শেখ সেলিম
২০০১ সালের সেপ্টেম্বরে যখন টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনা ঘটে, তখন আমি তরুণ এক গবেষক। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার জন্য গবেষণা প্রস্তাব তৈরি করছিলাম। পঁচিশ বছর পরও সেই সপ্তাহের ভার আমি অনুভব করি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, স্মৃতিতে সেই ভার যেন আরও গভীর হয়েছে।
টেলিভিশনের পর্দায় আমি দেখেছিলাম এমন এক শহরের ওপর হামলা, যে শহরে একদিন নিজের জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। আন্তর্জাতিক আইনের যেকোনো গুরুতর বিশ্লেষণেই ঘটনাটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায়, কারণ পরিকল্পিতভাবে নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। হামলার পরের দিনগুলোতে নিহত হাজারো মানুষের জন্য শোক অনুভব করেছি। পাশাপাশি মনে জন্ম নিয়েছিল এক নীরব, ক্রমশ বাড়তে থাকা ভয়, কোনো অদৃশ্য তালিকায় হয়তো এখন আমার মতো মানুষদেরও সেই হামলাকারীদের সঙ্গে এক কাতারে বিবেচনা করা হবে।
সেই সপ্তাহে আমার উদ্বেগ ছিল খুবই ব্যক্তিগত। কোনো আবেদনপত্রে মুসলিম নাম লেখা থাকলে তার জন্য আমাকে এমন কোনো মূল্য দিতে হবে কি না, যার হিসাব আগে কখনো করিনি। তখন আমার বয়স কুড়ির কোঠায়। সাধারণ জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তে সেই ভয় ঢুকে পড়েছিল। ডাকযোগে একটি খাম পাঠানোর আগে থেমে যাওয়া, কেউ না করা প্রশ্নের উত্তর মনে মনে প্রস্তুত করা, আর ধীরে ধীরে বুঝতে শেখা যে নির্দোষ প্রমাণের দায়ও হয়তো একদিন আমার ওপর এসে পড়তে পারে।
পঁচিশ বছর পর, পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি দীর্ঘ পেশাজীবন পেরিয়ে এসে বুঝতে পারি, একজন শিক্ষার্থী হিসেবে যে প্রশ্নটি করেছিলাম, তা একই সঙ্গে খুব ছোট এবং আশ্চর্যজনকভাবে দূরদর্শী ছিল। ছোট ছিল, কারণ ৯/১১ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বা শিক্ষার্থীদের বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত বদলায়নি, বাংলাদেশ ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে মানুষ, অর্থ ও জ্ঞান চলাচলের পুরো কাঠামোকেই বদলে দিয়েছে। আর দূরদর্শী ছিল, কারণ ব্যক্তি হিসেবে যে অবিশ্বাসের আশঙ্কা করেছিলাম, পরে তা পরিমাপযোগ্য, নথিবদ্ধ এবং দীর্ঘস্থায়ী একটি ব্যবস্থাগত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।
ব্যক্তিগত শোক থেকে বৃহত্তর উপলব্ধি
আজকের একজন অর্থনীতিবিদ ৯/১১-কে শুধু নিরাপত্তাজনিত ঘটনা হিসেবে দেখবেন না। বরং একে এমন একটি আকস্মিক অভিঘাত হিসেবে দেখবেন, যা দুটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থার আপেক্ষিক মূল্য বদলে দিয়েছিল। তারপর সেই বদলে যাওয়া আস্থা কীভাবে শিক্ষা, শ্রমবাজার, প্রবাসী আয়, অভিবাসন ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলেছে, তার হিসাব করা হবে।
তবু অর্থনীতির ভাষা সেই সকালের নৈতিক বাস্তবতার সামনে কখনো কখনো খুবই সীমিত মনে হয়। যখন মানুষকে শুধু বেসামরিক নাগরিক হওয়ার কারণেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়, তখন বিশ্ব অনেক আগেই সেই অপরাধের একটি নাম নির্ধারণ করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ।
আমার কাছে এই নামকরণ গুরুত্বপূর্ণ দুটি কারণে, এবং দুটোই আমার গবেষণাজীবনকে প্রভাবিত করেছে। প্রথমত, এতে নিহত মানুষদের প্রতি ন্যায়বিচার ও সম্মান প্রদর্শন করা হয়। দ্বিতীয়ত, এটি মনে করিয়ে দেয়, এমন অপরাধের সঠিক জবাব হলো অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ, নির্দোষ মানুষের ওপর সন্দেহ ছড়িয়ে দেওয়া নয়।
গত পঁচিশ বছরে আমার নিজের অবস্থানও বদলেছে। একসময় দূরদেশে বসে ভিসার আবেদনে কী ঘটতে পারে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন এক তরুণ ছিলাম। এখন একজন শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে সেই আবেদনপত্রকে বৃহত্তর নীতিনির্ধারণী ব্যবস্থায় সৃষ্ট অসংখ্য বাধার একটি তথ্য হিসেবে দেখি। একসময় ছিলাম ভীত এক প্রত্যক্ষদর্শী। এখন বিশ্বাস করি, যেখানেই নির্দোষ মানুষের ওপর সমষ্টিগত শাস্তি আরোপ করা হয়, তা যে অপরাধের জবাব দেওয়ার দাবি করে, তারই এক ধরনের প্রতিরূপ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমা বিশ্ব: সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি, বদলে গেছে
২০০১ সালের পরের বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নিরাপত্তা ও সামরিক খাতে ব্যয় বাড়াতে তাদের বাজেটের বড় অংশ পুনর্বিন্যাস করে। এর ফলে গবেষণা, বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা এবং যে শিক্ষাবিনিময় কর্মসূচি আমার প্রজন্মের অনেককে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার দিকে আকৃষ্ট করেছিল, সেসব ক্ষেত্র তুলনামূলকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও ৯/১১ হামলার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তারপরও হামলার পর সৃষ্ট নেতিবাচক ধারণার প্রভাব বাংলাদেশকে বহন করতে হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সহায়তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কৌশলগত গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ থেকে গেছে তুলনামূলকভাবে দ্বিতীয় সারির অংশীদার হিসেবে। দেশটির গুরুত্ব মূলত তৈরি পোশাক রপ্তানি ও শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত ছিল, কৌশলগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে নয়।
পরবর্তী কয়েক দশকে সম্পর্ক আরও বেশি লেনদেননির্ভর ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। বাণিজ্য সুবিধা, অর্থায়ন এবং শিক্ষাবিষয়ক অংশীদারত্ব অব্যাহত থাকলেও এসব সম্পর্কের ওপর আগের তুলনায় বেশি প্রভাব ফেলতে থাকে ঝুঁকি মূল্যায়ন। আগে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু মেধার ভিত্তিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী গ্রহণ করত, তাদের অনেকেই ভিসা যাচাই, পটভূমি অনুসন্ধান এবং কখনো কখনো সন্দেহের অতিরিক্ত স্তর যুক্ত করে।
প্রবাসী আয় ও অভিবাসন: এনএসইইআরএসের দীর্ঘ ছায়া
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় অভিবাসনের তথ্য থেকে। ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র চালু করে ন্যাশনাল সিকিউরিটি এন্ট্রি এক্সিট রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম, সংক্ষেপে এনএসইইআরএস। ২৫টি দেশের অস্থায়ী অভিবাসীদের জন্য এই বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, যার আওতায় বাংলাদেশও ছিল।
দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ৭ হাজার ২৩৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক এই ব্যবস্থায় নিবন্ধিত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৮৫৫ জনকে বহিষ্কারসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। আর বিভিন্ন কমিউনিটি সূত্রের হিসাবে, পাঁচ হাজারের বেশি বাংলাদেশি সেই প্রক্রিয়ার ঝুঁকি না নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
এটা কোনো বিমূর্ত নীতির গল্প নয়। এর পেছনে ছিল হাজারো মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, চাকরি, পড়াশোনা ও পারিবারিক সম্পর্ক ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। কারণ তাদের কাছে মনে হয়েছিল, অভিবাসন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়াটাই হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই ভয়ের প্রভাব সরাসরি নিবন্ধিত ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন কমিউনিটি নেতা জানিয়েছিলেন, মুসলিম, আরব ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষ, এমনকি বৈধভাবে বসবাসকারীরাও অপরাধের শিকার হলেও তা জানানোর কিংবা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যাপারে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন।
অর্থনীতির ভাষায়, একে আস্থার নেতিবাচক বহিঃপ্রভাব বলা যায়। অল্পসংখ্যক মানুষের ওপর শাস্তিমূলক আচরণ পুরো একটি জনগোষ্ঠীর আচরণের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে, যদিও সেই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না।
আরও নরম ভাষায় বললেও বিষয়টির নৈতিক অস্বস্তি থেকেই যায়। মানবতাবিরোধী একটি অপরাধের জবাব দিতে গিয়ে কোনো রাষ্ট্র যদি এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যার অনিচ্ছাকৃত ফল হিসেবে বংশপরিচয় বা ধর্মের ভিত্তিতে পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর শাস্তির ছায়া পড়ে, তাহলে প্রশ্ন তোলা জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদি তথ্য অবশ্য আরও জটিল একটি চিত্র তুলে ধরে। ২০১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশিদের স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পাওয়ার সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৮৯০। ২০২০ সালে তা কমে ৯ হাজার ১০-এ এবং ২০২১ সালে ৬ হাজার ১৮০-তে দাঁড়ায়। মহামারির অভিঘাতের মধ্যে এই পতন ঘটে। পরে ২০২২ সালে সংখ্যা বেড়ে ১০ হাজার ১৪০ এবং ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ২৪০-এ পৌঁছায়।
দশকের পর দশক ধরে পরিবারভিত্তিক পৃষ্ঠপোষকতাই বাংলাদেশিদের অভিবাসনের প্রধান পথ হিসেবে রয়েছে। ৯/১১-এর অনেক আগে থেকেই এই প্রবণতা ছিল এবং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক পরিবর্তনের মধ্যেও তা টিকে আছে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানভিত্তিক ও বৈচিত্র্যভিত্তিক অভিবাসনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিতই থেকেছে।
২০০১ সালের পর বদলে যাওয়া বিষয়টি অভিবাসনের কাঠামো নয়, বরং তার মানসিক ও প্রশাসনিক ব্যয়। আমার প্রজন্মের আগের মানুষের তুলনায় পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিটি আবেদন যেন সন্দেহের একটি অদৃশ্য কর বহন করতে শুরু করে।
প্রবাসী আয়ের গল্প অবশ্য বিচ্ছেদের নয়, বরং স্থিতিস্থাপকতার। গত বছর বাংলাদেশ সর্বকালের সর্বোচ্চ ৩২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রবাসী আয় পেয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে মোট প্রবাসী আয়ের ১১ শতাংশ, যা প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে চতুর্থ স্থানে রেখেছে।
২০০১ সালের পরের কঠোর যাচাই ও নজরদারি পেরিয়েও যারা টিকে ছিলেন, তারা দেশে অর্থ পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন। তবে তাদের প্রশাসনিক ও মানসিক চাপ ছিল আগের চেয়ে বেশি। গত পঁচিশ বছরের সম্ভবত সবচেয়ে স্পষ্ট শিক্ষা এখানেই, নিরাপত্তানীতি মানুষের চলাচলের ব্যয় বাড়াতে পারে, কিন্তু যে অর্থনৈতিক বাস্তবতা মানুষকে অভিবাসনে উৎসাহিত করে, তা সহজে থামাতে পারে না।
আস্থা, অবিশ্বাস ও অভিবাসনের সেতু
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা ২০০২ সালেই থেমে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে তার রূপ বদলেছে।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেক আমেরিকান নিজেদের পরিচয়কে বাবা-মায়ের প্রজন্মের ওপর আরোপিত সংকীর্ণ ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় পরিচয় কিংবা সরাসরি আমেরিকান পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করছেন। তবে অন্তর্নিহিত সন্দেহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং তার কারণ বদলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসবাদের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও নির্বাচনী আচরণের মতো কারণ দেখিয়ে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনাও দেখা গেছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, ২০০১ সালের পর তৈরি হওয়া ব্যবস্থাগুলো বিলুপ্ত হওয়ার বদলে নতুন নতুন যুক্তি ও কারণের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে।
সাধারণ পরিবারের জন্য এর অর্থ হলো, আগে অভিবাসী হয়ে যাওয়া আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ ও পুনর্মিলনেও দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হওয়া। ভিসা পেতে বিলম্ব, পরিবার পুনর্মিলনের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং নীতিগত স্থগিতাদেশ সাধারণ পারিবারিক সফরকেও বহু বছরের অনিশ্চয়তায় পরিণত করেছে। ফলে প্রবাসী জনগোষ্ঠী যে অর্থ, জ্ঞান ও দক্ষতার কার্যকর সেতু হিসেবে কাজ করতে পারত, সেই সম্পর্কও দুর্বল হয়েছে।
যে সংস্কারের প্রস্তাব আমি রাখছি
তরুণ অর্থনীতিবিদ হিসেবে গণসন্ত্রাসের কোনো সমাধান আমার হাতে ছিল না। ছিল শুধু ভয়। দূরদেশে বসে থাকা কুড়ির কোঠার একজন আবেদনকারীর ভয়কে তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই। কোটি মানুষের জীবনে ছড়িয়ে থাকা এমন ছোট ছোট মানবিক ক্ষতই শেষ পর্যন্ত একটি বড় অপরাধের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে।
পঁচিশ বছরের গবেষণা ও অভিজ্ঞতার পর অন্তত বলতে পারি, সংস্কারের দিক কোন পথে হওয়া উচিত।
জাতীয়তার ভিত্তিতে মানুষকে আলাদা করে সন্দেহ করার পদ্ধতি মূলত পরিসংখ্যানগত বৈষম্যের একটি সরল রূপ। ব্যক্তিকে আলাদাভাবে যাচাই করা ব্যয়বহুল বলে একটি গোষ্ঠীর পরিচয়কে ঝুঁকির পরিমাপক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রাষ্ট্রের উচিত এর পরিবর্তে উন্নত তথ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা। বিশেষ করে সংঘাত ও পরোক্ষ যুদ্ধকে অর্থায়নকারী আর্থিক কাঠামো শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমে গোষ্ঠীগত পরিচয়ের ওপর নির্ভর না করে প্রকৃত ঝুঁকি চিহ্নিত করা সম্ভব হবে এবং নির্দোষ জনগোষ্ঠীর ওপর আরোপিত অপ্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ক্ষতিও কমবে।
একই সঙ্গে অভিবাসন ও শিক্ষানীতিকে স্বল্পমেয়াদি নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকে আলাদা করতে হবে। মানবসম্পদে বিনিয়োগের ফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। নীতির ক্ষেত্রে যদি সবসময় অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে সেই বিনিয়োগের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণও কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই শিক্ষার্থী ও দক্ষ কর্মীদের জন্য বহু বছরের, নবায়নযোগ্য ভিসা কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। হঠাৎ নির্বাহী সিদ্ধান্তে স্থগিতাদেশের বদলে এমন নীতি দরকার, যাতে পরিবার, বিশ্ববিদ্যালয় ও নিয়োগদাতারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারে।
প্রবাসী আয় ও অভিবাসী জনগোষ্ঠীর যোগাযোগব্যবস্থাকেও উন্নয়নের অবকাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। এসব অর্থপ্রবাহ একটি জনকল্যাণমূলক সম্পদের মতো কাজ করে এবং হঠাৎ নীতিগত বাধা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য। বাণিজ্য চুক্তি যেমন হঠাৎ আরোপিত শুল্ক থেকে সরবরাহব্যবস্থাকে সুরক্ষা দেয়, তেমনি প্রবাসী আয় ও অভিবাসন ব্যবস্থাকেও আকস্মিক নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।
এসব ব্যবস্থাকে অর্থনীতির কাঠামোগত অংশ হিসেবে বিবেচনা না করে পার্শ্ববর্তী বিষয় হিসেবে দেখার ফলে তারা এমন নীতিগত পরিবর্তনের কাছে দুর্বল হয়ে পড়েছে, যার সঙ্গে তাদের প্রকৃত অর্থনৈতিক ভূমিকার কোনো সম্পর্ক নেই।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য উন্নয়ন সহায়তার কাঠামোও নতুন করে ভাবতে হবে। নিরাপত্তাকেন্দ্রিক বরাদ্দের পরিবর্তে শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরিতে প্রকৃত বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। এর মাধ্যমে সেই কাঠামোগত বৈষম্য কিছুটা দূর করা সম্ভব, যার কারণে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো কৌশলগতভাবে প্রান্তিক অবস্থানে থেকে যায়, যদিও তাদের প্রবাসী জনগোষ্ঠী পশ্চিমা অর্থনীতিতে বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য অবদান রাখছে।
এসব সংস্কার ভবিষ্যতে সন্ত্রাসী হামলা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করবে, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের জবাব যদি নির্দোষ মানুষের মধ্যে সন্দেহ বণ্টন করে দেওয়া হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত এমন ক্ষোভ তৈরি করে, যার ওপর সহিংস উগ্রবাদী আন্দোলনগুলো নিজেদের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে। এই নীরব ক্ষতও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আমার প্রস্তাবিত মূল সংস্কার তাই একটাই: অপরাধীর দায় নির্দোষ মানুষের ওপর চাপানো বন্ধ করতে হবে। আইনের শাসনকে ব্যক্তির পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে এবং নিরাপত্তার নামে আস্থা, মানবিক মর্যাদা ও মানুষের চলাচলের অধিকারকে অযথা সংকুচিত করা যাবে না।
