বিবেক চৌহান
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র
২০২৪ সালে বাংলাদেশের গ্রীষ্ম রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল তীব্র গরমের কারণে নয়, বরং এমন এক আন্দোলনের কারণে, যা রাজপথকে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সেই আন্দোলনে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। আজও সেই সংখ্যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গভীর ছাপ বহন করে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও যেন একই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। শ্রীলঙ্কার ‘আরাগালায়া’ আন্দোলন কয়েক দশকের রাজনৈতিক বংশপরম্পরার অবসান ঘটিয়েছে, নেপালে তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগে বাধ্য করেছে এবং ভারত ও পাকিস্তানেও নানা ধরনের অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।
অথচ আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতার জন্য যে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছিল, সেই দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক দীর্ঘদিন ধরেই কার্যত নিষ্ক্রিয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, সার্ককে আবার কার্যকর করে তোলা কতটা সম্ভব এবং বাংলাদেশ কি সেই উদ্যোগে নেতৃত্ব দিতে পারে?
উত্তপ্ত এক অঞ্চল
দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু মিল রয়েছে, যদিও প্রতিটি দেশের সংকটের সূত্রপাত ভিন্ন। বাংলাদেশ ও ভারতে তরুণদের নেতৃত্বে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে আন্দোলন হয়েছে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে বিরোধ থেকে। ভারতে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলন শুরু হয়েছিল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে।
নেপালেও তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলন হয়েছে। সেখানে দুর্নীতিই ছিল প্রধান ক্ষোভের উৎস। রাজনৈতিক দলগুলোর বছরের পর বছর ধরে চলা কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সরকারি নিষেধাজ্ঞার পর আরও বিস্ফোরক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সেখানে অতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও ওষুধের সংকট এবং অর্থনীতির ভেঙে পড়া পরিস্থিতি সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামিয়ে আনে। শেষ পর্যন্ত পুরো একটি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারের পতন ঘটে।
এসব আন্দোলন বিশ্লেষণ করলে জনঅসন্তোষের পেছনে দুটি প্রধান কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, দুর্নীতি এবং নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার সংকট। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, যা আশপাশের দেশগুলোর তরুণদের আন্দোলন দেখে আরও তীব্র হয়েছে।
ভারত সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলো অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হলেও এর অন্তর্নিহিত উত্তেজনা পুরোপুরি দূর হয়নি। পাকিস্তানেও একই ধরনের চাপ স্পষ্ট। দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সেখানে তরুণ ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির একাধিক আন্দোলন পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, দেশটি যেন সেই একই দাহ্য পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা এর প্রতিবেশী দেশগুলোতে আন্দোলনের আগুন জ্বালিয়েছে।
সার্কের নিষ্ক্রিয় দশক
১৯৮৫ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত সার্কের মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীকরণ এগিয়ে নেওয়া। অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ পরবর্তীতে দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকা গঠনের মধ্য দিয়ে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
কিন্তু ২০১৬ সালে সেই গতি থেমে যায়। উরি হামলার পর ভারত এবং পরবর্তীতে কয়েকটি দেশ ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বর্জন করলে সংস্থাটির কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এরপর থেকে সার্ক একটি প্রায় নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যার সচিবালয় থাকলেও কার্যকর আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড প্রায় নেই।
সার্ক পুনরুজ্জীবিত হলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো একটি অভিন্ন আলোচনার টেবিল পেতে পারে, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলে বারবার দেখা দেওয়া সংকট মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে। তথ্য বিনিময়, শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি, আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তার সমন্বয় এবং সম্মিলিতভাবে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্তমান আঞ্চলিক অস্থিরতার কথা বিবেচনা করলে একটি কার্যকর সার্ক শ্রীলঙ্কার অতি উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় জরুরি সহায়তা দিতে পারত। এমনকি একটি অভিন্ন শ্রমবাজারও গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে, যেখানে বাংলাদেশের একজন স্নাতক কলম্বোতে কাজ করতে পারেন কিংবা নেপালের একজন প্রকৌশলী ঢাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারেন। এর ফলে পুরো অঞ্চলে অস্থিরতার অন্যতম চালিকাশক্তি বেকারত্বের চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হতো।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন অন্য সদস্যদেশগুলোর তুলনায় তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ সার্কের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বর্তমানে সংস্থাটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করছে। একই সঙ্গে দেশটি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের অভিজ্ঞতা সরাসরি অর্জন করেছে।
নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিরোধের প্রশ্নে বাংলাদেশের ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের সঙ্গেই অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে দুই দেশের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর ভূমিকা পালন করতে পারে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ জাতিসংঘে এবং পৃথকভাবে ভারত ও পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্ক পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানিয়েছে।
তবে বড় বাধা হয়ে রয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার নিরাপত্তা সংকট এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস। দুই দেশ আলোচনার টেবিলে ফিরতে সম্মত হলেও অভিন্ন আলোচনা, যোগাযোগের সুযোগ এবং বাণিজ্য চুক্তির মতো বিদ্যমান প্রণোদনাগুলো, যার অনেকটাই দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকার কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে, এক দশকের অবিশ্বাস কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
দুই দেশকে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বিরোধ ও রাজনৈতিক বৈরিতা কিছুটা পাশে রেখে আলোচনায় ফিরিয়ে আনার মতো আরও শক্তিশালী প্রণোদনা তৈরি না হলে সার্কের মূল সংকট দূর করা কঠিন হবে।
আরেকটি সমস্যা রয়েছে সার্কের সনদের মধ্যেই। পুনরুজ্জীবিত সার্ক আরেকটি জাতিসংঘে পরিণত হবে কি না, সেই আশঙ্কা অমূলক নয়। এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে সব সদস্য অংশ নেয়, কিন্তু সিদ্ধান্ত মানার বাধ্যবাধকতা খুব সীমিত, কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পারে না।
সার্কের সনদও এই দুর্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সনদের দশম অনুচ্ছেদে নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়কে সংস্থার কার্যপরিধির বাইরে রাখা হয়েছে। সদস্যদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য কার্যকর প্রয়োগব্যবস্থা বা শাস্তির ব্যবস্থাও নেই।
অতীত অভিজ্ঞতাও এই উদ্বেগকে সমর্থন করে। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংক সার্কভুক্ত অঞ্চল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যবেক্ষণ করেছিল। সংস্থাটির হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে সম্ভাব্য বাণিজ্যের পরিমাণ আনুমানিক ৬২ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার মোট বাণিজ্যের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ সদস্যদেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্য থেকে আসে।
এই ব্যবধান শুধু বাণিজ্যিক সম্ভাবনার অপূর্ণতার চিত্র নয়। বরং এর পেছনে রয়েছে আঞ্চলিক নীতি সমন্বয়ের দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা।
উপসংহার
সার্কের পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ কার্যত শুরু হয়েছে এবং সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই বর্তমানে এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে উপযুক্ত অবস্থানে রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ভর করবে সেই বিরোধের ওপরই, যে বিরোধ সার্কের কার্যক্রমকে এক দশক ধরে থামিয়ে রেখেছে। ভারত ও পাকিস্তানকে কি আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে?
সহজ ভাষায় বললে, আলোচনার টেবিল সাজাতে পারে বাংলাদেশ, কিন্তু সেই টেবিলে কারা বসবে, তার ওপর নির্ভর করবে উদ্যোগের সাফল্য।
তবে সার্ক পুনরুজ্জীবিত হলেও তার ভবিষ্যৎ নাজুক থেকে যেতে পারে, যদি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার না করা হয়। সার্কের সনদে মৌলিক পরিবর্তন আনা, সদস্যদেশগুলোর আচরণের জন্য কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা তৈরি করা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা তাই অপরিহার্য।
দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান অস্থিরতা প্রমাণ করছে, এই অঞ্চলের দেশগুলোর সমস্যা আলাদা হলেও তাদের সংকটের অনেক শিকড় অভিন্ন। সেই বাস্তবতায় সার্ককে শুধু একটি পুরোনো আঞ্চলিক সংস্থা হিসেবে নয়, বরং আস্থা পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সম্মিলিত সংকট মোকাবিলার একটি নতুন মঞ্চ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ এখনো রয়েছে। বাংলাদেশের সামনে সেই সুযোগকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক দায়িত্বও রয়েছে।
তথ্যসূত্র
1. Fazil, Muhammad Daim. The Irrelevance of SAARC. South Asian Voices. [Online] 09 2016. https://southasianvoices.org/the-irrelevance-of-saarc/.
2. Haque, Mohd Amdadul. Beyond Terrorism: A Brief History of SAARC’s Failures. The Diplomat. [Online] 03 2025. https://thediplomat.com/2025/03/beyond-terrorism-a-brief-history-of-saarcs-failures/.
3. SAARC. SAARC CHARTER. SAARC. [Online] 1985. https://www.saarc-sec.org/#/pages/saarc-charter.
4. Kathuria, . A Glass Half Full: The Promise of Regional Trade in South Asia. s.l. : OpenKnowedge by World Bank Group, 2018.
