আরজা সাইত
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়, দুবাই
ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ২০২৬ সালের ২৫ জুলাই পদত্যাগ করেন। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে ককক্রোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের পর সরকারের পক্ষ থেকে এমন সিদ্ধান্ত আসে। যুব নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল NEET-UG প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। পাশাপাশি সংকটের মধ্যে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণসহ আরও কয়েকটি দাবিও সামনে আনা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে একই ধরনের একটি ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলন ভিন্ন পথে এগোয়। সেখানে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় না থেকে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি সামনে নিয়ে আসে।
ভারত ও বাংলাদেশের এই দুই যুব নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ফলাফল তুলনা করে এই নিবন্ধে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ কি জবাবদিহির দৃষ্টান্ত, নাকি সরকারের ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি? একই সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা পদত্যাগের পরিবর্তে সংস্কারের পথ বেছে নেওয়ায় তার তাৎপর্যই বা কী?
দিল্লিতে পদত্যাগ, ঢাকায় সংস্কারের দাবি
ভারতে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর নতুন করে NEET পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয়। এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে এবং সংকটের সঙ্গে যুক্ত মানসিক চাপের প্রেক্ষাপটে কয়েকজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। একই সময়ে ককক্রোচ জনতা পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে। ভারতের প্রধান বিচারপতি বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন, এমন মন্তব্যের পর এই রাজনৈতিক সংগঠনের গঠন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অনলাইনে তরুণদের ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে তা দিল্লির যন্তর মন্তরসহ দেশের বিভিন্ন শহরে সড়ক আন্দোলনে রূপ নেয়।
প্রশ্নপত্র ফাঁস, দায়িত্বহীনতা এবং পরীক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার গুরুতর সংকটের জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে দায়ী করে তাঁর পদত্যাগ দাবি করে দলটি। পরীক্ষার চাপ, অনিশ্চয়তা ও পুনঃপরীক্ষার কারণে আত্মহত্যা করা NEET পরীক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণের দাবিও জানানো হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চলতে থাকায় সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ ক্রমেই বাড়তে থাকে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে তীব্র বন্যা ও ভারী বৃষ্টির মধ্যেই এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষা পেছানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন অনেক শিক্ষার্থী। কিন্তু পরীক্ষা নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হওয়ায় বহু শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। কারও কারও হাঁটুপানির মধ্য দিয়ে কেন্দ্রে যেতে হয়। এর পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল থাকার অভিযোগও ওঠে, যা পরীক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।
বন্যার কারণে প্রায় ১১ হাজার পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। তাঁদের জন্য পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি ওঠে, কারণ এসব ফলাফল অনেক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা, ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ও ক্যারিয়ারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রথমদিকে আন্দোলনকারীরা শিক্ষামন্ত্রী ড. এএনএম এহসানুল হক মিলনের পদত্যাগের পাশাপাশি বাকি পরীক্ষাগুলো স্থগিত করা এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার দাবি জানান। পরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীরা ছয় দফা সংস্কার দাবি সামনে আনে। এসব দাবির মধ্যে ছিল পরীক্ষার্থীদের জন্য ঐচ্ছিক পুনঃপরীক্ষার সুযোগ, ভুল প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর প্রদান এবং আরও শান্তিপূর্ণ ও শিক্ষার্থী সহায়ক পরিবেশে পরীক্ষা গ্রহণ।
কেন দুই দেশের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হলো
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পদত্যাগের দাবি থেকে সরে এসে সংস্কারের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে স্পষ্ট করে। কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগ অনেক সময় সরকারের জন্য তুলনামূলক সহজ একটি রাজনৈতিক সমাধান হয়ে দাঁড়ায়। এর মাধ্যমে জনমনে তৈরি ক্ষোভ সাময়িকভাবে প্রশমিত করা যায় এবং জবাবদিহির একটি বার্তা দেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু তার মাধ্যমে যে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল কারণ দূর হবে, এমন নিশ্চয়তা থাকে না।
একজন নতুন মন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পরও একই ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থা, দুর্বল প্রক্রিয়া এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বহাল থাকতে পারে। একজন ব্যক্তিকে সরিয়ে দিলেই পরীক্ষার সময়সূচির সমস্যা দূর হয় না, ভুল প্রশ্নপত্র সংশোধন হয় না, কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বন্ধ হয় না।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা সম্ভবত এই পার্থক্যটিই স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিল। প্রতীকী একটি সাফল্যে সন্তুষ্ট না হয়ে তারা এমন সংস্কারের দাবি বেছে নিয়েছে, যা সরাসরি শিক্ষার্থীদের উপকারে আসবে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য ঐচ্ছিক পুনঃপরীক্ষা, ভুল প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর এবং আরও শিক্ষার্থী সহায়ক পরীক্ষা কেন্দ্রের দাবি ছিল এমন কিছু পদক্ষেপ, যার প্রভাব সংবাদচক্র শেষ হয়ে যাওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের জীবনে থেকে যেতে পারে।
পদত্যাগ একটি বিতর্কের সমাপ্তি ঘটাতে পারে। কিন্তু সংস্কার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যে পরিস্থিতি থেকে সংকটের জন্ম হয়েছে।
ভারত ও বাংলাদেশ: দুটি ভিন্ন বাস্তবতার তুলনা
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে তাই শুধু ব্যর্থতার প্রমাণ কিংবা নিখাদ জবাবদিহির উদাহরণ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এর পেছনে ছিল গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন সামনে থাকায় নির্বাচিত সরকারের জন্য জনসমর্থন হারানোর আশঙ্কা ছিল। কয়েক সপ্তাহের ধারাবাহিক আন্দোলন, গণমাধ্যমের নজরদারি এবং সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া যুব আন্দোলন শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীকে পদে রাখার রাজনৈতিক মূল্য সরকারের কাছে অত্যন্ত বেশি করে তোলে।
অন্যদিকে মিলনের পদে থাকা বাংলাদেশের সরকারের জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার প্রমাণও নয়। তিনি এমন একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অধীনে দায়িত্ব পালন করছেন, যা নির্বাচিত নয় এবং যার সামনে ভোট হারানোর একই ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি নেই। ফলে ভারতে যে রাজনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে ত্বরান্বিত করেছিল, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই চাপের ধরন একই নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাই শেষ পর্যন্ত একটি সচেতন রাজনৈতিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা একজন ব্যক্তির পদত্যাগের দাবির পরিবর্তে পরীক্ষাব্যবস্থার নির্দিষ্ট ও কার্যকর সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে।
ভারত ও বাংলাদেশের এই দুই অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগ নিজে থেকেই কোনো সরকারের জবাবদিহির মাত্রা নির্ধারণ করে না। বরং তা অনেকাংশে নির্ভর করে সরকারের ওপর কী ধরনের রাজনৈতিক চাপ কাজ করছে এবং সেই চাপ কতটা কার্যকরভাবে অনুভূত হচ্ছে তার ওপর।
একদিকে ভারতের ঘটনা দেখায়, দীর্ঘস্থায়ী জনআন্দোলন ও রাজনৈতিক চাপ একজন মন্ত্রীর পদত্যাগকে অনিবার্য করে তুলতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের অবস্থান দেখায়, জবাবদিহির অর্থ সব সময় একজন ব্যক্তিকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়। কখনও কখনও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন, যে ব্যবস্থার ত্রুটি থেকে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।
Reference:
