূল প্রশ্ন: উৎপাদন ক্ষমতা ৩২,০০০মেগাওয়াট হলেও কেন প্রতিদিন সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হয় না?
এর কারণগুলো হলো- সব বিদ্যুৎকেন্দ্র একসাথে চালু থাকে না (জ্বালানি সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ), গ্যাস সরবরাহ সীমিত, তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানো ব্যয়বহুল, এবং কিছু কেন্দ্র আংশিক সক্ষমতায় চলে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ একটি তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য পণ্য। এটি উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়, কারণ সাধারণ গ্রিডে বড় পরিসরে সংরক্ষণ করা যায় না। ফলে চাহিদা কম হলে বিদ্যুৎ অপচয় হয় এবং চাহিদা বেশি হলে ঘাটতি তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে টেলিকম খাতেও, লোডশেডিং বাড়লে মোবাইল টাওয়ারের ব্যাকআপ শেষ হয়ে নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ে।
নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর: সম্ভাবনা ও চাপ
আর্থিক চাপ- বড় সোলার ও উইন্ড প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা বৈদেশিক ঋণ বাড়াতে পারে।
প্রযুক্তিগত চাপ- নবায়নযোগ্য শক্তি স্থিতিশীল নয়(সূর্য ও বাতাসনির্ভর), তাই ব্যাটারি স্টোরেজ ও স্মার্ট গ্রিড প্রয়োজন। কিন্তু তা ব্যয়বহুল।
জমির সংকট- বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বড় সোলার প্রকল্পের জন্য পর্যাপ্ত জমি পাওয়া কঠিন।
রাজনৈতিক চাপ- বিদ্যুতের দাম বাড়লে জন-অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
চুক্তিগত জটিলতা- বিদ্যমান বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি(পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট) বড় বাধা। বিদেশি বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে অর্থপ্রদান ও চুক্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়া এর উদাহরণ।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: সফলতা ও ব্যর্থতা
ভারত দ্রুত নবায়নযোগ্য সম্প্রসারণ ও কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সফল হয়েছে। জার্মানি নবায়নযোগ্য শক্তিতে অগ্রগামী হলেও উচ্চ বিদ্যুৎমূল্যের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। চীন বিশ্বের বৃহত্তম সৌর উৎপাদক হলেও এখনও কয়লার ওপর নির্ভরশীল যা একটি ‘মিশ্র জ্বালানি’ মডেল নির্দেশ করে। পক্ষান্তরে, পাকিস্তানে নীতিগত দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক সংকটে নবায়নযোগ্য প্রকল্প স্থবির হয়ে আছে। আফ্রিকার কিছু দেশে অবকাঠামো ও সুশাসনের অভাবে প্রকল্পগুলো ব্যর্থ হয়েছে।
ভবিষ্যৎ সমাধান: স্টোরেজ ও প্রযুক্তি
নবায়নযোগ্য শক্তির সীমাবদ্ধতা কাটাতে লিথিয়াম ব্যাটারিভিত্তিক বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৫ সালে চীনে উৎপাদিত মোট লিথিয়াম ব্যাটারি প্রায় ১,৭৫৫ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, যার মধ্যে শুধু জানুয়ারি–সেপ্টেম্বর সময়েই উৎপাদন হয়েছে ১,১২২গিগাওয়াট; বর্তমানে বিশ্বব্যাপী লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনের প্রায় ৮৫% চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি। আর এ কারণেই চীনের গ্রিড ফ্লেক্সিবল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরে চীন নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য চ্যালেঞ্জিং এবং ব্যয়বহুল হলেও ভবিষ্যতের ভাবনায় অসাধ্য কিছু নয়।
উপসংহার
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর, তবে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে অগ্রসর হওয়া অনিবার্য। এই রূপান্তর সফল করতে হলে আর্থিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয় অপরিহার্য। অন্যথায় উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ সংকট এবং সংশ্লিষ্ট খাতের দুর্বলতা বাড়তেই থাকবে থাকবে।
