মো. আওলাদ হোসেন
ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্ট লন্ডন, যুক্তরাজ্য
চট্টগ্রামের ৭ হাজার ৪০০টিরও বেশি মাছের খামার ও পুকুর প্লাবিত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবেই ক্ষতির পরিমাণ ৩৯ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু এই ক্ষতিকে কেবল মৌসুমি দুর্যোগ বলে দেখার সুযোগ নেই। বরং ঘটনাটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, বাংলাদেশের মৎস্যখাত, যা তৈরি পোশাক শিল্পের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি আয়কারী খাত, এমন এক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে যা বর্তমান জলবায়ু বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না।
মৎস্য অধিদপ্তর নিজেই জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির এই হিসাব প্রাথমিক এবং সময়ের সঙ্গে তা আরও বাড়বে। বন্যার পানিতে শুধু মাছ ও চিংড়িই ভেসে যায়নি, প্রশ্নের মুখে পড়েছে এমন একটি উৎপাদনব্যবস্থা, যেখানে জলবায়ু অভিযোজনকে এখনো অপরিহার্য নয়, বরং অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মৎস্যশিল্পে বন্যার প্রভাব
ক্ষয়ক্ষতির ভৌগোলিক চিত্র দেখলে মৎস্যখাতের ঝুঁকির প্রকৃতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পটিয়া, যেখানে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি জলাশয় প্লাবিত হয়েছে। আনোয়ারায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ১০০টি এবং বাঁশখালীতে ৪৫০টি জলাশয়। হাটহাজারীতেও প্রায় ১৪৫টি মাছের খামার ডুবে গেছে। এসব খামারের বড় একটি অংশে হালদা নদী থেকে সংগৃহীত প্রাকৃতিক কার্প মাছের ডিম থেকে উৎপাদিত রেণু পোনা চাষ করা হতো। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মৎস্যচাষে এই রেণু পোনা অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ।
একজন খামারি জানিয়েছেন, বর্তমান বাজারদরে প্রতি কেজি রেণু পোনার মূল্য প্রায় ৪ হাজার টাকা। তাঁর একার ক্ষতির পরিমাণ ৩ লাখ টাকারও বেশি। এই ক্ষতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর অর্থ, ভবিষ্যৎ মাছ উৎপাদনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত প্রজনন চক্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রেণু পোনার উৎপাদন কমে গেলে তার প্রভাব শুধু চলতি মৌসুমে নয়, আগামী বছরের উৎপাদনেও পড়বে।
চিংড়ি খামারগুলোর পরিস্থিতিও একই রকম উদ্বেগজনক। বাঁশখালী ও আনোয়ারায় অন্তত ৫৫টি চিংড়ি খামার বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের চিংড়ি চাষ মূলধননির্ভর। খাদ্য, পোনা এবং শ্রমের পেছনে ফসল তোলার বহু আগেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়। এমন অবস্থায় ফসল সংগ্রহের ঠিক আগে বন্যা দেখা দিলে শুধু উৎপাদিত চিংড়িই নষ্ট হয় না, খামারির পুরো কার্যকর মূলধনও হারিয়ে যায়। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে এই বিনিয়োগ করেন। ফলে বন্যার ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বোঝায় পরিণত হয়, যা পানি নেমে যাওয়ার পরও তাদের পিছু ছাড়ে না।
ছনুয়ার এক খামারি তিনটি খামারে প্রায় ৬ লাখ টাকার ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। শত শত ক্ষতিগ্রস্ত খামারিকে বিবেচনায় নিলে এই আর্থিক ধাক্কা ভবিষ্যতে বিনিয়োগ কমিয়ে দেবে, পরবর্তী উৎপাদনচক্রে মাছের মজুত হ্রাস করবে এবং অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে স্থায়ীভাবে মৎস্যচাষ থেকে সরে যেতে বাধ্য করবে।
রপ্তানি বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশের হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস। চট্টগ্রাম এই শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র। ফলে এই অঞ্চলের উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহেও দ্রুত প্রভাব পড়ে।
বিশ্বের চিংড়ি বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ। বাংলাদেশ সরবরাহে ব্যর্থ হলে সেই শূন্যস্থান পূরণে ভিয়েতনাম, ভারত ও ইকুয়েডরের মতো দেশ প্রস্তুত রয়েছে। একবার কোনো আন্তর্জাতিক ক্রেতা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকে গেলে তাকে আবার ফিরিয়ে আনা সব সময় সহজ হয় না। বাংলাদেশের রপ্তানি খাত আগে থেকেই মান নিয়ন্ত্রণ এবং ধারাবাহিক সরবরাহের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। তার সঙ্গে জলবায়ুজনিত উৎপাদন বিপর্যয় যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
প্রকাশিত ৩৯ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব কেবল খামার পর্যায়ের সরাসরি ক্ষতি তুলে ধরে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার অলস সক্ষমতা, রপ্তানি চুক্তি বাতিল এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতা হারানোর মতো পরোক্ষ ক্ষতি মিলিয়ে প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
টেকসই উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত ঘাটতি
এই বন্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক কেবল ২৪ ঘণ্টায় ২১৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নয়, বরং ছনুয়ার মধুখালীর অচল জলকপাট। একটি অকার্যকর জলকপাটের কারণে বন্যার পানি সাগরে নেমে যেতে পারেনি। ফলে আশপাশের বাড়িঘর ও মাছের খামার প্লাবিত হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যার একটি বড় অংশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের নয়, বরং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ব্যর্থতার ফল।
বাংলাদেশের উপকূলীয় মৎস্যচাষের জন্য নির্মিত জলকপাট, বাঁধ এবং নিষ্কাশনব্যবস্থা এমন সময়ের পরিকল্পনায় তৈরি হয়েছিল, যখন বৃষ্টিপাতের ধরন তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন সেই বাস্তবতা বদলে গেছে।
বিভিন্ন জলবায়ু পূর্বাভাস বলছে, বাংলাদেশে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা এবং অতি ভারী বৃষ্টির ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। ফলে বিদ্যমান অবকাঠামো ও বর্তমান জলবায়ুর চাপের মধ্যে ব্যবধান প্রতিবছর আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
মৎস্যখাতে টেকসই উন্নয়ন শুধু খামার পর্যায়ের ভালো চর্চার মাধ্যমে সম্ভব নয়। কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, শক্তিশালী বেড়িবাঁধ, বন্যাসহনশীল পুকুর নকশা এবং আগাম সতর্কবার্তার সঙ্গে সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে এমন বীমা ও ঋণব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে বন্যার ক্ষতির পর খামারিদের উৎপাদন বন্ধ করে দিতে না হয়। সরকারকে সড়ক, বিদ্যুৎ কিংবা অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পের মতোই মৎস্যখাতের অবকাঠামো উন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যা একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। নিষ্ক্রিয়তার মূল্য এখন আর কেবল সম্ভাব্য ঝুঁকি নয়। সেই ক্ষতি দৃশ্যমান, পরিমাপযোগ্য, বারবার ঘটছে এবং সময়ের সঙ্গে আরও দ্রুত বাড়ছে।
