ফারাহ জেহির
সম্পাদক, অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দ্রুত বিস্তার লাভ করা বাংলাদেশি প্রবাসী জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশি বাঙালিয়ানা একটি সুসংগঠিত বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক উপস্থিতি গড়ে তুলতে পারেনি, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা। অভিবাসনের ফলে পৃথিবীর নানা প্রান্তে প্রাণবন্ত বাংলাদেশি সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে, কিন্তু ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করার মতো একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি।
নিবন্ধে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, মূল সমস্যা বাংলাদেশের প্রতি প্রবাসীদের ভালোবাসা বা আবেগের ঘাটতি নয়; বরং বিচ্ছিন্ন প্রবাসী সমাজগুলোকে একসূত্রে যুক্ত করার মতো কার্যকর প্রতিষ্ঠানের অভাব। বাংলাদেশি প্রবাসীরা দেশের সঙ্গে পারিবারিক, ধর্মীয় ও আবেগগত সম্পর্ক বজায় রাখলেও সাংস্কৃতিক চর্চা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশিদের জন্য বাঙালিয়ানার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশি বাঙালিয়ানাকে বিচ্ছিন্ন প্রবাসী গোষ্ঠীর সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি অভিন্ন বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। দ্বিভাষিক সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবতাবাদী দর্শনের বিস্তৃত চর্চা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালিয়ানাকে অর্থবহ ও জীবন্ত করে তুলতে পারে।
একটি ভাষা, দুটি কেন্দ্র, ভিন্ন প্রবাসযাত্রা
বাংলাভাষী বিশ্বের বিকাশ দীর্ঘদিন ধরে দুটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে, কলকাতা ও বাংলাদেশ। শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং উন্নত জীবনের সন্ধানে উভয় অঞ্চল থেকেই বহু মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন করেছেন। তবে প্রবাসে গিয়ে তাদের সাংস্কৃতিক যাত্রাপথ এক নয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিতে কলকাতার প্রবাসী সমাজ লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টোসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে সুপরিচিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তুলেছে। এসব প্রতিষ্ঠান কেবল নস্টালজিয়ার মিলনমেলা নয়; বরং প্রকাশনা, নাট্যচর্চা, উৎসব এবং শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে কলকাতার সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক বজায় রাখে।
বাংলাদেশি বাঙালিদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় দেশ, অস্ট্রেলিয়া এবং বিশ্বের আরও অনেক স্থানে বড় বড় বাংলাদেশি সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব সম্প্রদায়ে জন্ম নিয়েছে ব্রিটিশ বাংলাদেশি, আমেরিকান বাংলাদেশি, গালফ বাংলাদেশি কিংবা অস্ট্রেলিয়ান বাংলাদেশি পরিচয়ের নতুন প্রজন্ম। তারা নিজ নিজ দেশে শিক্ষা ও পেশায় সাফল্য অর্জন করলেও বাঙালিয়ানার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নতুন সামাজিক বাস্তবতার কারণে ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃসাংস্কৃতিক বিবাহও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সাধারণ ঘটনা। এই পরিবারগুলো বাংলাদেশি সমাজকে নতুন অভিজ্ঞতা ও বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করলেও প্রচলিত সামাজিক কাঠামোর মধ্যে অনেক সময় পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা পায় না। ফলে তাদের সন্তানরা একাধিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে বেড়ে উঠলেও এমন একটি সাংস্কৃতিক আশ্রয়ের সন্ধান করে, যেখানে তাদের বহুমাত্রিক পরিচয় স্বাভাবিকভাবে স্বীকৃতি পায়।
অনুপস্থিত সাংস্কৃতিক অবকাঠামো
সবচেয়ে বড় ঘাটতি বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসার নয়; ঘাটতি একটি সমন্বিত সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি সম্প্রদায়গুলো প্রধানত মসজিদ, পারিবারিক সংগঠন, প্রবাসী সমিতি, রেমিট্যান্সভিত্তিক উদ্যোগ এবং সীমিত সাংস্কৃতিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে সংগঠিত।
এসব প্রতিষ্ঠানের সামাজিক গুরুত্ব অনেক, কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত একটি সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক হিসেবে তারা কাজ করে না। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সম্পত্তি, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা দেশে অর্থ পাঠানোর বিষয়। অন্যদিকে সাহিত্যচর্চা, বাংলা ভাষা সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের সাংস্কৃতিক শিক্ষার বিষয় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়।
এখানেই সবচেয়ে বড় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি। প্রবাসী কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স এবং অভিবাসী কল্যাণ নিয়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের সাহিত্য, প্রকাশনা, ডিজিটাল আর্কাইভ, বাংলা ভাষা শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে যুক্ত করার মতো একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক কৌশল গড়ে ওঠেনি। ফলে বাঙালিয়ানা আজও মূলত ব্যক্তিগত স্মৃতি ও পারিবারিক চর্চার ওপর নির্ভরশীল।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়েছে বাঙালিয়ানার দার্শনিক ভিত্তির চর্চায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালি পরিচয়কে মানবিক, উদার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ধর্মীয় সম্প্রীতি, সাম্য এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে নজরুলের দর্শন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে এমন প্রবাসী সমাজে যেখানে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান এবং মিশ্র সাংস্কৃতিক পরিবারের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেন। কিন্তু প্রবাসী সমাজের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে এই যৌথ সাহিত্যিক ও মানবিক উত্তরাধিকারকে কেন্দ্রস্থলে খুব কমই দেখা যায়। অথচ এই দর্শনই জাতীয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশিদের একত্রিত করার শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে।
এই ঐতিহ্যকে ধারাবাহিকভাবে সংরক্ষণ ও বিকশিত করার মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠলে বাঙালিয়ানা ধীরে ধীরে জীবন্ত সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে ব্যক্তিগত স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
দ্বিভাষিক সাহিত্যভিত্তিক একটি উত্তর
এই প্রেক্ষাপটে শব্দমুকুর আয়োজিত অনলাইন সাময়িকী আঠারো আনা বাঙালিয়ানা একটি ভিন্নধর্মী উদ্যোগ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। বিচ্ছিন্ন প্রবাসী গোষ্ঠীর সমষ্টি হিসেবে বাংলাদেশিদের দেখার পরিবর্তে সাময়িকীটি বাঙালিয়ানাকে একটি অভিন্ন বৈশ্বিক পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করে, যার প্রকাশ ঘটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
সাময়িকীটির দ্বিভাষিক বিন্যাস এই দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম শক্তি। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় প্রকাশিত হওয়ায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের পাঠকেরা নিজেদের ভাষাগত স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রেখেই বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস এবং সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে বাংলা ভাষায় পূর্ণ দক্ষতার পরিবর্তে এই উদ্যোগ পাঠকের ভাষাগত বাস্তবতাকেই সম্মান জানায়।
সাহিত্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগের আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। প্রবন্ধ, গল্প, স্মৃতিকথা এবং প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতাভিত্তিক লেখার মাধ্যমে পাঠকেরা নিজেদের বৃহত্তর বাঙালিয়ানার অংশ হিসেবে দেখতে শেখে। আন্তঃসাংস্কৃতিক বিবাহ, বহুভাষিক পরিবার, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা ভিন্ন সমাজে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা এখানে ব্যতিক্রম নয়; বরং সমকালীন বাঙালিয়ানার স্বাভাবিক বিস্তার।
বিচ্ছিন্ন সম্প্রদায় থেকে বৈশ্বিক সংযোগের পথে
বিদেশে বাঙালিয়ানার ভবিষ্যৎ কেবল নস্টালজিয়ার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠবে না; প্রয়োজন সুদৃঢ় সংযোগের। কলকাতার প্রবাসী সমাজ শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিতে বিস্তার লাভ করেছে। বাংলাদেশি বাঙালিয়ানারও এখন এমন একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক দরকার, যা লন্ডন, দুবাই, সিডনি, টরন্টো, নিউইয়র্ক কিংবা কুয়ালালামপুরে বসবাসকারী মানুষকে সাহিত্য, ভাষা এবং সাংস্কৃতিক সংলাপের মাধ্যমে একত্রে যুক্ত করবে।
এই নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে দ্বিতীয় প্রজন্মের লেখক, মিশ্র সাংস্কৃতিক পরিবারের সদস্য এবং উপসাগরীয় দেশ ও অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী বাংলাদেশিদের আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।
একটি দ্বিভাষিক সাহিত্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম একাই সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। তবে বিচ্ছিন্ন কণ্ঠগুলোকে একত্রিত করে, ভাষা ও স্মৃতির বন্ধনে যুক্ত করে এবং যৌথ সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার পরিসর তৈরি করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে বাঙালিয়ানাকে পৌঁছে দেওয়ার শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।
বাংলাদেশি বাঙালিয়ানার ভবিষ্যৎ শুধু মাতৃভূমিকে স্মরণ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানবতাবাদ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সর্বজনীন চেতনা এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার আলোকে একটি জীবন্ত ও বিকাশমান সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার গ্রহণের সুযোগ করে দেবে।
