নীলেশ হালদার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জনমিতিক পরিবর্তন, এখনই গুরুত্ব দেওয়ার সময়
বাংলাদেশ এমন এক জনমিতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রতি এখনই গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ মানুষ, ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি হবে এবং দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি মানুষ প্রবীণ নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন। কিন্তু এই ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে দেশের প্রস্তুতি এখনো অত্যন্ত সীমিত। জনসংখ্যার এই পরিবর্তন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতির মধ্যে তৈরি হওয়া ব্যবধান আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নীতিগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
আবাসনভিত্তিক প্রবীণ সেবার সংকট
বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য আবাসনভিত্তিক সেবার ঘাটতি সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি। সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা হাতে গোনা। পাশাপাশি কয়েকটি বেসরকারি ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে আশ্রয়সেবা দিয়ে আসছে। শিশুদের জন্য পরিচালিত সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর কিছুতে অল্পসংখ্যক প্রবীণকে থাকার সুযোগ থাকলেও সামগ্রিক সক্ষমতা দেশের বিপুল প্রবীণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
নিয়ন্ত্রিত অবসর নিবাস, সহায়তাপ্রাপ্ত আবাসন, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা কেন্দ্র কিংবা সুসংগঠিত গৃহভিত্তিক সেবার মতো ব্যবস্থা বাংলাদেশে এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে অধিকাংশ প্রবীণ এখনো পরিবারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যৌথ পরিবারের প্রচলিত কাঠামো দ্রুত ভেঙে পড়ায় এই নির্ভরতার ভিত্তিও দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
পরিবারের পরিবর্তিত বাস্তবতা
অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অভিবাসন, নগরায়ণ এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের পারিবারিক কাঠামোকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য তরুণরা শহর কিংবা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। ফলে বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় অনেক প্রবীণ বাবা মা একাকী জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
একসময় ধারণা ছিল, ছেলে এবং পুত্রবধূরাই বৃদ্ধ মা বাবার প্রধান পরিচর্যাকারী হবেন, আর বিবাহিত কন্যারা স্বামীর সংসারে বসবাস করবেন। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতা বদলে যাওয়ায় আজ অনেক প্রবীণ দৈনন্দিন কাজ, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার চিকিৎসা কিংবা মানসিক সঙ্গের মতো মৌলিক সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। পারিবারিক যত্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে প্রবীণদের একমাত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে আর পরিবারের ওপর নির্ভর করা বাস্তবসম্মত নয়।
উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার প্রতিবন্ধকতা
প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্বলতা, চলাফেরার সীমাবদ্ধতা, হাড় ও পেশির সমস্যা, দৃষ্টিশক্তির অবনতি, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্টসহ নানা দীর্ঘমেয়াদি রোগ দেখা দেয়। গ্রামীণ অঞ্চলে বসবাসকারী অধিকাংশ প্রবীণের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। দূরবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্র, যাতায়াত ব্যয়, চিকিৎসার উচ্চ খরচ এবং বিশেষায়িত সেবার অভাবে অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে মাতৃ ও শিশুসেবা এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এসব ক্ষেত্র এখনও গুরুত্বপূর্ণ। তবে দ্রুত বয়স্ক জনগোষ্ঠী বৃদ্ধি পাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা, জেরিয়াট্রিক মূল্যায়ন, ওষুধ ব্যবস্থাপনা, পুনর্বাসন এবং চলাফেরায় সহায়তামূলক সেবাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বার্ধক্যে আর্থিক অনিরাপত্তা
আর্থিক অনিশ্চয়তা প্রবীণদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। সরকারের বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি অনেক প্রবীণকে সহায়তা দিলেও সেই অর্থ মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় কিংবা চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। ভাতা পাওয়ার যোগ্যতার বর্তমান নিয়মও প্রবীণ ব্যক্তিদের জাতীয় নীতিমালার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যেখানে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের প্রবীণ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
অসংগঠিত খাতে কর্মরত শ্রমিক, গৃহকর্মী এবং নিম্ন আয়ের নগরবাসীর বড় একটি অংশ অবসরকালীন কোনো সঞ্চয় ছাড়াই জীবন কাটান। অথচ এই জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।
নীতি আছে, কার্যকর বাস্তবায়ন নেই
প্রবীণদের সুরক্ষায় বাংলাদেশে বিভিন্ন আইন ও নীতি রয়েছে। ২০১৩ সালের পিতা মাতার ভরণপোষণ আইন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের ওপর বৃদ্ধ মা বাবার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। একই সঙ্গে জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা প্রবীণদের মর্যাদা, কল্যাণ এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে উৎসাহিত করে।
কিন্তু কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো ছাড়া কোনো আইনই কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না। দেশে এখনো সমন্বিত প্রবীণ পরিচর্যা ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভান্ডার, আনুষ্ঠানিক পরিচর্যাকারী কাঠামো কিংবা প্রশিক্ষিত সেবাদানকারীদের জাতীয় নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
সমন্বিত প্রবীণ পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি
জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রথম ধাপ হওয়া উচিত সেই সব এলাকায় আবাসনভিত্তিক প্রবীণ সেবা সম্প্রসারণ, যেখানে একাকীত্ব ও নির্ভরশীলতার হার বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা, জনবল, সেবার মান এবং বাসিন্দাদের অধিকার নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে।
একই সঙ্গে গৃহভিত্তিক পরিচর্যা সেবারও বিকাশ ঘটাতে হবে। অনেক পরিবারের জন্য নিজ বাড়িতে প্রবীণদের পরিচর্যার ব্যবস্থা সামাজিকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য এবং ব্যয়ও তুলনামূলক কম। স্বীকৃত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষ পরিচর্যাকারী তৈরি করা গেলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে প্রবীণদের জন্য মানসম্মত সেবাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করাও জরুরি। বয়স্ক ভাতার পরিমাণ বাড়াতে হবে, যোগ্যতার মানদণ্ডকে প্রবীণ নাগরিকের সরকারি সংজ্ঞার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে এবং অসংগঠিত খাতে সারাজীবন কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকেও এই সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে একটি আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পেনশন ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
স্বাস্থ্যখাতেও ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে জেরিয়াট্রিক সেবা যুক্ত করতে হবে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি রোগ নির্ণয়, ওষুধ ব্যবস্থাপনা, চলাফেরায় সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য রেফারেল ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে চিকিৎসার ব্যয়, ওষুধের সংকট এবং যাতায়াতজনিত প্রতিবন্ধকতা দূর করতেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বার্ধক্যকে মর্যাদার সঙ্গে দেখার সময় এসেছে
বাংলাদেশে বার্ধক্য সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি। বৃদ্ধাশ্রম কিংবা পেশাদার পরিচর্যা সেবাকে পরিবারের ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে দেখা উচিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পক্ষে জটিল পরিচর্যার দায়িত্ব পালন সম্ভব হয় না। তখন পেশাদার সেবাই হতে পারে সবচেয়ে দায়িত্বশীল এবং মানবিক সমাধান।
প্রবীণ নাগরিকদের সহায়তা করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব, একই সঙ্গে উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আজকের প্রবীণরাই একসময় দেশের পরিবার, অর্থনীতি ও সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাঁদের প্রাপ্য নিরাপত্তা, সেবা, সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।
