শুদেব বড়ুয়া
ফ্রিল্যান্স বিশ্লেষক
বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে পরপর সরকারগুলো মূলধন পাচার এবং অর্থপাচার প্রতিরোধে তাদের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেছে। তবে বাস্তব ফলাফল বলছে ভিন্ন কথা। বাংলাদেশে অর্থপাচার রোধে আইন শক্তিশালী করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যুক্ত হয়েছে, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট গঠন করা হয়েছে এবং ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স বা FATF এর মানদণ্ড মানার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবুও অবৈধ আর্থিক প্রবাহ এখনো উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিদ্যমান, যা নীতি ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে একটি স্থায়ী ব্যবধানকে স্পষ্ট করে।
ট্রেড মিসইনভয়েসিং বা বাণিজ্যে মিথ্যা চালান দেখানো এখনো অর্থপাচারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যদিও এটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিচিত একটি সমস্যা। কাস্টমস, ব্যাংকিং, কর ব্যবস্থা এবং কোম্পানি নিবন্ধন ডাটাবেসের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নেই। উপকারভোগী মালিকানার স্বচ্ছতাও সীমিত। বড় আকারের অপরাধীদের বিরুদ্ধে সফল দণ্ডাদেশ এবং সম্পদ পুনরুদ্ধার এখনো অনুমিত ক্ষতির তুলনায় খুবই কম।
উপলব্ধ তথ্য এ বিষয়টিকে আরও পরিষ্কার করে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অনুমান অনুযায়ী, অবৈধ অর্থপ্রবাহের প্রায় ৭৫ শতাংশই আসে বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার এবং মিসইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বহু বছর ধরে বার্ষিক অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ ১২ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করে আসছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষণাও একই চিত্র তুলে ধরে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বাণিজ্যভিত্তিক অবৈধ আর্থিক প্রবাহের মাধ্যমে প্রায় ৬৮.৩ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে, যা বছরে গড়ে ৬.৮ বিলিয়ন ডলার বা মোট বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশ।
এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: নীতিনির্ধারকদের কি মূলত পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দেওয়া উচিত, নাকি ভবিষ্যতে ক্ষতি প্রতিরোধে? জনপরিসরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সাধারণত পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার দিকেই থাকে। কিন্তু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিরোধ অনেক বেশি লাভজনক হতে পারে।
একটি সহজ উদাহরণ ধরা যাক। যদি বছরে গড়ে ১৪ বিলিয়ন ডলার মূলধন পাচার হয় এবং কর্তৃপক্ষ সফলভাবে এর ১০ শতাংশ উদ্ধার করতে পারে, তাহলে দশ বছরে অর্জন হবে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু যদি ভবিষ্যতের পাচার হওয়া অর্থের মাত্র ৫০ শতাংশও প্রতিরোধ করা যায়, তাহলে একই সময়ে দেশে থেকে যাবে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। যদি এই অর্থ দেশীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করা হয় এবং গড় ১.৫ গুণ অর্থনৈতিক গুণক ধরা হয়, তবে মোট অর্থনৈতিক সুফল ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, প্রতিরোধ কৌশল পুনরুদ্ধারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করতে সক্ষম।
সমস্যা হলো, পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। একবার অর্থ অফশোর ট্রাস্ট, শেল কোম্পানি, বিদেশি সম্পত্তি এবং জটিল মালিকানা কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করলে তা ফেরত আনা দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং আইনি জটিলতায় ভরা প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি বিচারব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চুক্তি এবং দীর্ঘ মামলা প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। সফল পুনরুদ্ধারও সাধারণত ৫ থেকে ১৫ বছর সময় নিতে পারে।
বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে মূলধন পাচার কমাতে চায়, তবে কেবল বক্তব্য বা প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কার গ্রহণ করা প্রয়োজন, যা আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোও সুপারিশ করে।
প্রথমত, বাণিজ্য নজরদারি ব্যবস্থা আধুনিক করতে হবে, যাতে আমদানি ও রপ্তানির চালানগুলো রিয়েল টাইমে অংশীদার দেশের কাস্টমস ডেটার সঙ্গে যাচাই করা যায়। এতে অতিরিক্ত বা কম মূল্য দেখিয়ে চালান তৈরির সুযোগ অনেকাংশে কমে যাবে।
দ্বিতীয়ত, একটি পাবলিক বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ রেজিস্ট্রি তৈরি করা প্রয়োজন এবং স্বয়ংক্রিয় সম্পদ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, ব্যাংক পরিচালক এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের আয় ও সম্পদের অসামঞ্জস্য সহজে শনাক্ত করা যায়।
তৃতীয়ত, কর, কাস্টমস, ব্যাংকিং, ভূমি এবং কোম্পানি নিবন্ধন ব্যবস্থার ডাটাবেস একীভূত করে একটি সমন্বিত আর্থিক গোয়েন্দা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে, যাতে তা সহজেই অনুসন্ধানযোগ্য হয়। বড় অপ্রকাশিত বিদেশি সম্পদের ক্ষেত্রে একটি ‘আনএক্সপ্লেইন্ড ওয়েলথ’ কাঠামোও বিবেচনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে অর্থপাচার নিয়ে আলোচনা এখনো অতীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে আটকে আছে, যেখানে হারানো অর্থ পুনরুদ্ধারই প্রধান লক্ষ্য। পুনরুদ্ধার অবশ্যই জবাবদিহি ও ন্যায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সুযোগ লুকিয়ে আছে প্রতিরোধের মধ্যে। যদি আগামী দশকে অনুমিত অবৈধ অর্থপ্রবাহের অর্ধেকও প্রতিরোধ করা যায়, তবে সেই অর্জন যেকোনো বাস্তবসম্মত পুনরুদ্ধার কর্মসূচির তুলনায় বহুগুণ বেশি অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনতে পারে। অতএব, নীতিনির্ধারকদের জন্য মূল প্রশ্নটি আর কেবল অতীতে কত অর্থ হারিয়েছে তা নয়, বরং ভবিষ্যতে কত সম্পদ এখনো রক্ষা করা সম্ভব।
