তানজীনা ফেরদৌস
নির্বাহী সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে আগের আলোচনায় যেমন উঠে এসেছে, সম্প্রচার পরিসর বাড়লেও তথ্যের নির্ভুলতা ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা একই গতিতে গড়ে ওঠেনি। এই ঘাটতি দূর করার বিষয়টি কেবল সাংবাদিকদের ব্যক্তিগতভাবে আরও সতর্ক হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। মূল প্রশ্ন হলো, সরকারি ও স্বাধীন উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠান কীভাবে এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলবে, যেখানে নির্ভুলতা, জবাবদিহি ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ব্যতিক্রম নয়, বরং স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হবে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, প্রেস কাউন্সিল, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকেরই এই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় আলাদা ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়
বর্তমানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় মূলত লাইসেন্স প্রদান ও তদারকির কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে। এই নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা মন্ত্রণালয়কে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়। সেই ক্ষমতাকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সংবাদমান উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।
লাইসেন্স নবায়নকে পরোক্ষ রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পরিবর্তে মন্ত্রণালয়কে সংবাদকক্ষের নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণের সঙ্গে নবায়ন প্রক্রিয়াকে যুক্ত করতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর তথ্য যাচাই বিভাগ থাকা, প্রকাশিত সংশোধন নীতি থাকা এবং সংবাদকর্মীদের জন্য মৌলিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা এমন কিছু মানদণ্ড হতে পারে।
রাজনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে সব টেলিভিশন চ্যানেলের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগযোগ্য স্বচ্ছ ও প্রকাশ্য লাইসেন্সিং মানদণ্ড সংবাদমান উন্নয়নে যেকোনো একক বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। মন্ত্রণালয় চাইলে প্রতি বছর এসব মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রতিটি চ্যানেলের কার্যক্রমের একটি প্রকাশ্য মূল্যায়নও করতে পারে। এর ফলে রাজনৈতিক আনুকূল্যের বাইরে জনমতের ওপর নির্ভরশীল একটি সুনামের প্রণোদনা তৈরি হবে।
স্বাধীন প্রেস ও সম্প্রচার কাউন্সিল
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে প্রেস কাউন্সিল রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল, অর্থসংকটে থাকা এবং মূলত মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে সীমাবদ্ধ বলে ব্যাপকভাবে বিবেচিত হয়।
একটি পুনর্গঠিত প্রেস কাউন্সিল সত্যিকার অর্থে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত কাঠামোয় পরিচালিত হতে পারে। সেখানে রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরিবর্তে অভিজ্ঞ সাংবাদিক, গণমাধ্যম গবেষক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সদস্য নির্বাচন করা যেতে পারে। এমন একটি প্রতিষ্ঠান বিবিসির কার্যকর জনঅভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার আদলে জনঅভিযোগ পর্যালোচনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তবে এই প্রতিষ্ঠানের বাস্তব ক্ষমতা থাকা জরুরি। সম্প্রচারে সংশোধনী প্রচারের নির্দেশ দেওয়া, গ্রহণযোগ্য অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা এবং জনসমক্ষে সিদ্ধান্ত জানানো তার ক্ষমতার আওতায় থাকতে পারে। শাস্তিমূলক জরিমানা না থাকলেও প্রকাশ্য সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুনামের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
অভিযোগের বিচারপ্রক্রিয়া হতে হবে দ্রুত, স্বচ্ছ এবং প্রকাশ্য। এর ফলে দর্শক ও সংবাদমাধ্যম উভয়ই সময়ের সঙ্গে একটি সুস্পষ্ট রেকর্ড দেখতে পারবেন এবং কোন প্রতিষ্ঠান কীভাবে অভিযোগের জবাব দিয়েছে, তা মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন ও লাইসেন্স প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান
সম্প্রচার অবকাঠামো তদারকির দায়িত্বে থাকা নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা শুধু তরঙ্গ বরাদ্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। কোনো চ্যানেলের মালিকানা কাঠামো এবং মালিকদের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রকাশ করাও কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। বর্তমানে দর্শকদের কাছে এই তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই অস্পষ্ট থাকে।
মালিকানার স্বচ্ছতা সংবাদে পক্ষপাত পুরোপুরি দূর করবে না। তবে দর্শকদের সংবাদ পরিবেশনের পেছনের প্রেক্ষাপট বুঝে তা মূল্যায়নের সুযোগ দেবে। আন্তর্জাতিকভাবে আর্থিক সাংবাদিকতায় স্বার্থ প্রকাশের যে নীতি অনুসরণ করা হয়, এখানেও একই ধরনের স্বচ্ছতা কার্যকর হতে পারে।
নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান সংবাদ বিভাগের সঙ্গে চ্যানেলের বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক মালিকানার মধ্যে ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও করতে পারে। এর অংশ হিসেবে সম্পাদকীয় সনদ চালু করা যেতে পারে, যেখানে মালিকপক্ষের পরিবর্তে সংবাদ সম্পাদনার দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হবে।
সাংবাদিক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মান নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান
দীর্ঘমেয়াদে সংবাদমান উন্নত করতে সাংবাদিকতার পেশাগত অবকাঠামোকেও শক্তিশালী করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, সাংবাদিক সংগঠন এবং স্বাধীন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রচার সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে তথ্য যাচাই ও সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়গুলোকে একাডেমিক শিক্ষা এবং কর্মরত সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।
সরকারের বাইরে স্বাধীনভাবে পরিচালিত একটি পেশাগত স্বীকৃতি ব্যবস্থা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ন্যূনতম দক্ষতার মান নির্ধারণ করতে পারে। এমন একটি স্বীকৃতি সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদে মালিকপক্ষ বা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সম্পাদকীয় চাপ প্রতিরোধের সক্ষমতাও বাড়াতে পারে।
সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম সচেতনতা ও স্বাধীন পর্যবেক্ষক
শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট হবে না। সাংবাদিকদের ওপর আইনি চাপের বর্তমান পরিবেশ বিবেচনায় অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নির্ভরতারও নিজস্ব ঝুঁকি রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে দেখা তথ্য যাচাই উদ্যোগের মতো স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলো সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়াই টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদে তথ্যের নির্ভুলতা পর্যবেক্ষণ এবং তাদের মূল্যায়ন প্রকাশ করতে পারে। এর মাধ্যমে সংশয়প্রবণ দর্শকদের কাছেও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।
স্কুল ও সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোর মাধ্যমে গণমাধ্যম সচেতনতা কর্মসূচি চালানোও জরুরি। কারণ দর্শকদের চাপ অনেক সময় ওপর থেকে আরোপিত নিয়ন্ত্রণের তুলনায় পরিবর্তনের আরও দীর্ঘস্থায়ী চালিকাশক্তি হতে পারে।
দর্শকেরা যখন সংবাদে তথ্যের উৎস, উপস্থাপনের ধরন এবং তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও সচেতন হয়ে উঠবেন, তখন সংবাদমাধ্যমগুলোর নিজেদের স্বার্থেই এসব মানদণ্ডে বিনিয়োগ করার বাণিজ্যিক প্রণোদনা বাড়বে।
সব অংশের সমন্বয়
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো একটির পক্ষে একা সফল হওয়া সম্ভব নয়। মন্ত্রণালয় লাইসেন্স ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রণোদনা তৈরি করবে, স্বাধীন কাউন্সিল সংবাদমানের নিয়ম কার্যকর করবে এবং প্রকাশ্য সিদ্ধান্ত দেবে, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক মালিকানার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে, পেশাগত প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়াবে এবং সুশীল সমাজ জবাবদিহির জন্য জনচাপ ধরে রাখবে।
এই সব সংস্কারের মূল ভিত্তি হলো প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাধীনতা। কারণ যে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়, সেই প্রতিষ্ঠান সম্প্রচারমাধ্যমের কাছে বিশ্বাসযোগ্যভাবে জবাবদিহি দাবি করতে পারে না।
বাংলাদেশে প্রতিভাবান সাংবাদিকের অভাব নেই। কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রাথমিক সক্ষমতাও রয়েছে। ঘাটতি রয়েছে এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী, সমন্বিত এবং সত্যিকার অর্থে স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর, যা সাংবাদিকদের দক্ষতা ও সক্ষমতাকে নিয়মিতভাবে নির্ভরযোগ্য সংবাদে রূপ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করবে।
এই কাঠামো গড়ে তোলা এক বা দুই বছরের কাজ নয়। দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সামাজিক অংশগ্রহণের প্রয়োজন হবে। তবে বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন খাতকে আন্তর্জাতিক মানের নির্ভরযোগ্য সংবাদব্যবস্থার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য এই পথের বিকল্প নেই।
Reference:
