সুফিয়ান শেখ
আইলসবারি গ্রামার স্কুল, যুক্তরাজ্য
অনিকেত বুলেটিনে প্রকাশিত ড. উমাইমা ইমরানের নিবন্ধে দেখানো হয়েছে, দীর্ঘ সংঘাত ও গণহত্যার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সামনে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সেই আলোচনার পাশাপাশি একটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে আসে-এমন কী পরিবর্তন ঘটেছে, যার ফলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের জন্য এখন পারস্পরিকভাবে লাভজনক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তোলার উপযুক্ত সময় সৃষ্টি হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার ভারতকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে দিল্লি ও ঢাকার রাজনৈতিক যোগাযোগের ওপরই সেই সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় সেই সময় বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে শক্তিশালী রাষ্ট্রের ছায়ায় কৌশলগতভাবে যুক্ত থাকা বা ব্যান্ডওয়াগনিং নীতির অনুসারী হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। অর্থাৎ, তুলনামূলক শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করা হয়েছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান, শেখ হাসিনার দেশত্যাগ এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একমুখী নির্ভরতার পরিবর্তে আরও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায়, ব্যান্ডওয়াগনিং থেকে হেজিং বা বিকল্প অংশীদারদের জন্যও সুযোগ উন্মুক্ত রেখে ভারসাম্যভিত্তিক কৌশলের দিকে এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অনিশ্চয়তা এবং আস্থার ঘাটতি বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদার খোঁজার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেই পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের সম্ভাবনা নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে।
প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিবর্তন
শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে ব্যান্ডওয়াগনিং কৌশলের আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়। অর্থাৎ, তুলনামূলক দুর্বল একটি রাষ্ট্র শক্তিশালী প্রতিবেশীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক রাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি সরকারনির্ভর ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠতাই দুই দেশের সম্পর্কের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
এই ঘনিষ্ঠতার অর্থনৈতিক ভিত্তিও ছিল দৃঢ়। ২০২৩ থেকে ২০২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। ফলে ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে অবস্থান ধরে রাখে। একই বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার বৈঠকে ১০টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, যার মধ্যে সাতটি নতুন এবং তিনটি নবায়ন করা হয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিস্তৃতি দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতারই ইঙ্গিত বহন করে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই সম্পর্ক ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ভূরাজনৈতিক স্বার্থ এবং আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। এই সময়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কঠোর অবস্থান এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় সহযোগিতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে। ২০১৭ সালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়ে যায়। সীমান্তে হতাহতের ঘটনা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনার উৎস ছিল। ২০২৩ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে ২৮ জন বাংলাদেশি নিহত হন। আবার ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সীমান্ত এলাকায় মোট ১ হাজার ২৩৬ জনের মৃত্যুর তথ্যও আলোচনায় এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এসব প্রশ্ন নতুন মাত্রা পায় এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক কূটনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, প্রাণহানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বাংলাদেশের একটি অংশের জনমনে ভারতের ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল, সরকার পরিবর্তনের পর তা আর আগের রূপে টিকে থাকেনি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ধীরে ধীরে একক নির্ভরতার পরিবর্তে হেজিং বা ভারসাম্যভিত্তিক কৌশলের দিকে অগ্রসর হয়েছে। অর্থাৎ, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও বিকল্প অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে।
বর্তমান বাস্তবতা এবং পাকিস্তানের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে ভারতের প্রতি সরাসরি বিরোধিতার পরিবর্তে বাস্তববাদী ভারসাম্যের নীতি হিসেবে দেখা যায়। ২০২৫ থেকে ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ কমে ৭ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস নির্দেশ করে।
এই পরিবর্তন শুধু বাণিজ্যিক নয়; এর সঙ্গে কৌশলগত বাস্তবতাও জড়িত। অতীতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকে ভারতের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি যেমন লাভবান হয়েছে, তেমনি রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। সেই কারণে আগের সম্পর্কের কাঠামো বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুনর্গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক উদ্যোগ জোরদার করা গেলে পাকিস্তান বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অংশীদারে পরিণত হতে পারে।
উপসংহার
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন ভারসাম্য খুঁজছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস পাকিস্তানের জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক আস্থা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপর।
ভবিষ্যতের সম্পর্ক একক নির্ভরতার পরিবর্তে বহুমাত্রিক অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে কি না, এখন সেই প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা
ব্যান্ডওয়াগনিং (Bandwagoning): আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এমন একটি কৌশল, যেখানে তুলনামূলক দুর্বল রাষ্ট্র শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিরোধিতা না করে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়, যাতে অর্থনৈতিক সুবিধা, নিরাপত্তা সহযোগিতা, কূটনৈতিক সমর্থন বা অন্যান্য কৌশলগত লাভ অর্জন করা যায়।
হেজিং (Hedging): এমন একটি পররাষ্ট্র কৌশল, যেখানে কোনো রাষ্ট্র একটি প্রভাবশালী শক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে পুরোপুরি অবস্থান না নিয়ে একাধিক বিকল্প সম্পর্ক বজায় রাখে। অর্থাৎ, বিদ্যমান অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাব্য অংশীদারের সঙ্গেও সহযোগিতা গড়ে তোলে।
বিএসএফ (BSF): ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (Border Security Force)।
