ড. নাঈমা পারভীন
কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি, ,যুক্তরাজ্য
এমন এক সময়ে আমরা বাস করছি, যখন মানুষ যে গতিতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাড়ি দিচ্ছে, সংস্কৃতি যেন সেই গতিতে সীমান্ত অতিক্রম করতে পারছে না। ফলে পরিচয় নিয়ে প্রশ্নও নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাঙালির কাছে চ্যালেঞ্জ এখন শুধু নিজেদের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা নয়, বরং সেই ঐতিহ্যকে কীভাবে জীবন্ত রাখা যায়, অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায় এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, সেই পথ খুঁজে বের করা। এই প্রেক্ষাপটে আত্মপ্রকাশ করছে আঠারো আনা বাঙালিয়ানা (AAB), একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শুধু ফেলে আসা দেশের স্মৃতি হিসেবে নয়, বরং একটি প্রাণবন্ত আন্তর্দেশীয় সম্প্রদায় হিসেবে নতুন করে গড়ে তোলা।
১৬ আগস্ট ২০২৬ লন্ডনে আঠারো আনা বাঙালিয়ানার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শুধু আরেকটি প্রবাসী সংগঠনের যাত্রা শুরু নয়। একবিংশ শতাব্দীতে বাঙালিয়ানা বলতে আমরা কী বুঝি, সেই ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার এক উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টারও সূচনা হতে যাচ্ছে।
ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে অভিন্ন সাংস্কৃতিক দিগন্তের পথে
প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালিরা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, খাবার ও ঐতিহ্যকে পদ্মা, মেঘনা ও হুগলি নদীর তীর ছাড়িয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে নিয়ে গেছেন। ঢাকা থেকে লন্ডন, কলকাতা থেকে টরন্টো, সিডনি থেকে দুবাই, সর্বত্রই বাঙালি সম্প্রদায় নিজেদের অভিন্ন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের নানা অংশকে ধরে রেখেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই সাংস্কৃতিক বন্ধন স্থানীয় বাস্তবতার মধ্যে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থেকে গেছে।
আঠারো আনা বাঙালিয়ানা সেই বিচ্ছিন্ন সুতোগুলোকে একটি অভিন্ন বুননে যুক্ত করতে চায়। এই উদ্যোগ সাংস্কৃতিক পরিচয়কে জন্মভূমি বা জাতীয়তার সীমানায় আবদ্ধ কোনো বিষয় হিসেবে দেখে না। বরং বাঙালিয়ানাকে একটি জীবন্ত ও পরিবর্তনশীল মানবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচনা করে। এই অভিজ্ঞতা যেমন সেই প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীর, যিনি আজও গ্রামের উৎসবের স্মৃতি বহন করেন, তেমনি বৈশ্বিক কর্মজীবনে এগিয়ে চলা একজন পেশাজীবীর এবং দক্ষিণ এশিয়া থেকে হাজার মাইল দূরে ডিজিটাল পর্দায় রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলকে নতুন করে আবিষ্কার করা এক তরুণ শিক্ষার্থীরও।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ঐতিহ্য কোনো জাদুঘরে সংরক্ষিত স্মারক নয়, কিংবা শুধু অতীতের প্রতি নস্টালজিয়াও নয়। বরং এটি প্রজন্ম ও সম্প্রদায়কে যুক্ত করার এক সক্রিয় শক্তি।
অন্তর্ভুক্তির দর্শন
আঠারো আনা বাঙালিয়ানার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো এর অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থান। অনেক সময় সাংস্কৃতিক সংগঠন নিজেদের পরিসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং ঐতিহ্যের রক্ষক হয়ে ওঠে, সংলাপের সুযোগ তৈরির পরিবর্তে। আঠারো আনা বাঙালিয়ানা সেখানে ভিন্ন একটি পথের কথা বলে। বাঙালি সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি অন্য সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পৃক্ততার জন্যও একটি উন্মুক্ত পরিসর তৈরি করতে চায় এই উদ্যোগ।
এই দর্শনের ভিত্তিতে রয়েছে তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত ধারণা।
প্রথমত, সাংস্কৃতিক বিস্তার। সমকালীন যোগাযোগব্যবস্থা, ডিজিটাল মাধ্যম, প্রকাশনা ও বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে বাঙালির শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, ইতিহাস ও জীবনধারাকে মানুষের কাছে সহজলভ্য করে তোলাই এর লক্ষ্য।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক ও বহুজাতিক সম্প্রীতি। সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে নয়, পারস্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমেই আরও শক্তিশালী হয়। বন্ধু, সহযোগী ও প্রতিবেশী সম্প্রদায়কে এই সাংস্কৃতিক সংলাপে যুক্ত করার মাধ্যমে বাঙালিয়ানা হয়ে উঠতে পারে বিভাজনের প্রাচীর নয়, বরং সংযোগের সেতু।
তৃতীয়ত, বৈশ্বিক ঐতিহ্য হিসেবে বাঙালিয়ানার পরিচিতি গড়ে তোলা। সাহিত্য, জ্ঞানচর্চা, কারুশিল্প ও সৃজনশীলতায় বাঙালির অবদানকে সামনে এনে বিশ্বের স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলোর অন্যতম হিসেবে বাংলা সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই তিনটি ধারণা মিলিয়ে বাঙালিয়ানাকে শুধু সংরক্ষণের বিষয় হিসেবে নয়, বরং বিশ্বের সামনে তুলে ধরা, উদযাপন করা এবং বিশ্ব সংস্কৃতিতে নতুন অবদান রাখার এক চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
লন্ডন ও ঢাকা: একই ভাবনার দুই প্রান্ত
আঠারো আনা বাঙালিয়ানার গল্প একই সঙ্গে শিকড় ও যাত্রাপথের অংশীদারত্বের গল্প। সংগঠনটির বৈশ্বিক সদর দপ্তর লন্ডনে হলেও এর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি বাংলাদেশের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত। ঢাকাভিত্তিক সৃজনশীল ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মুকুর অ্যাডভার্টাইজমেন্ট ডিজাইন অ্যান্ড মিডিয়া (MADAM) এর সঙ্গে অংশীদারত্ব সেই সংযোগকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
এই দ্বৈত পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে একদিকে সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ অটুট রাখা সম্ভব, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিসরেও এগিয়ে যাওয়া যায়। এটি এমন কোনো প্রবাসী উদ্যোগ নয়, যা নিজের উৎসভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন; আবার এমন কোনো দেশভিত্তিক প্রতিষ্ঠানও নয়, যা শুধু নিজস্ব ভূখণ্ডের মানুষের সঙ্গে কথা বলে। বরং এটি উৎস ও গন্তব্য, ঐতিহ্য ও অভিবাসন, শিকড় ও চলমান জীবনের মধ্যে এক সংলাপের প্রতীক।
সমকালীন বাঙালি জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে এই মডেলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ আজকের বাঙালি ভৌগোলিক সীমান্ত অতিক্রম করলেও তার সাংস্কৃতিক শিকড়কে পরিত্যাগ করে না।
একটি বৈশ্বিক সম্প্রদায় গড়ে তোলার প্রত্যয়
অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠনের তুলনায় আঠারো আনা বাঙালিয়ানার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো সম্প্রদায়ভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর এর গুরুত্বারোপ। বাংলাদেশ, ভারত, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, উপসাগরীয় অঞ্চল, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এবং দূরপ্রাচ্যজুড়ে এর আঞ্চলিক কাঠামো বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় শাখা ও সমন্বয়কারীদের মাধ্যমে সদস্যরা নিজেদের আশপাশের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন।
এই বাস্তবভিত্তিক কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অনুভূতি সবচেয়ে শক্তিশালী হয় মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। সহযোগিতা, পরামর্শ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, পেশাগত যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান এবং প্রজন্মের মধ্যে সংলাপের সুযোগ তৈরি করে আঠারো আনা বাঙালিয়ানা সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে বাস্তব সামাজিক শক্তিতে রূপ দিতে চায়।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য এই উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বিদেশে বেড়ে ওঠা দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের অনেক বাঙালি প্রায়ই একাধিক পরিচয়ের মাঝখানে নিজেদের অবস্থান খুঁজে নেয়। আঠারো আনা বাঙালিয়ানা এমন একটি পরিসর তৈরি করতে চায়, যেখানে এসব পরিচয় পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সৃজনশীলভাবে পাশাপাশি বিকশিত হতে পারে।
সাহিত্য, ভাষা ও ভবিষ্যতের পথ
বাঙালিয়ানার কেন্দ্রে রয়েছে ভাষা। ফলে shobdomukur.com এবং কথার কাগজের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো আঠারো আনা বাঙালিয়ানার সাংস্কৃতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, স্মৃতি ও ভাবনার আদানপ্রদান ভৌগোলিক সীমারেখা পেরিয়ে পৌঁছে যেতে পারে বিশ্বের নানা প্রান্তের পাঠকের কাছে।
সাহিত্য মানবসভ্যতার প্রতি বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্বজনীন মানবতাবাদ থেকে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি তার নিজস্ব ভূগোলের সীমানা পেরিয়ে বারবার বিশ্বমানবতার সঙ্গে কথা বলেছে। মহাদেশের পর মহাদেশে ছড়িয়ে থাকা পাঠক, লেখক, শিল্পী ও চিন্তকদের যুক্ত করার মধ্য দিয়ে আঠারো আনা বাঙালিয়ানা উপলব্ধি করছে যে সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা শুধু আনুষ্ঠানিক উদযাপনের ওপর নির্ভর করে না, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময়ের ওপরও সমানভাবে নির্ভরশীল।
ভাষা টিকে থাকে শুধু মানুষ কথা বলে বলে নয়, নতুন প্রজন্ম সেই ভাষায় নতুন সৃষ্টির জন্ম দেয় বলেও।
বৈশ্বিক বাঙালিয়ানার সম্ভাবনা
আঠারো আনা শব্দবন্ধের মধ্যে রয়েছে পূর্ণতার, অখণ্ডতার এবং আপসহীন সমগ্রতার এক প্রতীকী ধারণা। অনেক দিক থেকেই এই আকাঙ্ক্ষাই উদ্যোগটির মূল দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে। আজকের বাঙালি অভিজ্ঞতা বৈশ্বিক। ঢাকায় যেমন গল্প লেখা হচ্ছে, তেমনি নিউইয়র্কেও; সিলেটে যেমন স্মৃতি তৈরি হচ্ছে, তেমনি লন্ডনেও; চট্টগ্রামের জীবন যেমন বাঙালির পরিচয়ের অংশ, তেমনি মেলবোর্নের অভিজ্ঞতাও সেই পরিচয়কে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। ফলে বর্তমানের সঙ্গে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালির সম্পর্ক কীভাবে আরও অর্থবহ করা যায়, সেই প্রশ্নই এখন সামনে। আঠারো আনা বাঙালিয়ানা সেই প্রশ্নের একটি আশাব্যঞ্জক উত্তর হাজির করছে।
এটি এমন একটি নেটওয়ার্কের স্বপ্ন দেখছে, যেখানে সংস্কৃতি হবে মিলনের ক্ষেত্র, ঐতিহ্য তৈরি করবে নতুন সম্ভাবনা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় ভৌগোলিক সীমানাকে অতিক্রম করবে। লন্ডনে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে আঠারো আনা বাঙালিয়ানা বিশ্বের নানা প্রান্তের বাঙালিকে এমন এক ভবিষ্যৎ কল্পনা করার আহ্বান জানাচ্ছে, যেখানে বাঙালিয়ানা শুধু স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকবে না, বরং প্রতিদিনের জীবনে চর্চিত হবে, অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হবে এবং নতুন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুনভাবে বিকশিত হবে।
সংস্কৃতি স্থির হয়ে থাকলে তার শক্তি ক্ষয় হয়। শিকড়ের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে যখন সংস্কৃতি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পৃথিবীর পথে যাত্রা করে, তখনই তার সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হয়। ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এই বিশ্বে সংযোগের সন্ধানে থাকা বৈশ্বিক বাঙালি সম্প্রদায়ের জন্য আঠারো আনা বাঙালিয়ানার এই ভাবনা তাই সময়োপযোগী তো বটেই, একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
Reference:
