ফারজানা নূপুর
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি
বাংলাদেশের আঞ্চলিক সবজি সরবরাহ ব্যবস্থা এমন এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে উৎপাদক কৃষক এবং ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মাঠ থেকে রান্নাঘরের টেবিল পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে সবজি একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর হাত ঘুরে যায়, দিনের পর দিন অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণহীন পরিবহনের শিকার হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটের কারণে মূল্য ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়।
ফলে এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যেখানে কৃষক ভোক্তার দেওয়া দামের একটি সামান্য অংশ পান, বিপুল পরিমাণ সবজি বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায় এবং মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী সরবরাহ ব্যবস্থার দুই প্রান্ত থেকেই মুনাফা অর্জন করে।
এই সংকট বুঝতে এবং সমাধান করতে হলে তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত সমস্যার দিকে নজর দিতে হবে: সংরক্ষণজনিত ক্ষয়ক্ষতি, দালালনির্ভর বাজার কাঠামো এবং সিন্ডিকেটের প্রভাব। এই নিবন্ধে এই তিনটি বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সংরক্ষণ সংকট
বাংলাদেশে উৎপাদনের পরবর্তী পর্যায়ে ফল ও সবজির প্রায় ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে আনুমানিক ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। শুধু টমেটোর ক্ষেত্রেই উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতির হার প্রায় ৩০ শতাংশ। বেগুনের ক্ষেত্রে সরবরাহ ব্যবস্থাজুড়ে ক্ষতির পরিমাণ ২৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যার মধ্যে ১২ দশমিক ৫১ শতাংশ ক্ষতি হয় কৃষক পর্যায়েই।
এই ক্ষতির মূল কারণ পর্যাপ্ত কোল্ড চেইন বা শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব। ফসল কাটার পর প্রায় ৪১ শতাংশ কৃষক সরাসরি রোদে খোলা মাটির ওপর সবজি স্তূপ করে রাখেন। প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে মাত্র ২০ শতাংশ কৃষক এবং ২৪ শতাংশ ব্যবসায়ী প্লাস্টিক ক্রেট ব্যবহার করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাট বা নাইলনের বস্তা ব্যবহার করা হয়, যা সবজিকে চাপ, আঘাত ও ক্ষয় থেকে সুরক্ষা দিতে পারে না।
বাজারজাত করার আগে মাত্র ২৭ শতাংশ কৃষক ও ব্যবসায়ী সবজি পরিষ্কার করেন। তাঁদের মধ্যেও ৩২ শতাংশ অনিরাপদ খাল বা নালার পানি ব্যবহার করেন, যা জীবাণু দূর করার পরিবর্তে দূষণের ঝুঁকি বাড়ায়। সবজি পরিবহনে প্রধানত খোলা যানবাহন, তিন চাকার ভ্যান, রিকশা ও টেম্পো ব্যবহার করা হয়, যেখানে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা নেই। দেশে বিদ্যমান শীতল সংরক্ষণাগারগুলোর অধিকাংশই আলুর জন্য ব্যবহৃত হয়, পচনশীল সবজির জন্য এই সুবিধা প্রায় অনুপস্থিত।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) উল্লেখ করেছে, কোল্ড স্টোরেজ এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বিনিয়োগ উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। তবে এসব সুবিধা এখনো মূলত ঢাকা ও কয়েকটি বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক, ফলে উৎপাদনকারী গ্রামীণ অঞ্চলগুলো কার্যত এর বাইরে রয়েছে।
এর ফলে যে সবজি সঠিক তাপমাত্রায় পাঁচ থেকে সাত দিন ভালো থাকতে পারত, তা ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই বাজারমূল্য হারায়। কৃষক বাধ্য হন কম দামে বিক্রি করতে, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব আরও বাড়িয়ে দেয়।
মধ্যস্বত্বভোগীর চাপ
বাংলাদেশের সবজি সরবরাহ ব্যবস্থা মূলত তিন ধরনের মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীল। প্রথমত, ফড়িয়া, যারা স্থানীয় কয়েকটি বাজারে ছোট পরিসরে পণ্য সংগ্রহ ও বিক্রি করেন। দ্বিতীয়ত, বেপারি, যারা গ্রাম পর্যায়ে কৃষক বা ফড়িয়ার কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কিনে থাকেন। তৃতীয়ত, আড়তদার, যারা গুদাম সুবিধা ও কমিশনভিত্তিক সেবা প্রদান করেন এবং বেপারি ও শহুরে খুচরা বিক্রেতার মধ্যে সংযোগ তৈরি করেন।
গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে ভোক্তারা কৃষকের প্রাপ্ত দামের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি মূল্য পরিশোধ করেন। প্রচলিত বাজার ব্যবস্থায় কৃষক থেকে ফড়িয়া, ফড়িয়া থেকে বেপারি, বেপারি থেকে আড়তদার, এরপর খুচরা বিক্রেতা হয়ে পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। প্রায় ৪০ শতাংশ সবজি এই একটি চ্যানেলের মধ্য দিয়ে বাজারে আসে।
প্রতিটি স্তরে যুক্ত হয় অতিরিক্ত মুনাফা, পরিবহন খরচ এবং কমিশন। ফুলকপির ক্ষেত্রে একজন বেপারির বাজারজাত ব্যয় প্রতি কুইন্টালে প্রায় ২৪৮ টাকা, যেখানে শহুরে খুচরা বিক্রেতা প্রতি কুইন্টালে প্রায় ১৩০ টাকা পর্যন্ত মুনাফা যোগ করেন। অথচ উৎপাদনের পুরো ঝুঁকি বহনকারী কৃষক ভোক্তার দেওয়া মূল্যের সবচেয়ে ছোট অংশ পান।
কৃষকদের কাছে পর্যাপ্ত বাজার তথ্য নেই, নেই উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণের আর্থিক সক্ষমতা কিংবা সরাসরি বড় বাজারে পৌঁছানোর পরিবহন ব্যবস্থা। ফলে ফসল কাটার মৌসুমে যখন সরবরাহ বেড়ে যায় এবং দাম কমে যায়, তখন কৃষক বাধ্য হন আগত বেপারি বা ফড়িয়ার নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি করতে। এই মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবস্থা শুধু অদক্ষ নয়, বরং কাঠামোগতভাবে এমনভাবে তৈরি যেখানে দুর্বল পক্ষ কৃষকই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
সিন্ডিকেটের প্রভাব
বৈধ মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবস্থার বাইরে সংগঠিত সিন্ডিকেট সবজি বাজারে আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি করেছে। এসব গোষ্ঠী পারস্পরিক সমঝোতা, মজুতদারি এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে।
সিন্ডিকেটগুলো অনেক ক্ষেত্রে আঞ্চলিক পাইকারি বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। তারা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে সর্বনিম্ন ক্রয়মূল্য নির্ধারণ, নতুন ব্যবসায়ীদের প্রবেশে বাধা এবং বাজারে পণ্য সরবরাহের সময় ও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কিছু সিন্ডিকেট উৎপাদনের মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে সবজি কিনে মজুত করে রাখে এবং ধীরে ধীরে বাজারে ছেড়ে কৃত্রিমভাবে খুচরা দাম বাড়িয়ে দেয়। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই এসব গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যায়। কৃষি গবেষকরাও বারবার উল্লেখ করেছেন, বাজার তদারকির দুর্বলতা, নির্ভরযোগ্য তাৎক্ষণিক বাজার তথ্যের অভাব এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে সিন্ডিকেটগুলো জবাবদিহিতা ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
কোনো কৃষক যদি সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে সরাসরি শহুরে ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রির চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁকে পাইকারি বাজারে প্রবেশের বাধা, অনানুষ্ঠানিক ফি, বাজার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া কিংবা বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখোমুখি হতে হয়।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিদ্যমান পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো এই সমস্যাকে আরও শক্তিশালী করে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা বাজার কমিটি, লাইসেন্স প্রদান, দোকান বরাদ্দ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করেন। ফলে বাজার প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নয়, বরং সম্পর্ক ও প্রভাবের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
করণীয়
এই সংকট সমাধানে তিনটি ক্ষেত্রেই একসঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, ঢাকা-কেন্দ্রিক কোল্ড চেইন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করে দেশের প্রধান সবজি উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে শীতল সংরক্ষণাগার, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত পরিবহন এবং মানসম্মত প্যাকেজিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এই অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল বাজার প্ল্যাটফর্ম চালুর মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি পাইকার ও খুচরা ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বাজারমূল্যের তাৎক্ষণিক তথ্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে এবং অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে।
তৃতীয়ত, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বাজার তদারকি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। মূল্য কারসাজি, বাজারে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে হবে।
ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) প্রযুক্তি এবং স্মার্ট মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্যের সতেজতা পর্যবেক্ষণ, পরিবহন পথ নির্ধারণ এবং অপচয় কমানো সম্ভব। চুক্তিভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাও কৃষক ও রপ্তানিকারক বা খুচরা বিক্রেতার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে কার্যকর হতে পারে।
প্রযুক্তি বিদ্যমান, বাজারের চাহিদাও স্থায়ী। এখন প্রয়োজন এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, যা বর্তমান মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটনির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।
