শেখ সেলিম
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন এক নির্ণায়ক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির (পিসিএ) প্রাথমিক স্বাক্ষর আনুষ্ঠানিকভাবে এমন এক সম্পর্কের সূচনা করেছে, যা নিছক লেনদেনের চেয়ে অনেক বেশি কিছু হতে চায়। কিন্তু আকাঙ্ক্ষা আর অর্জনের মাঝে এখনো বিস্তর ব্যবধান, যা গড়ে উঠেছে কাঠামোগত অসমতা, প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে। কূটনৈতিক ভাষা কিংবা আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের কোনো পরিমাণই একা এই ব্যবধান ঘোচাতে পারবে না। বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত সত্যিকারের কৌশলগত অংশীদারত্বে পরিণত হবে, নাকি ভদ্র ভাষায় মোড়ানো এক নির্ভরশীলতা হিসেবে থেকে যাবে, তা নির্ভর করবে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরে ঢাকা কী সিদ্ধান্ত নেয় তার ওপর। এই লেখা সেই আলোচনাকে বৃহত্তর পরিসরে এবং প্রাপ্য গুরুত্ব দিয়ে উন্মোচন করতে চায়।
অর্থনৈতিক ও অস্তিত্বের প্রশ্নে ঝুঁকি
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৪৪ শতাংশ শুষে নেয় (বছরে ২১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি), যার ৯৪ শতাংশই বস্ত্র ও তৈরি পোশাক। ইইউর ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) স্কিমের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী বাংলাদেশ, যার ব্যবহার হার ৯১ শতাংশ। এটা কোনো বৈচিত্র্যময় বাণিজ্যিক সম্পর্ক নয়; বরং অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকারের ওপর একক খাতনির্ভরতা, আর সেই অগ্রাধিকার অচিরেই উঠে যাচ্ছে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের পর ইবিএ সুবিধা আর মাত্র তিন বছর, অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত টিকবে। এরপর দেশটিকে যেতে হবে জিএসপি প্লাসে, যার শর্তগুলো বেশ কঠিন। ইইউর মোট পোশাক আমদানির ১৬ দশমিক ৫ শতাংশজুড়ে রয়েছে তৈরি পোশাক, যা ৯ শতাংশের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এই সীমা অতিক্রম করলে ওই খাত শুল্কমুক্ত জিএসপি প্লাস সুবিধার যোগ্যতা হারায়। ফলে আরোপিত প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক এমন এক খাতে সামলে নেওয়ার মতো সামান্য সমন্বয় নয়, যেখানে মুনাফা প্রায়ই এক অঙ্কের ঘরে থাকে। এটা এক অস্তিত্বের হুমকি। উৎপত্তিবিধির (রুলস অব অরিজিন) পরিবর্তন এই বিপদকে আরও ঘনীভূত করে। ইবিএতে এক-পর্যায়ের উৎপত্তিবিধি চলে, ফলে বাংলাদেশ কাপড় আমদানি করেও শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। কিন্তু জিএসপি প্লাসে তিনটি পর্যায়ের (সুতা তৈরি, বুনন ও উৎপাদন) মধ্যে অন্তত দুটি দেশের ভেতরেই সম্পন্ন করতে হবে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান, তবে এখনো অপর্যাপ্ত ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বড় পরিসরে এই শর্ত পূরণ করতে পারবে না। ইইউর মৌখিক নমনীয়তার আশ্বাস আইনি রূপ না পাওয়া পর্যন্ত কার্যত মূল্যহীন।
এফটিএর জুয়া
ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) জন্য ঢাকার প্রচেষ্টা যৌক্তিক এক নিরাপত্তাব্যবস্থা বটে, কিন্তু যুক্তি আর সময়সূচি এক জিনিস নয়। এফটিএ আলোচনা কুখ্যাতভাবে ধীরগতির। ভারতের আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে, ২০১৩ সালে থমকে যায় এবং আবার শুরু হয় কেবল ২০২২ সালে। বাংলাদেশ যদি একই পথে হাঁটে, তবে যেকোনো চুক্তি ইবিএ সুবিধার খাদে পড়ে যাওয়ার অনেক বছর পরই আসবে।
এফটিএ আবার পারস্পরিক, অর্থাৎ ইইউ এমন বাজার প্রবেশাধিকারের ছাড় দাবি করবে, যা বাংলাদেশের নবীন শিল্পগুলোকে ইউরোপীয় তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিতে পারে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে নাকি নিট সুবিধার কথা দেখানো হয়েছে, কিন্তু এমন সমীক্ষা সাধারণত পারস্পরিক উদারীকরণের রাজনৈতিক অর্থনীতিকে কম মূল্যায়ন করে। তৈরি পোশাক খাত যেহেতু প্রায় পুরোপুরি এক-পর্যায়ের উৎপত্তিবিধির ওপর নির্ভরশীল, তাই যেকোনো এফটিএতে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে সমাধান করতে হবে; নয়তো সবকিছু রক্ষা পেলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পটিই অরক্ষিত থেকে যাবে।
জিএসপি প্লাস ও এফটিএ একসঙ্গে অনুসরণ করা কৌশলগত অসঙ্গতিও প্রকাশ করে। জিএসপি প্লাস যদি পোশাক খাতের প্রবেশাধিকার রক্ষা করে, তবে এফটিএ কাম্য হলেও জরুরি নয়। আর যদি না করে, তবে এফটিএ অপরিহার্য হয়ে ওঠে, কিন্তু সময়মতো তা সম্পন্ন করা অসম্ভব। ঢাকার প্রয়োজন সঠিক ধারাবাহিকতা; আগে সর্বোত্তম জিএসপি প্লাসের ফলাফল নিশ্চিত করা, তারপর এফটিএকে কাঠামোগত বীমা হিসেবে বিবেচনা করা।
সুশাসনের প্রশ্ন
পিসিএ অবশ্য এই বার্তা দেয় যে, অংশীদারত্ব নিয়ে ইইউর ধারণা শুল্কের সীমা ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত। এই চুক্তির আওতায় রয়েছে রাজনৈতিক সংলাপ, নিরাপত্তা সহযোগিতা, জ্বালানি, পরিবহন, অভিবাসন, সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা, জলবায়ু পদক্ষেপ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে মানবাধিকার, সুশাসন, গণতন্ত্র ও শ্রম মানদণ্ড। পিসিএ আলোচনার সময় ইইউ জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ বাস্তবায়নের শর্ত যুক্ত করার ব্যাপারে অনড় ছিল। আর কথিত যে বাক্য বিনিময়ের কথা শোনা যায় (ইইউ কর্মকর্তারা জানতে চেয়েছিলেন, নিজেদের জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে ঢাকা কেন অনিচ্ছুক), তা অনেক কিছুই স্পষ্ট করে দেয়।
অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তরণ এক নাজুক পরিসর তৈরি করেছে। ইইউ ক্রমেই বাজার প্রবেশাধিকারকে সুশাসনের পারফরম্যান্সের সঙ্গে যুক্ত করবে, আর গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের যেকোনো ধারণাই সরাসরি বাণিজ্যিক পরিণতি ডেকে আনবে।
বাংলাদেশের জন্য নীতিগত অগ্রাধিকার
বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে এবং দেশীয় সুতা তৈরি ও বুননের সক্ষমতা জোরদার করতে হবে। এটা কেবল একটি শিল্পনীতির লক্ষ্য নয়, বরং এক-পর্যায়ের বিধি থেকে দুই-পর্যায়ের উৎপত্তিবিধিতে উত্তরণের ধকল সামলে টিকে থাকার পূর্বশর্ত, তা জিএসপি প্লাসের অধীনেই হোক কিংবা এফটিএর অধীনে। এই সক্ষমতা ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক ব্যবস্থাই তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা রক্ষা করতে পারবে না। এই প্রচেষ্টার সঙ্গে থাকতে হবে ধাপে ধাপে সাজানো এক আলোচনার কৌশল; আগে জিএসপি প্লাসের সর্বোচ্চ ছাড় আদায় করা, আর এফটিএকে পরিপূরক তবে ধীরগতির প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা। কারণ সময়ের চাপে তড়িঘড়ি করে এফটিএ আলোচনা চালালে তা কেবল বাংলাদেশের অবস্থানকেই দুর্বল করবে এবং এমন সব ছাড় ডেকে আনবে, যা দেওয়ার সামর্থ্য দেশটির নেই।
এদিকে সুশাসন সংস্কারকে বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া বোঝা হিসেবে নয়, বরং অভ্যন্তরীণভাবে বৈধ প্রয়োজন হিসেবে দেখতে হবে। শ্রম অধিকার, সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং নিয়ন্ত্রক স্বচ্ছতা কেবল জিএসপি প্লাসের যোগ্যতা ও এফটিএর জন্যই পূর্বশর্ত নয়, বরং পিসিএর বিনিয়োগ অধ্যায়ে কল্পিত বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণেরও পূর্বশর্ত। এসব অঙ্গীকারে বাধা দেওয়া এমন অনির্ভরযোগ্যতার বার্তা দেয়, যা একই সঙ্গে প্রতিটি আলোচনার মঞ্চে বাংলাদেশকে শাস্তির মুখে ফেলে।
পাশাপাশি বাংলাদেশকে রপ্তানির ঝুড়ি বৈচিত্র্যময় করতে হবে। যে সম্পর্কে এক পক্ষের রপ্তানির ৯৪ শতাংশ একটিমাত্র পণ্যশ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা কৌশলগত অংশীদারত্ব নয়, বরং একটি সরবরাহ শৃঙ্খল মাত্র। ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা এবং হালকা প্রকৌশলের মতো খাত গড়ে তুলতে পিসিএর জ্বালানি, ডিজিটাল সংযোগ ও পরিবহন অবকাঠামোসংক্রান্ত বিধানগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।
সবশেষে, ঢাকার উচিত ২০২৯ সাল-পরবর্তী উত্তরণকালের জন্য অন্তর্বর্তী সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাব আগেভাগেই সামনে আনা। ২০২৯ সালের মধ্যে যদি জিএসপি প্লাস বা এফটিএ কোনোটিই পুরোপুরি কার্যকর না হয়, তবে বাংলাদেশ এমন শুল্ক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে, যা কারখানা বন্ধ ও ব্যাপক বেকারত্ব ডেকে আনতে পারে। সংস্কারের মানদণ্ডের সঙ্গে শর্তযুক্ত অস্থায়ী অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকারের মতো একটি সেতুবন্ধ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করলে তা কৌশলগত দূরদর্শিতার পরিচয় দেবে এবং কঠিন অবতরণের ঝুঁকি কমাবে।
বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ব্রাসেলস কী চায় তার চেয়ে বেশি নির্ভর করে ঢাকা কী করতে প্রস্তুত তার ওপর। ইইউ ঘনিষ্ঠতর অংশীদারত্বের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। সেই অংশীদারত্ব সত্যিকারের কৌশলগত গভীরতায় পৌঁছাবে, নাকি প্রত্যাহারযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকারের ওপর গড়ে ওঠা এক ভঙ্গুর ব্যবস্থা হিসেবেই থেকে যাবে, সেই সিদ্ধান্ত এখন বাংলাদেশের হাতে। ভুল করার সুযোগ সংকীর্ণ, আর ঘড়ির কাঁটা ইতিমধ্যেই চলতে শুরু করেছে।
