শেখ সেলিম
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বাংলাদেশের একজন কৃষকের কাছে ফসল কাটার মৌসুম এক অদ্ভুত দ্বৈত অভিজ্ঞতার নাম। ধান, আলু কিংবা সবজির বাম্পার ফলন হওয়ার কথা আনন্দের উপলক্ষ। কিন্তু বাস্তবে অনেক কৃষক এই সময় স্বস্তির বদলে উৎকণ্ঠায় থাকেন। সমস্যার উৎস খেতে নয়। মাটি, আবহাওয়া ও কৃষকের শ্রম মিলে যে ফলন তৈরি হয়, সেই ফলন খামার থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর মাঝের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় গিয়ে আটকে পড়ে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দীর্ঘ শৃঙ্খল, অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ অবকাঠামো এবং এমন মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা, যা প্রায়ই উৎপাদকের স্বার্থের বিপরীতে কাজ করে, কৃষকের এই দুর্ভোগের মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।
প্রাচুর্য কেন এত ঘন ঘন অর্থনৈতিক দুর্ভোগে পরিণত হয়, তা বুঝতে শুধু সহানুভূতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আরও বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি। দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থার ভেতরে থাকা নৈতিক ঝুঁকির সমস্যাগুলো খতিয়ে দেখা জরুরি। কৃষক, সংগ্রাহক ও ক্রেতাদের মধ্যে তথ্যের অসমতা এবং স্বার্থের অসামঞ্জস্য এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে ঝুঁকির বড় অংশ শেষ পর্যন্ত এমন কৃষকদের ওপর গিয়ে পড়ে, যারা সেই ঝুঁকি সামাল দেওয়ার জন্য সবচেয়ে কম প্রস্তুত। এই নিবন্ধে সেই সমস্যার দিকগুলোই বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সরবরাহ ব্যবস্থার অতিরিক্ত মুনাফা ও নৈতিক ঝুঁকি
টমেটো, আম কিংবা শাকপাতার মতো পণ্য কয়েক দিনের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে এসব পণ্য বিক্রির সময় কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা কার্যত থাকে না। ভালো দামের জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলে ফসল দ্রুত বিক্রি করতে হয়। সাধারণত যে ক্রেতা তখন হাতের কাছে পাওয়া যায়, তাঁর কাছেই পণ্য তুলে দিতে বাধ্য হন কৃষক।
মধ্যস্বত্বভোগীরা এই তাগিদ খুব ভালোভাবেই বোঝেন। অনেক ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত এসব ব্যবসায়ী কৃষকের কাছ থেকে কেনা দাম এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছ থেকে নেওয়া দামের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি করেন। সরবরাহ ব্যবস্থার এই অতিরিক্ত ব্যবধানকে অর্থনীতির ভাষায় সরবরাহ ব্যবস্থার অতিরিক্ত মুনাফা বলা যায়।
মধ্যস্বত্বভোগীদের কিছু মুনাফা অবশ্যই যৌক্তিক। কারণ পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ এবং পচে যাওয়ার ঝুঁকি বহনের মতো বাস্তব খরচ তাঁদের রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় আদায় করা অতিরিক্ত অর্থ সেই খরচের তুলনায় অনেক বেশি হয়। কোনো জেলার পরিবহন নেটওয়ার্ক বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ যদি কোনো সিন্ডিকেটের হাতে চলে যায়, তাহলে তারা অনেকটাই নিজেদের ইচ্ছামতো কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কেনার দাম নির্ধারণ করতে পারে। ঢাকাসহ অন্যান্য শহরের প্রকৃত চাহিদা বা বাজারদর তখন সেই দামের ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারে না।
ফলে তৈরি হয় অর্থনীতিতে বহুল আলোচিত নৈতিক ঝুঁকির একটি আদর্শ উদাহরণ। কৃষককে ঠকিয়ে কম দামে পণ্য কেনার জন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রায় কোনো শাস্তির মুখে পড়তে হয় না। অন্যদিকে পচনশীল পণ্য নষ্ট হওয়ার আগে কৃষকের সামনে বিক্রির বিকল্পও থাকে না।
এই ভারসাম্যহীনতার কারণে সিন্ডিকেটগুলোর ন্যায্য দাম দেওয়ার কিংবা উন্নত সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ কম থাকে। সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা ও অপচয় কমানোর অবস্থানে থাকা পক্ষগুলোই সেই অদক্ষতা থেকে লাভবান হলে পরিস্থিতির উন্নতির জন্য তাদের বিনিয়োগের প্রণোদনাও থাকে না।
প্রধান ও প্রতিনিধির সমস্যা এবং কমে যাওয়া ফলন
এই পরিস্থিতি অর্থনীতিতে বহুল পরিচিত ‘প্রধান ও প্রতিনিধির সমস্যা’ তৈরি করে। কৃষক এখানে প্রধানের ভূমিকায় থাকেন। শ্রম, বীজ ও পুঁজি বিনিয়োগ করে উৎপাদনের সব ঝুঁকি বহন করেন তিনি। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীরা প্রতিনিধির ভূমিকা পালন করেন। বাজারে কৃষকের প্রবেশাধিকার এবং পণ্যের প্রকৃত বাজারদর নির্ধারণের ওপর তাঁদের বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ থাকে।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন প্রতিনিধির স্বার্থ প্রধানের লক্ষ্য থেকে আলাদা হয়ে যায়। কৃষকের লক্ষ্য থাকে ফসলের সর্বোচ্চ মূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থার অতিরিক্ত মুনাফার বড় অংশ যদি কৃষকের সম্ভাব্য আয় থেকে কেটে নেওয়া হয়, তাহলে সেই লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ কমে যায়।
আগেই যদি কৃষক ধরে নেন যে উৎপাদন বাড়ালেও আয়ের বড় অংশ সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে চলে যাবে, তাহলে তাঁর সিদ্ধান্তও বদলে যেতে পারে। অনেক কৃষক উৎপাদনের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারেন, তুলনামূলক কম ঝুঁকির কিন্তু কম ফলনশীল ফসলে যেতে পারেন, কিংবা বেশি মূল্যের অথচ দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্য উৎপাদন পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে এমন শস্য চাষে যেতে পারেন, যা সহজে সংরক্ষণ করা যায়।
ফলে প্রতিটি কৃষক তাঁর সামনে থাকা বাস্তব প্রণোদনা অনুযায়ী যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিলেও পুরো অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রার কৃষিপণ্য উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হয়। ব্যক্তিগতভাবে যৌক্তিক সিদ্ধান্তগুলো একত্র হয়ে সামগ্রিকভাবে কম ফলনের পরিস্থিতি তৈরি করে।
ফসলের প্রাচুর্য, কৃষকের দুর্ভোগ ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসায় ঝুঁকি
কোনো মৌসুমে উৎপাদন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্যের দাম কয়েক দিনের মধ্যেই পড়ে যেতে পারে। অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং পরিবহন সংকটের কারণে অতিরিক্ত পণ্য সময়মতো দূরের বাজারে পাঠানো সম্ভব হয় না।
কখনো কখনো কৃষক মাঠেই সবজি নষ্ট হতে দেন। কারণ ফসল তুলতে ও বাজারে পাঠাতে যে খরচ হয়, ক্রেতার দেওয়া দাম তার চেয়েও কম। তখন প্রাচুর্য আর আশীর্বাদ থাকে না, বরং কৃষকের জন্য তা দুর্ভোগে পরিণত হয়। এই অস্থিরতার প্রভাব সরবরাহ ব্যবস্থার আরও ওপরের স্তরেও পৌঁছে যায়। কৃষিপণ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত কৃষিভিত্তিক ব্যবসাগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
কিছু প্রতিষ্ঠান কম দামে কৃষিপণ্য কিনে পরে ভালো দামে বিক্রি করার আশায় অতিরিক্ত স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেয়। কিন্তু অতিরিক্ত সরবরাহ, রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কিংবা পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণে বাজার পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে পড়লে এসব প্রতিষ্ঠান অনেক সময় কৃষক বা ঋণদাতার সঙ্গে করা চুক্তি রক্ষা করার বদলে ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে বা দেউলিয়া হয়ে যায়।
ব্যর্থতার খরচ তখন শুধু ব্যবসা মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যাংক, সমবায় এবং পাওনা না পাওয়া কৃষকদের ওপরও সেই ক্ষতির চাপ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ব্যবসার মালিকদের ক্ষেত্রেও এক ধরনের নৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়। ভালো সময়ে অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়া হয় বড় মুনাফার আশায়, আর পরিস্থিতি খারাপ হলে ক্ষতির বড় অংশ দুর্বল পক্ষগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
সরকারের করণীয়
এই পরস্পর সম্পর্কিত নৈতিক ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় সরকারের সমন্বিত কয়েকটি পদক্ষেপ প্রয়োজন। সরকারি পর্যায়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণাগার এবং গ্রামীণ পরিবহন অবকাঠামো সম্প্রসারণ করলে কৃষকের ওপর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে প্রধান প্রধান পচনশীল কৃষিপণ্যের জন্য স্বচ্ছ এবং সবার জন্য উন্মুক্ত বাজারদরের তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে বর্তমানে উৎপাদকদের তুলনায় সিন্ডিকেটগুলোর হাতে থাকা তথ্যগত সুবিধা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
মধ্যস্বত্বভোগীদের মধ্যে কারসাজি ও সিন্ডিকেট কার্যক্রম তদন্ত এবং ভেঙে দেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন। অনানুষ্ঠানিক সিন্ডিকেটগুলো অনেক সময় কোনো আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন ছাড়াই কাজ করে, ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।
আইনি সুরক্ষার আওতায় চুক্তিভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে কৃষক ন্যায্য দাম ও উৎপাদিত পণ্য কিনে নেওয়ার বিষয়ে আইনগতভাবে কার্যকর নিশ্চয়তা পেতে পারেন। এতে সরবরাহ ব্যবস্থার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পক্ষ কৃষকের ওপর থাকা ঝুঁকির কিছু অংশ অন্য পক্ষের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া সম্ভব হবে।
পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত গুদাম রসিদভিত্তিক ঋণব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষক সংরক্ষিত কৃষিপণ্যের বিপরীতে ঋণ নিতে পারবেন। ফলে ফসল কাটার পরপরই কম দামে বিক্রি করার চাপ কমবে। প্রথমবারের মতো কৃষক বাজারদর ভালো হওয়ার জন্য অপেক্ষা করার মতো বাস্তব দরকষাকষির ক্ষমতা পাবেন।
বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত মুনাফার কাঠামোগত কারণ এবং তার ফলে তৈরি হওয়া প্রধান ও প্রতিনিধির স্বার্থের অসামঞ্জস্য দূর করা ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। সেই পরিবর্তনই পারে ফসল কাটার মৌসুমকে কৃষকের নিয়মিত দুর্ভোগের সময় না বানিয়ে সেই কাঙ্ক্ষিত আশীর্বাদে পরিণত করতে, যার প্রত্যাশা কৃষক ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি সবসময় করে এসেছে।
