ফারাহ জেহির
নির্বাহী সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের তরুণদের জীবন থেকে আনন্দের জন্য বই পড়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। সাক্ষরতার হার বেড়েছে, তথ্যের নাগাল আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে, তবু পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার প্রবণতা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। কেন এমন হচ্ছে, তা বুঝতে হলে তরুণদের আচরণগত অভ্যাস এবং সমাজে গেঁড়ে বসা সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি, দুটো দিকেই গভীরভাবে নজর দিতে হবে।
আচরণগত প্রতিবন্ধকতা
সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন হলো তরুণদের দৈনন্দিন জীবনে স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একচেটিয়া দখল। ছোট ছোট ভিডিও, একের পর এক স্ক্রল করে যাওয়া এবং তাৎক্ষণিক আনন্দের অভ্যাস মস্তিষ্ককে এমনভাবে গড়ে তুলেছে যে বই পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় ধীর, ধরে রাখা মনোযোগ এখন ক্লান্তিকর মনে হয়। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বই পড়া বলতেই বোঝায় পরীক্ষার প্রস্তুতি, তাই পরীক্ষার চাপ কমে গেলে বই পড়ার আগ্রহও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়।
এর সঙ্গে রয়েছে অনুকরণযোগ্য উদাহরণের ঘাটতি। বাবা-মা, শিক্ষক বা বড় ভাইবোন যখন নিজেরাই আনন্দের জন্য বই পড়েন না, তখন তরুণদের সামনে অনুসরণ করার মতো দৃষ্টান্তও থাকে না। বন্ধুবান্ধবের সংস্কৃতিও একই দিকে ঠেলে দেয়, কারণ গেমিং, স্ট্রিমিং বা সামাজিক মাধ্যমের নতুন ধারার তুলনায় উপন্যাস বা প্রবন্ধ পড়াকে নিয়ে আড্ডা দেওয়ার চল খুবই কম।
সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা
সাংস্কৃতিকভাবে বাংলাদেশে বই পড়াকে দীর্ঘদিন ধরে শুধু পরীক্ষার সাফল্যের সঙ্গেই জড়িয়ে দেখা হয়, ব্যক্তিগত বিকাশ বা আনন্দের সঙ্গে নয়। পাঠ্যক্রমের বাইরের বইকে অনেক পরিবার মনোযোগ নষ্ট করার কারণ হিসেবে দেখে, বিশেষত সন্তানের পড়াশোনার ফলাফল নিয়ে যখন কড়া চোখ রাখা হয়।
ভাষার দেওয়ালও একটা বড় সমস্যা। অনেক কিশোর-কিশোরী বাংলা, যা তাদের কাছে আরামের ও পরিচয়ের ভাষা, আর ইংরেজি, যা মর্যাদা ও সুযোগের সঙ্গে জড়িত, এই দুটোর মাঝে দ্বিধায় থাকে। দুই ভাষার মাঝে সেতু বাঁধার মতো ভালো মানের কনটেন্ট এখনও পর্যাপ্ত নয়। যেখানে সরকারি বা স্কুল লাইব্রেরি আছে, সেগুলোও প্রায়ই অর্থের অভাবে ঠিকমতো চলে না, বই কম থাকে, বা পরিবেশ এমন যে তরুণ পাঠকদের সেখানে যেতে ইচ্ছেই করে না। বাড়িতে পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই রাখার সংস্কৃতিও প্রায় নেই বললেই চলে। এসব মিলিয়েই বোঝা যায়, কেন বই পড়া একটা স্থায়ী জীবনাভ্যাস হয়ে উঠতে পারছে না।
সামাজিক ও শিক্ষা সংস্কার
এই সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন স্তরে সংস্কার প্রয়োজন। শিক্ষা ব্যবস্থাকে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনা থেকে সরে এসে পাঠ্যক্রমেই আনন্দের জন্য পড়ার সুযোগ যুক্ত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের বই পড়ার জন্য সময় ও নম্বর পায়। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও এমন প্রস্তুতি থাকা চাই, যাতে শিক্ষকরা শুধু সাহিত্য বিশ্লেষণ শেখান না, বরং নিজেরাও বই পড়ার সত্যিকারের উৎসাহ দেখাতে পারেন।
স্কুলগুলোর উচিত তাদের লাইব্রেরিকে আকর্ষণীয়, বয়স উপযোগী এবং দ্বিভাষিক বইয়ের সংগ্রহে সমৃদ্ধ করা, সেই সঙ্গে পাঠচক্র, গল্প বলার আয়োজন এবং সহপাঠীদের নেতৃত্বে বই নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা রাখা, যাতে বই পড়া একা একা করার কাজ না হয়ে একটা সামাজিক আনন্দে পরিণত হয়।
বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে, স্থানীয় বইমেলা, প্রত্যন্ত এলাকায় ঘুরে ঘুরে সেবা দেওয়া মোবাইল লাইব্রেরি, এবং বই পড়াকে সেকেলে না দেখিয়ে আকাঙ্ক্ষার বিষয় হিসেবে তুলে ধরা প্রচারাভিযান, জনমানসে ধারণা বদলে দিতে পারে। বাবা-মায়েদেরও দরকার সঠিক দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ, যাতে তারা বাড়িতে বই পড়ার রুটিন গড়ে তুলতে পারেন। কারণ একটি শিশুর বইয়ের সঙ্গে প্রথম সম্পর্ক তো ঘরেই তৈরি হয়।
অনলাইন দ্বিভাষিক লাইব্রেরির ভূমিকা
এখানেই shobdomukur.com এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারে। অনলাইন দ্বিভাষিক লাইব্রেরির সুবিধা দিয়ে এমন প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের তরুণ পাঠকদের সামনে থাকা অনেক চিরচেনা বাধা দূর করে দিতে পারে। ডিজিটাল সুবিধার মানে হলো, বই এখন যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গা থেকে হাতের নাগালে, যা এমন একটা প্রজন্মকে সরাসরি আকর্ষণ করে যারা স্ক্রিনের সঙ্গেই বড় হয়েছে, অর্থাৎ তারা যেখানে সময় কাটায় সেখানেই তাদের কাছে পৌঁছে যাওয়া।
দ্বিভাষিক গঠনের কারণে পাঠকরা বাংলা আর ইংরেজির মাঝে সহজে যাতায়াত করতে পারে, ফলে সাংস্কৃতিক শেকড় আর বৈশ্বিক জ্ঞান, দুটোই একসঙ্গে গড়ে ওঠে, কোনো একটাকে বেছে নেওয়ার চাপ ছাড়াই। বাছাই করা ও সহজবোধ্য কনটেন্ট জটিল বা অচেনা লেখার প্রতি যে ভয় তরুণদের মনে থাকে, তা কমিয়ে দেয়।
সুবিধার বাইরেও, মানসিক ও সামাজিক দিক থেকে এর প্রভাব যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত বই পড়ার সঙ্গে মানসিক চাপ কমা, মনোযোগ বাড়া, সহমর্মিতা গভীর হওয়া এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ ভালো হওয়ার সম্পর্ক বারবার প্রমাণিত হয়েছে। পড়াশোনার চাপ এবং ডিজিটাল ওভারলোডের মধ্যে থাকা আজকের তরুণদের জন্য এই গুণগুলো আগের চেয়ে বেশি জরুরি। সুপারিশ, আলোচনা আর সম্প্রদায়ভিত্তিক নানা সুবিধার মাধ্যমে বই পড়াকে সামাজিক করে তোলা একটা প্ল্যাটফর্ম, প্রতিনিয়ত অনলাইনে থেকেও যে একাকিত্ব অনেক তরুণ অনুভব করে, তা কাটাতেও সাহায্য করতে পারে। এই অর্থে অনলাইন দ্বিভাষিক লাইব্রেরি শুধু বই সরবরাহের জায়গা নয়। তা একইসঙ্গে অর্থহীন স্ক্রল করার বিকল্প, দুই ভাষা ও সংস্কৃতির মাঝে সেতু, এবং সুস্থ, সংযুক্ত ও চিন্তাশীল তরুণ মনের দিকে একটা সত্যিকারের পথ। ধারাবাহিক সমর্থন আর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেলে এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম পুরো একটা প্রজন্মের বই পড়ার সম্পর্ককে বদলে দেওয়ার এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে।
