শেখ সেলিম
অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অথচ সবচেয়ে অসম্পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাগুলোর একটি। এই সম্পর্কের ভিত্তিতে রয়েছে ভৌগোলিক বৈষম্য, রাজনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা এবং সদিচ্ছাকে কার্যকর ও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতিতে রূপ দিতে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা।
অর্থনৈতিক তত্ত্বের চুক্তি নকশার কাঠামোতে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমান পানি বণ্টন ব্যবস্থা কেবল একটি কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগতভাবে দুর্বল চুক্তি। এই ব্যবস্থায় প্রণোদনার ভারসাম্য নেই, বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবায়ন ব্যবস্থা নেই এবং ঝুঁকির বড় অংশ নিয়মিতভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। তবে দুর্বল পক্ষটি আসলে কে, সে প্রশ্নও একেবারে সরল নয়। এই কাঠামোর সংস্কার শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়। বিষয়টি মূলত সেই প্রাতিষ্ঠানিক নকশার প্রশ্ন, যার ওপর একটি কার্যকর চুক্তির ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে।
অসম চুক্তির ইতিহাস
ভারত ও বাংলাদেশ ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী ভাগাভাগি করে। এর অধিকাংশই ভারতের ভূখণ্ডে উৎপন্ন হয়েছে অথবা ভারত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই জলপ্রবাহগত বাস্তবতা বাংলাদেশকে নিম্নপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল একটি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে, যা পানি প্রবাহ নিয়ে যেকোনো আলোচনায় তুলনামূলকভাবে দুর্বল চুক্তি অংশীদার।
দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হলো ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি, যা তুলনামূলক উষ্ণ কূটনৈতিক পরিবেশে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তিতে জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানিপ্রবাহ বণ্টনের একটি সূত্র নির্ধারণ করা হয় এবং বাংলাদেশের জন্য একটি ন্যূনতম পানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা রাখা হয়।
কিন্তু গঙ্গা চুক্তি মূলত একটি অসম্পূর্ণ চুক্তি। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়কাল এবং একটি মাত্র নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, অথচ বাকি ৫৩টি অভিন্ন নদী কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থার আওতায় আসেনি। চুক্তিতে কার্যকর বাস্তবায়ন ধারা নেই, তৃতীয় পক্ষের সালিশি ব্যবস্থা নেই এবং চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের কোনো বিধানও নেই। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্ষা মৌসুম নিয়ে সেখানে কোনো বিধান নেই। অথচ ভারতের উজানে নেওয়া পানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে বর্ষাকালেই, যখন বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এই নীরবতা কোনো সামান্য ত্রুটি নয়। বরং এটিই চুক্তির সবচেয়ে বড় নকশাগত দুর্বলতা।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচনায় থাকা তিস্তা চুক্তিও এখনও স্বাক্ষরিত হয়নি। ভারতের ফেডারেল কাঠামো এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের একটি রাজ্য সরকার এমন একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তিকে আটকে রাখতে পেরেছে, যার প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নীতিগত সম্মতি দিয়েছিল। এখানেও আরেকটি নকশাগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে: আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উপ-জাতীয় অংশীজনদের বাধ্য করার মতো কার্যকর অভ্যন্তরীণ অনুমোদন কাঠামোর অভাব।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হয়েছে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা, এমন একটি চুক্তির জন্য যা কখনও বাস্তবে রূপ পায়নি। এদিকে তিস্তার প্রবাহ একতরফাভাবে ভারত নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। বর্ষাকালে অনেক সময় পর্যাপ্ত আগাম সতর্কতা ছাড়াই বিপুল পরিমাণ পানি ছেড়ে দেওয়া হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির ওপর।
চুক্তিগত ঝুঁকি হিসেবে বর্ষাকালের বন্যা
চুক্তি নকশা তত্ত্বে “মোরাল হ্যাজার্ড” বা নৈতিক ঝুঁকি বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে চুক্তির একটি পক্ষ এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে যার খরচ অন্য পক্ষকে বহন করতে হয়, অথচ সিদ্ধান্তগ্রহণকারী পক্ষ নিজে সেই খরচের খুব সামান্য অংশ বহন করে বা একেবারেই করে না।
বর্ষা মৌসুমে ভারতের উজানের বাঁধ ও ব্যারাজ পরিচালনা এই ঝুঁকির একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। ফারাক্কা ব্যারাজ বা ত্রিপুরার ডুম্বুর বাঁধের মতো অবকাঠামোর পেছনে থাকা জলাধারগুলো যখন ধারণক্ষমতার সীমায় পৌঁছে যায়, তখন ভারত নিজস্ব অবকাঠামো রক্ষার জন্য দ্রুত পানি ছেড়ে দেয়। সেই অতিরিক্ত প্রবাহ কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশে পৌঁছে বন্যা সৃষ্টি করে, কৃষিজমি প্লাবিত করে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই ক্ষতির কোনো অংশ ভারতের ওপর বর্তায় না। পুরো অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যয় বাংলাদেশকেই বহন করতে হয়। অপূর্ণাঙ্গ চুক্তির ক্ষেত্রে ঝুঁকি অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার এটি একটি পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ। উজানের পক্ষ এমন সব সিদ্ধান্তের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, যার ফলে নিম্নপ্রবাহের রাষ্ট্রের ওপর বিশাল নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কোনো জরিমানা নেই, ক্ষতিপূরণ নেই, এমনকি পূর্বানুমতির বাধ্যবাধকতাও নেই। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক তত্ত্ব যে ফলাফল অনুমান করে, বাস্তব অভিজ্ঞতাও তাই দেখায়: উজানের পক্ষ নিজস্ব স্বল্পমেয়াদি স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে থাকবে এবং তার খরচ বহন করবে নিম্নপ্রবাহের পক্ষ।
বাংলাদেশ সরকারের করণীয়
বাংলাদেশ সরকারের উচিত ভবিষ্যৎ পানি আলোচনাকে কূটনৈতিক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে নয়, বরং কঠোর চুক্তি নকশার অনুশীলন হিসেবে দেখা। প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হওয়া উচিত ৫৪টি অভিন্ন নদীকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত কাঠামোগত চুক্তির দাবি তোলা। বর্তমান নদীভিত্তিক খণ্ডিত পদ্ধতি ভারতের জন্য রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ন্যায্য ব্যবহার এবং উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করার নীতির ভিত্তিতে গঠিত একটি কাঠামোগত চুক্তি আলোচনার ভিত্তিকে অনুগ্রহের প্রশ্ন থেকে আইনি অধিকারের প্রশ্নে উন্নীত করতে পারে।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলক আগাম অবহিতকরণ ধারা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাতে হবে। বর্ষাকালে নির্ধারিত সীমার বেশি পানি উজান থেকে ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আগাম নোটিশ বাধ্যতামূলক দিতে হবে। আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা চুক্তিতে এটি একটি স্বীকৃত ও প্রয়োজনীয় বিধান। এমন ব্যবস্থা না থাকলে বাংলাদেশের পক্ষে নির্ভরযোগ্যভাবে বন্যা প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা করা, মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া কিংবা কৃষিজমি রক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয় না।
আগাম অবহিতকরণ ভারতের সার্বভৌম কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ করে না; বরং বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে, যাতে নিম্নপ্রবাহের ঝুঁকি মোকাবিলা করা যায়। এর পাশাপাশি, একতরফাভাবে পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত একটি ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। ক্ষতিপূরণ ধারা মূলত প্রণোদনার ভারসাম্য সৃষ্টি করে, যা বর্তমানে অনুপস্থিত।
কাজটি বাস্তবে যতটা কঠিন, অর্থনৈতিক যুক্তির দিক থেকে ততটা অযৌক্তিক নয়। দ্রুত পানি ছেড়ে দেওয়ার অর্থনৈতিক ব্যয়ের একটি অংশ যখন ভারতের ওপর বর্তাবে, তখন জলাধার ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল আচরণের জন্য স্বাভাবিক চাপ তৈরি হবে। চুক্তি নকশার মৌলিক যুক্তিও এখানেই নিহিত: এমন প্রণোদনা তৈরি করা, যাতে উভয় পক্ষের স্বার্থ সম্মিলিতভাবে সবচেয়ে কার্যকর ফলাফলের দিকে পরিচালিত হয়।
সবশেষে, বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক পরিসরে বিষয়টি আরও সক্রিয়ভাবে উত্থাপন করা। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক জলপথ কনভেনশনের মতো ফোরামে বিষয়টি তুলে ধরে আন্তর্জাতিক নীতিগত সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করা যেতে পারে। ভারত এই কনভেনশনের সদস্য না হলেও বাংলাদেশ নৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় দুর্বলতা কমায় এবং এমন সুনামগত ব্যয় সৃষ্টি করে, যা কেবল দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভব নয়। পানি শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়। বাংলাদেশের জন্য পানি এমন একটি চুক্তির প্রতীক, যা এখনও সঠিকভাবে লেখা হয়নি। আর ভারতের জন্য প্রশ্নটি হলো, সেই চুক্তির প্রতিটি লাইনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রণোদনাগুলো কতটা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
