ড. নুরুল হুদা
এগ্রি টেক মালায়শিয়া
প্রথম দৃষ্টিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকার কৃষি বাজেট নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বলে মনে হতে পারে। গত অর্থবছরের তুলনায় বরাদ্দ বেড়েছে ১ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। সরকারি উপস্থাপনায় এই বৃদ্ধি গুরুত্ব পেয়েছে, আর সেই ব্যাখ্যাকে খুব বেশি প্রশ্নও করা হয়নি। সম্প্রতি লাইটক্যাসল পার্টনারস এবং এসএএফ বাংলাদেশ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এই বৃদ্ধিকে কৃষিখাতের প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন হিসেবে দেখেছেন। তবে সংখ্যাগুলো আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন একটি বাস্তবতা সামনে আসে।
বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭০-এর দশকে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ। বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ১১ দশমিক ২ শতাংশে। সেই বাস্তবতায় প্রায় ৬ শতাংশ নামমাত্র বাজেট বৃদ্ধি ততটা আশাব্যঞ্জক নয়, বিশেষ করে যখন দেখা যায় কৃষি ভর্তুকির বরাদ্দ কমেছে ১ দশমিক ৪ শতাংশ।
এই দুটি তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগের চিত্র স্পষ্ট হয় না। বরং ধারণা জন্মায়, কৃষিখাতকে শক্তিশালী বা রূপান্তরিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে ন্যূনতম সহায়তা দিয়ে খাতটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ কৃষিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে বর্তমান অবস্থায় ধরে রাখাই যেন প্রধান লক্ষ্য। ফলে এই বাজেটকে কৃষির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন না বলে, সীমিত পরিসরে ক্ষয়রোধের প্রচেষ্টা বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত।
উন্নয়ন বাজেট: সংখ্যার আড়ালের বাস্তবতা
গোলটেবিল আলোচনায় সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয়েছে উন্নয়ন বাজেট প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৭ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ার বিষয়টি। কিন্তু এই সংখ্যার পেছনের বাস্তবতা গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৯৩ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯৫ শতাংশ। পরবর্তী দুই অর্থবছরে সেই হার নেমে এসেছে যথাক্রমে ৬০ এবং ৬২ শতাংশে। অর্থাৎ বরাদ্দ বাড়লেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
যে প্রশাসনিক কাঠামো বিদ্যমান বরাদ্দই কার্যকরভাবে ব্যয় করতে পারছে না, সেখানে বরাদ্দ দ্বিগুণ করা কৃষিতে বিনিয়োগের নিশ্চয়তা নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা আর্থিক পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
প্রশ্ন হচ্ছে, মূল সংকট কি বরাদ্দের ঘাটতি, নাকি বাস্তবায়নের দুর্বলতা? বাস্তবতা বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং অর্থ ছাড়ের সক্ষমতায় কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। এই সমস্যার সমাধান ছাড়া কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
মাত্র দুই অর্থবছরের ব্যবধানে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৯৫ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে নেমে আসা কোনো সাময়িক বিচ্যুতি নয়; বরং প্রশাসনিক সক্ষমতার গভীর সংকেত। সেই বাস্তবতাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না এনে কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধিকে সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
যে প্রশ্নটি প্রায় অনালোচিত রয়ে গেল
গোলটেবিল আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি প্রায় উপেক্ষিত ছিল, তা হলো ভর্তুকি বরাদ্দের প্রকৃতি। প্রস্তাবিত বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ হাজার ১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ কম।
বাংলাদেশের কৃষি ভর্তুকির কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ অর্থ সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। বরং সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং আমদানিকারকদের জন্য মূল্য সহায়তা ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যয় করা হয়। একই সঙ্গে কৃষি উপকরণে কর হ্রাসের যে প্রস্তাব এসেছে, তা এই কাঠামোকেই আরও শক্তিশালী করে, যেখানে শিল্পখাত তুলনামূলক বেশি সুবিধা পায়, কিন্তু মাঠপর্যায়ের কৃষকের আয় বাড়ে না।
বিশেষজ্ঞরা যথার্থভাবেই উল্লেখ করেছেন যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা পর্যাপ্ত সুবিধা পান না। কিন্তু কেন এই বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর আলোচনায় অনুপস্থিত ছিল।
মূল কারণ বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা নয়; বরং ভর্তুকি ব্যবস্থার নকশাতেই সমস্যা নিহিত। বর্তমান কাঠামোর প্রধান উদ্দেশ্য কৃষি উপকরণ সরবরাহকারী শিল্পের ব্যয় কমানো, কৃষকের আয় বৃদ্ধি নয়। ফলে ক্ষুদ্র কৃষকদের বঞ্চনা কোনো দুর্ঘটনাজনিত ফল নয়; বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার স্বাভাবিক পরিণতি।
আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামের অস্থিরতা এবং কৃষি উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধির সময়ে ভর্তুকি কমানো কার্যত বাস্তব অর্থে আরও বড় সংকোচনের সমান। আলোচনায় কৃষকের ব্যয় বৃদ্ধিকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, সেই ব্যয় মোকাবিলার প্রধান উপায় হিসেবে ব্যবহৃত ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তেমন প্রশ্ন ওঠেনি। এই অসামঞ্জস্য নীতিগত আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা তুলে ধরে।
কৃষি নীতির কাঠামোগত অন্ধত্ব
গোলটেবিল আলোচনায় এমন ধারণা তুলে ধরা হয়েছে যে সঠিক নীতিগত অগ্রাধিকার এবং কৌশলগত উদ্যোগ বরাদ্দকে কার্যকর ফলাফলে রূপান্তর করতে পারে। কিন্তু বাস্তবায়নের বর্তমান চিত্র সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃষিকে এখনো এমন একটি খাত হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে আরও বেশি ভর্তুকি, আরও বেশি উপকরণ এবং আরও বেশি প্রকল্পই প্রধান সমাধান। অথচ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে কৃষির অবস্থান মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
বর্তমানে কৃষি দেশের জিডিপির মাত্র ১১ দশমিক ২ শতাংশ অবদান রাখলেও প্রায় ৪০ শতাংশ কর্মসংস্থানের উৎস। ফলে মূল প্রশ্ন বরাদ্দের পরিমাণ নয়; বরং বাজেট কৃষির উৎপাদনশীলতা ও কৃষকের আয়ের মধ্যকার ব্যবধান কমাতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে। শুধু সার ভর্তুকি বাড়িয়ে কৃষকের আয় বৃদ্ধি সম্ভব নয়। কৃষকের উৎপাদনশীলতা, বাজারে ন্যায্যমূল্য, মূল্য সংযোজন এবং আয় নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এই বৈষম্য দূর হবে না।
কৃষক কার্ড কর্মসূচি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং ফসল কাটার পর অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব উদ্যোগ মূল সমস্যার পরিবর্তে উপসর্গ মোকাবিলায় বেশি কার্যকর।
যতদিন পর্যন্ত নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞ মহল স্পষ্টভাবে স্বীকার না করবেন যে বাস্তবায়ন সক্ষমতা ছাড়া বাজেট বৃদ্ধি অর্থহীন, বর্তমান ভর্তুকি কাঠামো শিল্পকে কৃষকের চেয়ে বেশি সুবিধা দেয় এবং কৃষির কাঠামোগত রূপান্তরের জন্য উপকরণভিত্তিক নয়, আয়ভিত্তিক বরাদ্দ প্রয়োজন, ততদিন পর্যন্ত কৃষি বাজেট নিয়ে বার্ষিক আলোচনা মূলত সংখ্যার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার আনুষ্ঠানিক উদযাপন হিসেবেই থেকে যাবে। বাস্তব বিশ্লেষণে যার ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে উঠছে।
