সুমাইয়া হাসি
জনসংযোগ সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত জাদুঘর। আদিম প্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে পাল, সেন, সুলতানি, মোঘল এবং ব্রিটিশ আমলের হাজার বছরের ইতিহাসের স্তর বিন্যাস এ দেশের মাটিতে মিশে আছে। উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলের লাল মাটিতে লুকিয়ে থাকা পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, যা এক সময় দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম আবাসিক শিক্ষাকেন্দ্র ছিল, কিংবা প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী মহাস্থানগড়, আমাদের প্রাচীন নগর সভ্যতার সাক্ষ্য দেয়। অন্যদিকে দক্ষিণের বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ শহর সুলতানি আমলের অনন্য স্থাপত্যশৈলী আর সুন্দরবনের আদিম ম্যানগ্রোভ অরণ্য প্রকৃতির এক অদ্বিতীয় হেরিটেজ হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। ইউনেস্কো ঘোষিত এই তিনটি প্রধান ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের বাইরেও বাংলাদেশের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যেমন জামদানির বুনন, পুরান ঢাকার রিকশাচিত্র বা পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের জীবনযাত্রার গভীর নান্দনিকতাকে আন্তর্জাতিক দরবারে তুলে ধরেছে। অতি সম্প্রতি ময়নামতি, লালমাই পাহাড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা কিংবা উয়ারী-বটেশ্বরের আড়াই হাজার বছরের পুরনো বাণিজ্য সভ্যতার মতো সম্ভাব্য তালিকাগুলো প্রমাণ করে যে, দেশের পর্যটন পোর্টফোলিও আন্তর্জাতিক মানের। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, এই বিপুল ঐতিহাসিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সঠিক প্রচার, দূরদর্শী সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিকীকরণের অভাবে বৈশ্বিক পর্যটন প্রবাহে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো তলানিতে পড়ে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটরস (WDI) এবং ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল (WTTC)-এর ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রভাব রিপোর্ট বিশ্লেষণ করলে এই সম্ভাবনাময় খাতের একটি নির্মম ও হতাশাজনক চিত্র ফুটে ওঠে। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (BBS)-এর সর্বশেষ বার্ষিক ডাটা অনুসারে, দেশে আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমন প্রায় ৬,৩০,৬৮৫ জনে এসে থমকে আছে। এর বিপরীতে আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের দিকে তাকালে দেখা যায়, থাইল্যান্ড বার্ষিক প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি পর্যটক টানছে, দীর্ঘ যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে ভিয়েতনাম আজ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের বেশি পর্যটকের আতিথেয়তা দিচ্ছে, এমনকি চরম অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠেও শ্রীলঙ্কা ১৫ লাখ এবং তীব্র ভৌগোলিক সংকীর্ণতা সত্ত্বেও নেপাল প্রায় ১০ লাখ আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণ করছে। এই বৈষম্যের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে। যেখানে ভিয়েতনামের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান প্রায় ৫% এবং থাইল্যান্ডে তা ১২%, সেখানে বাংলাদেশের মোট জিডিপিতে আন্তর্জাতিক পর্যটন খাতের প্রত্যক্ষ অবদান মাত্র ০.৫% এর নিচে। বিশ্বব্যাংকের অফিশিয়াল ইন্ডিকেটর ডাটাবেজ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যটন খাত থেকে অর্জিত আয় মাত্র ৪৪০.৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা থাইল্যান্ডের মোট পর্যটন রাজস্বের ২% এরও কম এবং ভিয়েতনামের মাত্র ৫%!
এই অনগ্রসরতার মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের হেরিটেজ ট্যুরিজম এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংকটে ভুগছে। প্রথমত, ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্বটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের মধ্যে এমনভাবে বিভক্ত যে, কোনো একটি সাইটে পর্যটক সুবিধা বাড়াতে গেলে ফাইলের লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে বছরের পর বছর কেটে যায়। এই আমলাতান্ত্রিক সমন্বয়হীনতার কারণে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। দ্বিতীয়ত, মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর কিংবা ময়নামতির মতো বিশ্বমানের সাইটগুলোতে পর্যটকদের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্ত সেবার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যটকরা যখন এসব প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ দেখতে আসেন, তখন তারা এর পেছনের দর্শন, লোকগাথা ও সমাজকাঠামোকে অনুধাবন করতে চান। কিন্তু আমাদের সাইটগুলোতে বহুভাষিক সাইনেজ, আধুনিক তথ্য কেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রত্যয়িত গাইডের তীব্র অভাব থাকায় তারা কেবল ‘কিছু পুরনো ইটের দেয়াল’ দেখেই ফিরে যান, যা তাদের অভিজ্ঞতাকে ক্ষুণ্ন করে। এর ওপর যোগ হয়েছে একটি নির্দিষ্ট ‘হেরিটেজ কনজারভেশন ফান্ড’ বা ঐতিহ্য সংরক্ষণ তহবিলের অনুপস্থিতি, যার কারণে জরুরি সংস্কার ও খনন কাজগুলো chronically পিছিয়ে যায়। একই সাথে অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং আইনি শিথিলতার সুযোগে প্রত্নতাত্ত্বিক সীমানার মধ্যে অবৈধ দখলদারিত্ব ও আধুনিক ইমারত নির্মাণ আমাদের আদি হেরিটেজের সত্যতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে।
এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আন্তর্জাতিক সফল মডেলগুলোর ওপর ভিত্তি করে দেশের হেরিটেজ পর্যটন কাঠামোতে আমূল এবং বৈপ্লবিক সংস্কার আনা প্রয়োজন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং ট্যুরিজম বোর্ডের ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রতিটি বড় হেরিটেজ সাইটের জন্য একটি নির্দিষ্ট এবং পেশাদারভাবে প্রশিক্ষিত স্বায়ত্তশাসিত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে, যেখানে প্রত্নতত্ত্ববিদ ও হেরিটেজ বিশেষজ্ঞদের সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। শুধু সরকারি বার্ষিক বাজেটের ওপর নির্ভর না করে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) মডেল চালু করা এবং পর্যটন রাজস্ব, কর্পোরেট সিএসআর ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুদানের সমন্বয়ে একটি “জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ তহবিল” গঠন করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল পরিবেশগত হেরিটেজের জন্য ‘গ্রিন ফাইন্যান্স’ ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ইকো-ট্যুরিজম নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে পর্যটনের কারণে প্রকৃতির কোনো ক্ষতি না হয়।
ডিজিটাল যুগে হেরিটেজকে টিকিয়ে রাখতে হলে ‘স্মার্ট হেরিটেজ’ ধারণার বাস্তবায়ন অপরিহার্য। প্রতিটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সামনে কিউআর কোড ভিত্তিক বহুভাষিক অডিও গাইড সিস্টেম এবং প্রধান সাইটগুলোতে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR) বুথ স্থাপন করে প্রাচীনকালের সেই হারিয়ে যাওয়া নগরী কেমন ছিল, তার একটি ত্রিমাত্রিক অভিজ্ঞতা দেওয়া যেতে পারে। এর পাশাপাশি দেশের সব হেরিটেজ সাইটের টিকিট বুকিং একটি একক সেন্ট্রাল গেটওয়ের অধীনে নিয়ে আসতে হবে এবং স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ‘সার্টিফাইড ট্যুরিস্ট গাইড’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। আন্তর্জাতিক বিপণনের ক্ষেত্রে আমাদের প্রচারণার ধরনও বদলাতে হবে; ইউরোপ-আমেরিকার পাশাপাশি পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জনসংখ্যাকে টার্গেট করে পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় এবং ময়নামতির বৌদ্ধ ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ “বুদ্ধিস্ট সার্কিট ট্যুরিজম” এর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং করতে হবে। একই সাথে, দীর্ঘমেয়াদী পর্যটক আকর্ষণে বর্তমানের জটিল ভিসা প্রক্রিয়া বাতিল করে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ‘ই-ভিসা’ এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে অন-অ্যারাইভাল ভিসার প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন ও আধুনিক করা বাধ্যতামূলক।
বিশ্বব্যাংক ও WTTC-এর সূচকগুলো দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে দেয় যে, বাংলাদেশের হেরিটেজ পর্যটনের এই বৈশ্বিক ব্যর্থতা সম্পদের অভাবের কারণে নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক দূরদর্শিতা এবং কৌশলগত ব্র্যান্ডিংয়ের অভাবে। ভিয়েতনামের মতো দেশ যদি তাদের সীমিত ঐতিহ্যকে পুঁজি করে বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে, তবে বাংলাদেশ তার নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে সেই উচ্চতায় অনায়াসেই পৌঁছাতে পারে। এই প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কারগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারলে এই খাত থেকে প্রতি বছর ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব আয় সম্ভব, যা তৈরি পোশাক খাতের পর দেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাত হতে পারে। ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে অবিলম্বে যদি এই নীতিগত রূপান্তর না করা হয়, তবে আমাদের এই গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক সম্পদগুলো একসময় চিরতরে তার বৈর্থতা, আকর্ষণ ও অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলবে।
