ডেস্ক রিপোর্ট
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক কমার্স বা ই-কমার্স খাত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বিকাশমান অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তরুণ ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সংযুক্ত জনগোষ্ঠী এবং মোবাইল ইন্টারনেটের দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে ২০২৪ সালে এই বাজারের আকার আনুমানিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বিভিন্ন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে এর আকার ১৫ বিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি হতে পারে।
খাতটির বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা বাংলাদেশকে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল ই-কমার্স বাজারে পরিণত করেছে। তবে এই আশাব্যঞ্জক পরিসংখ্যানের আড়ালে কিছু কাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। এগুলো দ্রুত সমাধান করা না গেলে খাতটির সম্ভাবনা পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হওয়ার আগেই প্রবৃদ্ধির গতি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।
মোবাইল নির্ভর বাস্তবতা
বাংলাদেশের ই-কমার্স ব্যবস্থা মূলত মোবাইলকেন্দ্রিক। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ অনলাইন লেনদেন স্মার্টফোনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যা বাংলাদেশের মোবাইলনির্ভর ডিজিটাল যাত্রার প্রতিফলন। বর্তমানে দেশে ১২ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি ইন্টারনেট গ্রাহক রয়েছে এবং মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। ফলে ডিজিটালি সক্রিয় ভোক্তা শ্রেণি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। দারাজ, চালডাল, রকমারি এবং পিকাবুর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো নিজেদের নিজস্ব ক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। কেউ মুদি পণ্য, কেউ ইলেকট্রনিকস, আবার কেউ বই বিক্রির মাধ্যমে অনলাইন বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
অন্যদিকে, ফেসবুকভিত্তিক সামাজিক বাণিজ্যও উল্লেখযোগ্য বিক্রয় চ্যানেলে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ৫০ হাজারেরও বেশি ই-কমার্স পেজ ফেসবুকে পরিচালিত হচ্ছে, যার অধিকাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দ্বারা পরিচালিত। পণ্যের বিভাগ অনুযায়ী ইলেকট্রনিকস খাত মোট আয়ের প্রায় ২৪ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। এর পরেই রয়েছে শখ ও অবসরভিত্তিক পণ্য, যার অংশ ২০ শতাংশ। ফ্যাশন খাতের অংশ প্রায় ১৯ শতাংশ।
বর্তমানে মোবাইল অ্যাপ ভোক্তাদের অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। শীর্ষস্থানীয় অ্যাপগুলোর সক্রিয় ব্যবহারকারী সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি এবং তাদের অধিকাংশ অর্ডার ডেস্কটপ ব্রাউজারের পরিবর্তে অ্যাপের মাধ্যমেই আসে।
পেমেন্ট অবকাঠামো: নগদ নির্ভরতার স্থায়ী সমস্যা
খাতটির দ্রুত প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও পেমেন্ট ব্যবস্থায় এখনও বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ৭৫ শতাংশ ই-কমার্স লেনদেন এখনও ক্যাশ অন ডেলিভারি বা পণ্য হাতে পাওয়ার পর নগদ অর্থ প্রদানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এটি একদিকে ডিজিটাল পেমেন্টের প্রতি ভোক্তাদের সীমিত আস্থার প্রতিফলন, অন্যদিকে দেশের অর্ধেকেরও বেশি জনগোষ্ঠী এখনও ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। বিকাশ ও নগদের মতো ডিজিটাল ওয়ালেট কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং বর্তমানে মোট লেনদেনের প্রায় ১১ শতাংশ পরিচালনা করছে। অন্যদিকে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড মিলিয়ে মোট লেনদেনের অংশ মাত্র ১৪ শতাংশ। পেপালের মতো আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত পেমেন্ট ব্যবস্থার অনুপস্থিতি সীমান্তপারের বাণিজ্যকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এর ফলে বাংলাদেশের ব্যবসাগুলো আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও সরবরাহকারীদের সঙ্গে সহজভাবে লেনদেন করতে পারছে না।
এছাড়া সব ধরনের কার্ড লেনদেন জাতীয় পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ বা এনপিএসবির মাধ্যমে পরিচালনার বাধ্যবাধকতা পেমেন্ট ব্যবস্থায় একটি একক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র তৈরি করেছে। নিরাপত্তা এবং প্রতিযোগিতার ন্যায্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও এ বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
লজিস্টিকস ও শেষ মাইল ডেলিভারি
লজিস্টিকস অবকাঠামোও ই-কমার্স খাতের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা। অনিয়মিত কাস্টমস প্রক্রিয়া, বন্দরের জট এবং বড় শহরের বাইরে অপর্যাপ্ত সড়ক যোগাযোগ পণ্য সরবরাহে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি করছে। এর ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি ১০ জন বাংলাদেশির মধ্যে মাত্র ৩ জন অনলাইনে কেনাকাটা করেন। ই-কমার্স কার্যক্রম এখনো মূলত ঢাকা এবং কয়েকটি বড় শহরকেন্দ্রিক।
অন্যদিকে দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করলেও তাদের বড় অংশ এখনও নির্ভরযোগ্য ই-কমার্স ডেলিভারি নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে রয়েছে। আমরা আলোচনা করবো যেসব ক্ষেত্রে জরুরি উন্নয়ন প্রয়োজন, সেসব নিয়ে।
ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বৃদ্ধি
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং ক্যাশ অন ডেলিভারির ওপর নির্ভরতা কমানোকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহারে প্রণোদনা, বিভিন্ন পেমেন্ট সেবার মধ্যে আন্তঃসংযোগ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম সংক্রান্ত বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনা করলে বাজার আরও গভীর হবে।
ব্রডব্যান্ড সংযোগ সম্প্রসারণ
১২ কোটি ৩০ লাখের বেশি ইন্টারনেট গ্রাহকের মধ্যে ১ কোটি ১০ লাখেরও কম মানুষ ব্রডব্যান্ড ব্যবহার করেন। বাকি সবাই মোবাইল ডেটার ওপর নির্ভরশীল, যা অনেক সময় ধীরগতির এবং মূল্য নির্ধারণেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে দ্বিতীয় সারির শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলে ব্রডব্যান্ড অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে নতুন প্রজন্মের ই-কমার্স ভোক্তা তৈরি হবে।
ভোক্তা সুরক্ষা ও আস্থা পুনর্গঠন
২০২১ সালে একাধিক ই-কমার্স প্রতারণা এবং প্ল্যাটফর্ম ধস অনলাইন কেনাকাটার প্রতি জনসাধারণের আস্থায় বড় ধরনের আঘাত হানে। এই আস্থা পুনরুদ্ধারে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক তদারকি, অগ্রিম অর্থপ্রদানের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক এসক্রো ব্যবস্থা এবং কার্যকর ভোক্তা সুরক্ষা নীতিমালা প্রয়োজন।
সীমান্তপারের ই-কমার্স সহজ করা
পুঁজি নিয়ন্ত্রণ এবং জটিল কাস্টমস প্রক্রিয়া এখনও সীমান্তপারের বাণিজ্যের বড় বাধা। আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা, ভোক্তাদের বিদেশি মুদ্রায় কেনাকাটার সুযোগ বৃদ্ধি এবং একটি পূর্বানুমানযোগ্য কাস্টমস পরিবেশ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ই-কমার্স অর্থনীতিতে আরও কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারবে।
উপসংহার
বাংলাদেশে ই-কমার্সের ভিত্তি বাস্তব এবং এর প্রবৃদ্ধির গতি সত্যিই আশাব্যঞ্জক। তবে এই গতিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করতে হলে দ্রুত বাড়তে থাকা ভোক্তা চাহিদা এবং সেই চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান দূর করতে হবে। বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ওপর নয়, বরং একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বিশ্বাসযোগ্য ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার সক্ষমতার ওপরও।
