আবুল ফজল
ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান
বিশ শতকের অধিকাংশ সময়জুড়ে পাট ছিল বাংলাদেশের পরিচয়ের ফসল। এই সোনালি আঁশ অবিভক্ত বাংলার বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার গড়ে তুলেছিল, পাকিস্তান রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে অর্থ জুগিয়েছিল এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অর্থনৈতিক ভিত্তির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিল।
সেই আধিপত্যের যুগ অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। কৃত্রিম বিকল্প উপকরণের বিস্তার, বৈশ্বিক প্যাকেজিং বাজারের পরিবর্তন এবং চাষ প্রযুক্তি ও শিল্প প্রক্রিয়াজাতকরণে দীর্ঘদিনের অবহেলা পাটের অর্থনৈতিক গুরুত্বকে ক্ষয় করেছে। তবুও পাট পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি। প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ, পাটের জিনতত্ত্বে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং শিল্পক্ষেত্রে পাটের বহুমুখী ব্যবহার নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে পাট শুধুমাত্র অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, বরং নতুনভাবে পুনর্জাগরণের সম্ভাবনা বহন করছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পরিবেশের কার্যকর সহায়তা।
বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের বৃহত্তম কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিকারক দেশ। এ খাত থেকে বছরে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। পাট চাষ প্রধানত উত্তর ও মধ্য বাংলাদেশের নদীবিধৌত জেলাগুলোতে কেন্দ্রীভূত, যেমন ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, রংপুর এবং আশপাশের অঞ্চল, যেখানে পলিমাটি ও মৌসুমি বন্যা পাট চাষের জন্য প্রায় আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। প্রায় ৪০ লাখ কৃষক পরিবার আয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশের জন্য পাট চাষের ওপর নির্ভরশীল, ফলে আপেক্ষিক পতনের সময়েও এটি গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফসল।
তবে কাঠামোগত সমস্যাগুলো গুরুতর এবং বহুদিন ধরেই আলোচিত। পাট চাষের জমি বৃদ্ধি পাওয়ার বদলে ওঠানামা করেছে, কারণ সবজি ও ধানের মতো তুলনামূলক বেশি লাভজনক ফসলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা রয়েছে। জাগ দেওয়ার প্রক্রিয়া এখনও মূলত হাতে পরিচালিত হয় এবং এটি পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। এতে বিপুল পরিমাণ পরিষ্কার পানির প্রয়োজন হয় এবং সৃষ্ট জৈব বর্জ্য স্থানীয় জলাশয়ের ক্ষতি করে। কৃষক পর্যায়ে পাটের দামও অস্থির এবং প্রায়ই অপ্রতুল, ফলে বাজারের ওঠানামার ধাক্কা সামাল দেওয়া কৃষকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
শিল্প খাতের অবস্থাও একইভাবে মিশ্র। ১৯৭০ এর দশকের জাতীয়করণের ধারাবাহিকতায় পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন বা বিজেএমসি দীর্ঘদিন ধরে অদক্ষতা, অতিরিক্ত জনবল এবং মান, গতি ও ব্যয়ের দিক থেকে বেসরকারি মিলগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ব্যর্থতার কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসান বহন করছে। বিজেএমসি সংস্কার বা পুনর্গঠন নিয়ে রাজনৈতিক জটিলতা একে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অর্থের বোঝা হিসেবে রেখেছে এবং একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলকভাবে পরিচালিত বেসরকারি পাটকলগুলোর জন্য বাজার পরিস্থিতিকেও বিকৃত করেছে।
উদীয়মান সম্ভাবনা
এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও পাটের ভবিষ্যৎ নানা দিক থেকে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক আন্দোলন, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য এবং বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের আইনগত নিষেধাজ্ঞা, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং উপকরণের চাহিদা বাড়িয়ে তুলছে। এই চাহিদা পূরণে পাট বিশেষভাবে উপযোগী। এটি জৈবভাবে পচনশীল, কম্পোস্টযোগ্য, চাষের সময় কার্বন শোষণ করে এবং এমন ব্যাগ, মোড়ক ও প্যাকেজিং উপকরণে রূপান্তর করা যায় যা প্লাস্টিকের সরাসরি বিকল্প হতে পারে। বিশ্বের প্রধান পাট উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এই সম্ভাবনার কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
জিওটেক্সটাইল পাটের আরেকটি উচ্চমূল্যের ব্যবহার, যা বাংলাদেশের অবকাঠামোগত প্রয়োজনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। সড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত পাটের জিওটেক্সটাইল মাটি স্থিতিশীল রাখতে, ভাঙন রোধ করতে এবং নরম মাটিতে সড়কের স্থায়িত্ব বাড়াতে সহায়তা করে, যা বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলের সড়ক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভারত ইতোমধ্যে তাদের কিছু সড়ক প্রকল্পে পাটের জিওটেক্সটাইল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের নীতি গ্রহণ করা হলে তা একদিকে উচ্চমূল্যের শিল্প খাত তৈরি করবে, অন্যদিকে সড়ক নির্মাণ সামগ্রীর আমদানি নির্ভরতা কমাবে এবং উন্নতমানের পাট প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য টেকসই অভ্যন্তরীণ বাজার সৃষ্টি করবে।
এছাড়াও অটোমোবাইল ও আসবাব শিল্পে ব্যবহৃত পাটভিত্তিক কম্পোজিট, পানি পরিশোধনের জন্য পাটভিত্তিক অ্যাক্টিভেটেড কার্বন এবং কাগজ উৎপাদনে কাঠের মণ্ডের বিকল্প হিসেবে পাটের পাল্প নিয়ে বিশ্বব্যাপী গবেষণা ও বাণিজ্যিক উন্নয়ন এগিয়ে চলেছে। ২০১০ সালে ড. মাকসুদুল আলমের নেতৃত্বে পাটের জিনোম উন্মোচন উচ্চ ফলনশীল, রোগ প্রতিরোধী এবং উন্নত আঁশমানসম্পন্ন জাত উদ্ভাবনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি করে। তবে এই জিনগত গবেষণাকে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর বীজে রূপ দিতে গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ জরুরি।
জরুরি নীতিগত সংস্কার
প্রথমত, বিজেএমসিকে কার্যকরভাবে পুনর্গঠন করতে হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল মডেল বহু দশক ধরে সব ধরনের সূচকে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থনৈতিক বাস্তবতা বলছে, স্বচ্ছ বেসরকারিকরণ অথবা সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এমন প্রতিষ্ঠানের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে যারা প্রতিযোগিতামূলকভাবে মিল পরিচালনা করতে সক্ষম। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য পুনর্বাসন ও পুনঃপ্রশিক্ষণের বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচিও গড়ে তুলতে হবে। বিজেএমসির ব্যর্থতা টিকিয়ে রাখতে সরকারি ভর্তুকি অব্যাহত রাখা মানে আরও কার্যকর উদ্যোগ থেকে সম্পদ সরিয়ে নেওয়া।
দ্বিতীয়ত, কাঁচা পাটের জন্য একটি ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ ও তা ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখতে হবে। প্রতিযোগী ফসলের বিপরীতে কৃষকরা পাট চাষে আগ্রহী থাকবে না, যদি না মূল্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। সরকার নির্ধারিত স্বচ্ছ ও বার্ষিক পর্যালোচনাভিত্তিক ন্যূনতম মূল্য এবং প্রয়োজনে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা কৃষকদের উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে এবং শিল্প উদ্যোক্তা ও রপ্তানিকারকদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনায় আস্থা দেবে।
তৃতীয়ত, মূল্য সংযোজনভিত্তিক পাটপণ্য উন্নয়ন এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণকে কৌশলগত বাণিজ্য অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রধানত কাঁচা পাট ও নিম্নমানের পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে। অথচ জিওটেক্সটাইল, কম্পোজিট, পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং এবং প্রযুক্তিনির্ভর টেক্সটাইল পণ্যে মূল্য সংযোজন অনেক বেশি। গবেষণা ও উন্নয়ন সহায়তা, আন্তর্জাতিক মান সনদ অর্জনে সহযোগিতা এবং সমন্বিত বাণিজ্য প্রচারণাসহ একটি নিবেদিত রপ্তানি উন্নয়ন কর্মসূচি বাংলাদেশের পাট রপ্তানিকে উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে এগিয়ে নিতে পারে, যার চাহিদা বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে দ্রুত বাড়ছে।
সোনালি আঁশের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন দূরদর্শী নীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং আন্তরিক বিনিয়োগ।
