ফারাহ জেহির
সম্পাদক, অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
ঢাকার গুলশান, বনানী কিংবা ধানমণ্ডির অভিজাত বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে হাঁটলে দেশীয় ঐতিহ্যের এক বর্ণিল উদযাপন সহজেই চোখ কেড়ে নেয়। ঝলমলে শো-রুমগুলোর কাচঘেরা আলোয় প্রদর্শিত হচ্ছে বাংলাদেশি কারুশিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলো। মনোমুগ্ধকর জামদানি শাড়ি, সুনিপুণ বুননের নকশিকাঁথা আর হাতে সুই-সুতার কাজ করা চমৎকার সব পোশাক, যা প্রতিটি ফোঁড়ে ফুটিয়ে তোলে শত বছরের ইতিহাস। নব্বইয়ের দশকে সাংস্কৃতিক অহংকার প্রকাশের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই নগরভিত্তিক বুটিক শিল্প আজ এক বিশাল বাণিজ্যিক খাতে রূপান্তরিত হয়েছে, যার বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩২ থেকে ৯৭ কোটি মার্কিন ডলার। এই অনন্য সৃষ্টিগুলো দেশীয় উচ্চবিত্ত ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছ থেকে চড়া মূল্য আদায় করে নিচ্ছে।
তবে এই বিলাসবহুল বুটিকগুলোর নরম আলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম ও অস্বস্তিকর অর্থনৈতিক বৈষম্য। যেসব গ্রামীণ নারীর নিখুঁত দক্ষতা আর অক্লান্ত পরিশ্রমে এই শিল্পকর্মগুলো প্রাণ পায়, তারা এই বিপুল আয়ের মাত্র সামান্য অংশই পেয়ে থাকেন। অথচ লভ্যাংশের সিংহভাগ চলে যায় শহরের বুটিক মালিকদের পকেটে, যারা কেবল পণ্যটিতে একটি নিজস্ব ডিজাইনার ট্যাগ আর ব্র্যান্ডের লেবেল লাগিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেন।
তথ্যের অসমতা এবং গ্রামীণ কারিগরদের বঞ্চনার ইতিহাস
প্রান্তিক কারিগরদের এই নীরব বঞ্চনার ইতিহাস শুরু হয়েছিল গত শতকের শেষভাগে, যখন ঢাকার শিক্ষিত উচ্চবিত্ত শ্রেণির উদ্যোক্তারা গ্রামীণ লোকশিল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। গ্রামবাংলার মায়েরা যুগে যুগে যে নকশিকাঁথা বুনে এসেছেন, তা ঘরের সাধারণ কাঁথা থেকে হয়ে উঠল শহরের ড্রয়িংরুমের বিলাসী অনুষঙ্গ। একইভাবে রূপগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের ইউনেস্কো স্বীকৃত ঐতিহ্যবাহী জামদানি স্থান করে নিল আধুনিক ফ্যাশনের শীর্ষ কাতারে।
কিন্তু জামালপুর, রাজশাহী বা নড়াইলের কারিগরদের দোরগোড়ায় যখন পাইকারি কার্যাদেশ নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা হাজির হতে শুরু করল, তখন থেকেই এই সরবরাহ চেইনে এক গভীর অসমতা তৈরি হয়। শহরের বাজার সম্পর্কে সঠিক তথ্য না থাকায়, একজন গ্রামীণ কারিগর জানতেও পারেন না যে তার তৈরি একটি নকশিকাঁথা ঢাকার শো-রুমে ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যার জন্য তাকে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পণ্যের চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের সর্বোচ্চ ৪৮ শতাংশই লুটে নেয় শহরের বুটিকগুলো, যেখানে মূল কারিগর পান মাত্র ১২ শতাংশ। আর বাকি ২০ শতাংশ চলে যায় দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। পণ্যভেদে এই আকাশচুম্বী মূল্যের পার্থক্য ও বৈষম্যের প্রকৃত চিত্রটি নিচে যুক্ত গ্রাফে আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

গ্রাফ এর দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি পণ্যেই কারিগরের মজুরি এবং বুটিকের বিক্রয়মূল্যের মধ্যে প্রায় ৫০০ থেকে ১ হাজার শতাংশ পর্যন্ত ব্যবধান রয়েছে। যেমন:
জামদানি শাড়ি: একটি অভিজাত জামদানি শাড়ির গড় বিক্রয়মূল্য যেখানে ২৫ হাজার টাকা, সেখানে কারিগরের হাতে পৌঁছায় মাত্র ৩ হাজার ২০০ টাকার মতো।
বিশেষ অর্ডারের নকশিকাঁথা: বিশেষ অর্ডারের একটি নকশিকাঁথার খুচরা মূল্য ১৮ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হলেও তার রূপকার পান মাত্র ২ হাজার টাকা।
সাধারণ নকশিকাঁথা ও হাতের কাজের পোশাক: বুটিকগুলো এগুলো যথাক্রমে ১১ হাজার ৫০০ এবং ৮ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করলেও অবহেলিত কারিগরেরা পান মাত্র ১ হাজার ২০০ এবং ১ হাজার টাকা।
বাঁশশিল্প (ব্যাম্বু ক্রাফট): নামমাত্র মূল্যে গ্রামীণ কারিগরের কাছ থেকে পণ্য কিনে তা বহুগুণ বেশি দামে শহরের ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে।
আইনি শূন্যতা এবং সাংস্কৃতিক চুরি
এই শোষণ কেবল অর্থনৈতিক শোষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক চুরিও বটে। বস্তি অঞ্চলের কর্মশালা বা প্রত্যন্ত গ্রামে দিনরাত খেটে চলা কারিগরদের জীবনের গল্পটা একই বৃত্তে বন্দি। দালালরা এসে কাপড় ও সুতা দিয়ে যায়, ডেলিভারির সময় টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। সপ্তাহের পর সপ্তাহ অক্লান্ত পরিশ্রম করে নারীরা নিখুঁত নকশা ফুটিয়ে তোলেন। কাজ শেষে দালালরা নামমাত্র কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে পণ্যটি নিয়ে চলে যায়। সেই পণ্যটি কোন শোরুমে গেল, তাতে কী ব্র্যান্ডের লেবেল লাগল কিংবা কত দামে বিক্রি হলো, তার কিছুই কারিগরেরা জানতে পারেন না। ফলে বাংলাদেশের সুই-সুতার কাজের কারিগরেরা অন্যান্য সমমানের দক্ষ খাতের শ্রমিকদের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ কম মজুরি পান। নড়াইলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণের কোনো আধুনিক ব্যবস্থা কিংবা নিজস্ব কোনো স্থায়ী বাজার নেই। ফলে বর্ষা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পণ্য নষ্ট হলে তাদের পুরো মৌসুমের পুঁজিই হারিয়ে যায়।
এর চেয়েও বড় সংকট হলো আইনি দুর্বলতা। শহরের প্রভাবশালী ধনী ব্যবসায়ীরা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী নিখুঁত নকশাগুলোর ছবি তুলে নিয়ে যান এবং পাওয়ার লুম বা স্ক্রিন প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে মেশিনে তার হাজার হাজার নকল কপি তৈরি করেন। এই যান্ত্রিক অনুলিপিগুলো যখন ‘এক্সক্লুসিভ ডিজাইনার কালেকশন’ নামে বাজারে আসে, তখন গ্রামীণ কারিগর তার কাজের স্বত্ব এবং আয়, উভয়ই হারান। বাংলাদেশের কপিরাইট আইন ২০০০ অনুযায়ী ব্যক্তিগত শিল্পকর্ম সুরক্ষিত হলেও বংশানুক্রমে চলে আসা সামষ্টিক লোকশিল্পের ক্ষেত্রে কোনো আইনি সুরক্ষা নেই। কোনো সুনির্দিষ্ট একক স্রষ্টা না থাকায় এই ঐতিহ্যবাহী নকশাগুলোকে ‘পাবলিক ডোমেইন’ বা সবার উন্মুক্ত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়, যা বাণিজ্যিক শোষণের পথ আরও সহজ করে দেয়।
বৈষম্য দূরীকরণে রাষ্ট্রীয় নীতি ও সংস্কারের রূপরেখা
এই শোষণমূলক কাঠামোকে একটি টেকসই ও ন্যায়সংগত অংশীদারিত্বে রূপান্তর করতে হলে কেবল দাতব্য দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু আইনি ও নীতিগত সংস্কার জরুরি। ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি সুরক্ষা আইন প্রণয়ন: লোকশিল্পের ওপর গ্রামীণ ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের সামষ্টিক অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে। কোনো ঐতিহ্যবাহী মোটিফ বা নকশা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট কারিগর সম্প্রদায়ের পূর্বানুমতি, পণ্যের গায়ে তাদের নাম উল্লেখ করা এবং রয়্যালটি নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
জাতীয় ঐতিহ্যবাহী নকশা রেজিস্টার তৈরি:
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে নকশাগুলোর ঐতিহাসিক মালিকানা সংরক্ষিত থাকবে এবং যেকোনো ব্র্যান্ড এই নকশা ব্যবহার করতে চাইলে কারিগরদের সাথে ন্যায্য চুক্তি করতে বাধ্য থাকবে।
কিউআর কোডের মাধ্যমে মূল্যের স্বচ্ছতা:
প্রতিটি পোশাক বা কারুপণ্যের গায়ে একটি কিউআর কোড বা লেবেল থাকা উচিত, যেখানে স্পষ্ট লেখা থাকবে পণ্যের মূল্যের কত শতাংশ সরাসরি কারিগর পেয়েছেন। এটি ক্রেতাদের সচেতন করবে এবং শোষণমুক্ত বুটিকগুলোর প্রতি আস্থা বাড়াবে।
কারুশিল্পীদের জন্য স্থায়ী বাজার তৈরি:
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে নড়াইলে জাতিসংঘ মূলধন উন্নয়ন তহবিলের (UNCDF) সহায়তায় গড়ে ওঠা ‘দুর্গাপুর গ্রোথ সেন্টার’-এর মতো মডেল দেশের প্রতিটি জেলায় বাস্তবায়ন করা উচিত। স্থায়ী বিপণন কেন্দ্র ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সুবিধা পেলে কারিগরেরা নিজেরাই নিজেদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করতে পারবেন।
বাধ্যতামূলক রয়্যালটি শেয়ারিং:
যখন কোনো ফ্যাশন হাউস ঐতিহ্যবাহী নকশা ব্যবহার করে যান্ত্রিকভাবে পোশাক তৈরি করবে, তখন তার বিক্রয়মূল্যের ৫ থেকে ১০ শতাংশ সরাসরি কারিগর উন্নয়ন তহবিলে জমা দেওয়ার নিয়ম চালু করতে হবে।
একটি টেকসই সমাপনী
শহুরে বুটিক শিল্প মূলত গ্রামীণ কারিগরদের শত্রু নয়; এটি তাদের বৈশ্বিক ও আধুনিক বাজারের সাথে যুক্ত করার একমাত্র সেতু। কিন্তু যে সেতু দিয়ে সম্পদ কেবল একমুখীভাবে শহরে চলে যায় আর গ্রামে পড়ে থাকে শুধু দারিদ্র্য, তাকে সেতু বলা চলে না; সেটি আসলে একটি শুল্ক বুথ বা টোল গেট। যতদিন না রাষ্ট্রীয় আইন এই সত্যকে স্বীকৃতি দেবে যে, ফোঁড় তোলা হাতেরই সেই ফুলের ওপর প্রথম অধিকার, ততদিন ঢাকার বিলাসবহুল শোরুমের তাকগুলো নিছক কিছু সুন্দর শিল্পকর্মের প্রদর্শনী হয়েই থাকবে, যা কেড়ে নেওয়া হয়েছে এমন কিছু মানুষের কাছ থেকে যারা নিজেদের অধিকার দাবি করার সুযোগটুকুও পাননি।
