শেখ সেলিম
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বাংলাদেশের নগর পরিবহন ব্যবস্থা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, যার প্রধান কারণ অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মগুলোর দ্রুত বিস্তার। জনঘনত্বপূর্ণ ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের পরিবহন আলোচনায় তিনটি নাম বিশেষভাবে প্রাধান্য পায়, উবার, একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান; পাঠাও, একটি দেশীয় উদ্যোগ; এবং ও- ভাই, একটি স্থানীয় প্রতিযোগী। এই তিনটিই বর্তমানে এ খাতের প্রধান অংশীজন।
উবার একটি বৈশ্বিক শক্তিধর প্রতিষ্ঠান, পাঠাও দেশীয় সাফল্যের প্রতীক, আর ও- ভাই এমন একটি স্থানীয় প্রতিযোগী, যা বাংলাদেশের নিজস্ব পরিবহন বাস্তবতার একটি বিশেষ চাহিদা পূরণ করছে। সম্মিলিতভাবে এই সেবাগুলো এমন একটি বাজার গঠন করেছে, যার আনুমানিক মূল্য ২০২৩ সালে ছিল ২৫ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই বাজারের আকার এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির আড়ালে রয়েছে অসম প্রতিযোগিতা, ভাড়ানীতি নিয়ে টানাপোড়েন এবং যেসব প্ল্যাটফর্মের ওপর চালকেরা নির্ভরশীল, তাদের বিরুদ্ধেই ক্রমবর্ধমান অসন্তোষে ভরা এক বাস্তবতা।
তিন প্রতিষ্ঠান, তিন পরিচয়
উবার বাংলাদেশে প্রবেশ করে বৈশ্বিক পুঁজি এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড পরিচয়ের শক্তি নিয়ে। তারা গাড়ি ও মোটরসাইকেলভিত্তিক সেবা প্রদান করে, শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো বজায় রাখে এবং বাজারের তুলনামূলক উচ্চমূল্যের অংশে অবস্থান করে। গ্রাহক সহায়তা ব্যবস্থাও সাধারণত স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অধিক কার্যকর বলে বিবেচিত হয়। করপোরেট ব্যবহারকারী ও প্রবাসীদের মধ্যে এর ব্র্যান্ড পরিচিতি উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশে পরিবহন নেটওয়ার্কভিত্তিক সেবার অগ্রদূত হিসেবে পাঠাও ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে মোটরসাইকেল রাইড শেয়ারিং সেবা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি খাদ্য সরবরাহ ও গাড়ি ডাকার সেবায়ও সম্প্রসারিত হয়। তিনটি প্ল্যাটফর্মের মধ্যে এটি সবচেয়ে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত। ঢাকার ভৌগোলিক কাঠামো, যাত্রীদের চলাচলের অভ্যাস এবং মূল্যসংবেদনশীলতা সম্পর্কে তাদের গভীর ধারণা রয়েছে। কৌশলগতভাবে প্রতিষ্ঠানটি নিজেকে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তরুণ নগর যাত্রীদের মধ্যে একটি শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত ব্যবহারকারী গোষ্ঠী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
এমজিএইচ গ্রুপের উদ্যোগ ও-ভাই বাজারে একটি স্বতন্ত্র এবং তুলনামূলকভাবে অবমূল্যায়িত অবস্থান দখল করে আছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপরীতে এটি গাড়ির পাশাপাশি সিএনজি অটোরিকশাভিত্তিক সেবাকেও অগ্রাধিকার দিয়েছে, ফলে এমন একটি শূন্যস্থান পূরণ করেছে যা উবার ও পাঠাও পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। বাংলাদেশে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বুকিং সুবিধা চালু করা প্রথম রাইড শেয়ারিং অ্যাপও ছিল ও-ভাই। এমন একটি দেশে, যেখানে স্মার্টফোন ব্যবহারের দক্ষতা ও ডিভাইসের সংরক্ষণক্ষমতা সর্বজনীন নয়, এই উদ্যোগ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে দৈনন্দিন যাতায়াতে সিএনজি পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল নগরবাসীর চাহিদা সম্পর্কে ও ভাইয়ের ব্যবসায়িক মডেল অধিক বাস্তবসম্মত ধারণার প্রতিফলন ঘটায়।
মূল্য নির্ধারণের সংকট ও তার শিকড়
এই ত্রিমুখী প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো ভাড়া ও কমিশন কাঠামো, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে চালকদের ওপর। দুই প্রতিষ্ঠানের কমিশন কাঠামোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। উবার সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন গ্রহণ করে, যেখানে পাঠাওয়ের কমিশন হার ১৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ঢাকা রাইড শেয়ারিং চালক ইউনিয়ন সব প্ল্যাটফর্মের কমিশন সর্বোচ্চ ১২ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে উবার ও পাঠাওয়ের সঙ্গে যুক্ত চালকেরা ঢাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। তাদের দাবির মধ্যে ছিল সর্বনিম্ন ভাড়া ৩০০ টাকা এবং প্রতি কিলোমিটারে ৩৫ টাকা নির্ধারণ। জ্বালানি ও যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধির কারণে বিদ্যমান ভাড়াকাঠামো আর টেকসই নয় বলে আন্দোলনকারীরা দাবি করেন। উবার ও পাঠাওয়ের কমিশন ব্যবধান কেবল একটি পরিসংখ্যানগত পার্থক্য নয়। এটি একদিকে বিপুল বিনিয়োগসমর্থিত বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এবং অন্যদিকে প্রতিযোগিতা ও আর্থিক টেকসইতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতার প্রতিফলন।
উবার তার বৈশ্বিক পুঁজির সহায়তায় স্বল্পমেয়াদে যাত্রীদের জন্য কম ভাড়া ভর্তুকি দিতে পারে, যা পাঠাও এবং, ও- ভাইকে মূল্য প্রতিযোগিতায় চাপে ফেলে। একই সঙ্গে এটি দেশীয় বিকল্পগুলোর টিকে থাকার সক্ষমতাকেও দুর্বল করে। ডিজিটাল বাজারে একে শিকারমূলক মূল্য নির্ধারণের ধ্রুপদি উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য যথাযথ নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। মূল্যচাপের এই বাস্তবতা একটি সমান্তরাল অর্থনীতিরও জন্ম দিয়েছে। ‘খেপ’ নামে পরিচিত এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে চালকেরা প্ল্যাটফর্মকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি দরকষাকষির মাধ্যমে যাত্রী বহন করেন, তা এখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ঢাকার ৬০ শতাংশেরও বেশি যাত্রী অন্তত একবার এ ধরনের সেবা ব্যবহার করেছেন।
এভাবে প্ল্যাটফর্ম এড়িয়ে চললে চালকেরা প্রতিটি যাত্রায় বেশি আয় করতে পারেন। তবে এর বিনিময়ে তারা বীমা, যাত্রা অনুসরণযোগ্যতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হারান। এই পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় উবার ও পাঠাও উভয়ই এমন সাবস্ক্রিপশন মডেল চালু করেছে, যেখানে প্রতি যাত্রাভিত্তিক কমিশনের পরিবর্তে চালকদের কাছ থেকে দৈনিক বা মাসিক নির্দিষ্ট ফি নেওয়া হয়। এই পরিবর্তন ইঙ্গিত করে যে পূর্ববর্তী কমিশনভিত্তিক কাঠামো আর্থিকভাবে টেকসই ছিল না। তবে নতুন ব্যবস্থাও এখনো শিল্পখাতের গভীর ভারসাম্যহীনতার পূর্ণাঙ্গ সমাধান দিতে পারেনি।
যাত্রী ও পরিবহন ব্যবস্থার বৃহত্তর উদ্বেগ
মূল্য নির্ধারণের প্রশ্নের বাইরে নিরাপত্তা, সার্জ প্রাইসিং এবং জবাবদিহিতা নিয়ে তিনটি প্ল্যাটফর্মই একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্ল্যাটফর্মের বাইরে পরিচালিত যাত্রা ট্র্যাকিং ও বীমা সুবিধাকে অকার্যকর করে দেয়, যা যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বৃষ্টি, কর্মব্যস্ত সময় এবং সরকারি ছুটির দিনে সার্জ প্রাইসিং এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে নিম্নআয়ের যাত্রীদের জন্য পরিবহন ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই যখন তাদের পরিবহনের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি থাকে। চালকদের আচরণ, যানবাহনের মান এবং ন্যূনতম সেবার মানদণ্ড নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও সব প্ল্যাটফর্মে নিয়ম প্রয়োগের ধারাবাহিকতা দেখা যায় না।
প্রতিযোগিতা নীতির করণীয়
বাংলাদেশে একটি ন্যায্য ও কার্যকর রাইড শেয়ারিং বাজার গড়ে তুলতে হলে এমন একটি প্রতিযোগিতা নীতি প্রয়োজন, যা একই সঙ্গে কাঠামোগত বৈষম্য এবং ভোক্তা সুরক্ষার বিষয়গুলো মোকাবিলা করবে। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের উচিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি স্থানীয় প্রতিযোগীদের বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়া বা অধিগ্রহণের উদ্দেশ্যে শিকারমূলক আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে কি না, তা তদন্ত করা। যথাযথ প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশোধনমূলক মূল্যসীমা এবং আচরণগত বাধ্যবাধকতা আরোপ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
সরকারের উচিত বাংলাদেশে পরিচালিত সব রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের জন্য আইনগতভাবে একটি সর্বোচ্চ কমিশন হার নির্ধারণ করা, যাতে বর্তমান স্বেচ্ছাভিত্তিক ও বৈচিত্র্যময় কাঠামোর পরিবর্তে একটি অভিন্ন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। চালক সংগঠনগুলোর দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশনসীমা নির্ধারণ করা হলে অফ প্ল্যাটফর্ম ‘খেপ’ অর্থনীতি হ্রাস পাবে এবং চালকদের আয় স্থিতিশীল হবে, অথচ প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যকারিতাও বজায় থাকবে। ডায়নামিক সার্জ প্রাইসিংয়ের ক্ষেত্রেও একটি নিয়ন্ত্রক সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা উচিত এবং তা প্রকাশ্যে জানাতে হবে। যাত্রা নিশ্চিত করার আগেই যাত্রীদের কাছে সার্জ গুণক প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। সীমাহীন সার্জ প্রাইসিংকে বিকল্প পরিবহনবিহীন যাত্রীদের ওপর আরোপিত এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল কর হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এছাড়া বিআরটিএ এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে সিএনজি অ্যাপভিত্তিক সেবার জন্য একটি পৃথক নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করতে হবে। এতে ও- ভাই এবং অনুরূপ সেবাগুলো মোটরসাইকেল ও গাড়িভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম থেকে তাদের কাঠামোগত পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে স্পষ্ট পরিচালনাগত পরিবেশ পাবে।বাংলাদেশের রাইড শেয়ারিং বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদ। একে একচেটিয়াকরণের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা এবং এই খাতের ওপর নির্ভরশীল লক্ষাধিক চালকের জীবিকা সুরক্ষিত রাখতে হলে বুদ্ধিদীপ্ত ও ন্যায়সঙ্গত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। আর সেই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা হতে হবে এমন, যা যে ডিজিটাল অর্থনীতিকে পরিচালনা করবে, তার বাস্তবতা ও বৈশিষ্ট্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে নির্মিত।
