অয়ন সাব্বির আলম
নীতি বিশ্লেষক – অর্থনীতি ও বাণিজ্য
বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত অনেক ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক উৎপাদন করে, অথচ সেই একই আন্তর্জাতিক করপোরেশনগুলোকে দেশের অভ্যন্তরে ব্যবসা স্থাপনে রাজি করাতে পারে না। আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, অ্যাপল, অ্যামাজন, ম্যাকডোনাল্ডস, মার্সিডিজ বেঞ্জ, মাইক্রোসফট এবং স্টারবাকসের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড বাংলাদেশের ভোক্তা বাজারে প্রায় অনুপস্থিত। তারা হয় ধূসর বাজারের আমদানির মাধ্যমে, অননুমোদিত বিক্রেতাদের মাধ্যমে, অথবা একেবারেই ব্যবসায়িক উপস্থিতি ছাড়া অবস্থান করছে।
এ বিষয়ে প্রচলিত এবং প্রকাশ্য ব্যাখ্যা হলো বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু এই ব্যাখ্যা বাস্তবতার কেবল উপরিভাগ স্পর্শ করে। এর গভীরতর কারণগুলো কাঠামোগত, রাজনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক। এগুলো এমন এক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে বাংলাদেশ একদিকে একটি শক্তিশালী রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলেছে, অন্যদিকে সেই ব্র্যান্ডগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে, যাদের পণ্য উৎপাদনে দেশটি নিজেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিপুল সংখ্যক দক্ষ ও ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তির অধিকারী। তবুও একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য বিদ্যমান। শীর্ষ বৈশ্বিক ব্র্যান্ড এবং উচ্চমূল্যের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখনো বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান দ্বিধা প্রদর্শন করে। দেশটি গণবাজারভিত্তিক বৃহৎ পরিসরের উৎপাদন আকর্ষণ করতে সক্ষম হলেও, প্রিমিয়াম বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো প্রায়ই বাংলাদেশকে এড়িয়ে যায় অথবা তাদের বিনিয়োগ সীমিত রাখে। এর পেছনে রয়েছে এমন এক জটিল কাঠামোগত ও পরিচালনাগত প্রতিবন্ধকতার জাল, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই প্রতিবন্ধকতার মধ্যে অন্যতম হলো দীর্ঘস্থায়ী নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করতে হলে খণ্ডিত ও অস্বচ্ছ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়, যেখানে নীতিগতভাবে ঘোষিত প্রণোদনা বাস্তবে প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রায়ই কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে চলমান সংকট। প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি এবং ব্যয়বহুল আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত করছে।
একই সঙ্গে দেশের লজিস্টিক ব্যবস্থা দীর্ঘসূত্রতা ও অদক্ষতায় ভুগছে। প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোর জটিলতা এবং দীর্ঘ পণ্য পরিবহন সময় উচ্চমানের ফ্যাশন ও প্রযুক্তি ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাজারে সময়নির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। ফলে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ সময়সীমা নিশ্চিত করতে না পারা তাদের জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকি। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তোলে সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি এবং কঠোর মূলধন নিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে করপোরেট মুনাফা ও লভ্যাংশ বিদেশে মূল কোম্পানির কাছে পাঠানো বিলম্বিত হয় অথবা বাধাগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি বড় নেতিবাচক বার্তা।
উৎপাদন পর্যায়েও রয়েছে দক্ষতার একটি উল্লেখযোগ্য ঘাটতি। বাংলাদেশের শিল্পখাত দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে সহজ ও স্বল্প জটিলতার পোশাক উৎপাদনে দক্ষতা অর্জন করেছে। ফলে উচ্চমানের নকশা উন্নয়ন, উন্নত গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রম এবং জটিল প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি রয়ে গেছে। এই সীমাবদ্ধতা দেশকে প্রচলিত উৎপাদন কাঠামো থেকে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে রূপান্তরের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে বাংলাদেশের আসন্ন উত্তরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। কারণ এর ফলে সাধারণ অগ্রাধিকারভিত্তিক বাণিজ্য সুবিধাসহ বিভিন্ন শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এসব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রম ও রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি প্রেক্ষাপট। ঘনঘন বিক্ষোভ, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং শ্রমিক কল্যাণ ও পরিবেশগত মানদণ্ড নিয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ের বাড়তি নজরদারি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে বহু শীর্ষ ব্র্যান্ড ক্রমেই ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া কিংবা ভারতের মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছে, যেখানে দ্রুততর লজিস্টিক সুবিধা, অধিক শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক নিশ্চয়তা এবং মূলধন স্থানান্তরের সহজ সুযোগ বিদ্যমান। বৌদ্ধিক সম্পদ সুরক্ষার দুর্বলতাও এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অ্যাপল বা মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্পদই হলো তাদের মেধাস্বত্ব এবং ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা। বাংলাদেশে বৌদ্ধিক সম্পদ অধিকার বাস্তবায়ন এখনো অসঙ্গতিপূর্ণ এবং নকল পণ্যের বাজার তুলনামূলকভাবে সহজে বিস্তার লাভ করে। অনেক ক্ষেত্রে এর বিরুদ্ধে কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণও সীমিত।
যেসব প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্য ও বাণিজ্যিক সাফল্য সম্পূর্ণভাবে তাদের ব্র্যান্ডের সুনাম এবং মেধাস্বত্বের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি কোনো ব্যবস্থাপনাযোগ্য ঝুঁকি নয়। বরং এটি এমন একটি মৌলিক অসামঞ্জস্য, যা বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ উপস্থিতির পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
