ড. অনুসূয়া বিশ্বাস
অ্যালায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়, বেঙ্গালুরু
বিনোদন একসময় ছিল অবসর বিনোদন ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির একটি মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে তা এখন কৌশলগত অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম চালিকায় পরিণত হয়েছে। এই শিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, বিনিয়োগ আকর্ষণ করে, পর্যটন বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি দেশের প্রভাব ও পরিচিতি জোরদার করে। বিশ্বজুড়ে সৃজনশীল শিল্পের পরিসর ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে গণমাধ্যম ও বিনোদন, যেমন চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, স্ট্রিমিং সেবা, ভিডিও বিষয়বস্তু ও বেতার; ডিজিটাল গণমাধ্যম ও খেলাধুলাভিত্তিক প্রযুক্তি, যেমন অ্যানিমেশন, দৃশ্যপ্রভাব, ডিজিটাল বিষয়বস্তু নির্মাণ ও কম্পিউটারভিত্তিক খেলা; দৃশ্য ও পরিবেশনশিল্প, যেমন নাট্যচর্চা, সরাসরি সংগীত পরিবেশনা, নৃত্য, কনসার্ট ও চারুশিল্প। পাশাপাশি অ্যানিমেশন, দৃশ্যপ্রভাব, খেলাধুলাভিত্তিক প্রযুক্তি, চিত্রকাহিনি এবং সম্প্রসারিত বাস্তবতার মতো উদীয়মান উপখাতও উদ্ভাবন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে ক্রমশ স্বীকৃতি পাচ্ছে।
ভারত তার গণমাধ্যম ও বিনোদন খাতকে একটি বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় সৃজনশীল শিল্পভূমিতে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং দ্রুত বিকশিত ডিজিটাল জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো বিনোদন খাতের পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেনি।
ভারতে গণমাধ্যম ও বিনোদন শিল্প
ভারতীয় শিল্প ও বাণিজ্য মহাসংঘ এবং আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের ২০২৫ সালের গণমাধ্যম ও বিনোদন শিল্পবিষয়ক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের গণমাধ্যম ও বিনোদন শিল্প একটি উদীয়মান গুরুত্বপূর্ণ খাত। ২০২৫ সালে এই শিল্পের বাজারমূল্য ছিল ৩০.০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২.৭৯ ট্রিলিয়ন রুপি। এক বছরে এই খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯.১ শতাংশ। ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনে এই শিল্পের অবদান প্রায় ০.৭৩ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু বিজ্ঞাপন খাতের আয়, যা ১.৫ ট্রিলিয়ন রুপির বেশি, মোট দেশজ উৎপাদনে প্রায় ০.৪১ শতাংশ অবদান রাখে।
ডিজিটাল গণমাধ্যম, ইন্টারনেটভিত্তিক সরাসরি সম্প্রচার সেবা, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও এবং সরাসরি বিনোদনমূলক আয়োজন এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। ২০২৪ সালে ডিজিটাল গণমাধ্যমের বাজারমূল্য ১০.৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে টেলিভিশনকে ছাড়িয়ে যায়। মোট গণমাধ্যম ও বিনোদন শিল্পের আয়ের ৩২ শতাংশ নিয়ে ডিজিটাল গণমাধ্যম তখন এই খাতের বৃহত্তম অংশে পরিণত হয়। আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের ২০২৫ সালের মার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে ভারতের গণমাধ্যম ও বিনোদন বাজারের আকার ৩৫.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে বা প্রায় ৩.৩ ট্রিলিয়ন রুপিতে পৌঁছাতে পারে। তখন বিশ্বে ভারতের অবস্থান হতে পারে তৃতীয় বৃহত্তম বাজার হিসেবে।
দ্রুত ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ, স্ট্রিমিং সেবার বিস্তার, ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ, চাহিদামাফিক ভিডিও সেবার বৈচিত্র্য, আঞ্চলিক বিষয়বস্তু নির্মাণ এবং ভারতীয় বিনোদনসেবার বৈশ্বিক চাহিদা এই খাতের সম্প্রসারণকে ত্বরান্বিত করেছে।
ভারতের সাফল্যের গল্প
ভারতের গণমাধ্যম ও বিনোদন শিল্পের উত্থানের পেছনে রয়েছে ডিজিটাল সম্প্রসারণ, ভোক্তার পরিবর্তিত রুচি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। প্রচলিত টেলিভিশননির্ভর বিনোদন থেকে ডিজিটাল বিনোদনের দিকে দ্রুত পরিবর্তন বিষয়বস্তু নির্মাণ, বিতরণ এবং আয়ের কাঠামোকে নতুনভাবে সাজিয়েছে।
বলিউডের পাশাপাশি বাংলা, তামিল, তেলুগু, কন্নড় ও মালয়ালম ভাষার আঞ্চলিক চলচ্চিত্রও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ভারতের নিজস্ব ইন্টারনেটভিত্তিক বিনোদন প্ল্যাটফর্ম জিওহটস্টার, অ্যামাজন এমএক্স প্লেয়ার, জি৫ এবং সনি লিভ এবং আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম হইচই, আহা, সান নেক্সট ও চৌপালের মতো সেবা আন্তর্জাতিক বিনোদন প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্স ও অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। এসব প্ল্যাটফর্ম শুধু ভারতীয় দর্শকের কাছে নয়, এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দর্শকদের কাছেও পৌঁছে গেছে।
এই বিস্ময়কর অগ্রগতির পেছনে সরকারি উদ্যোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে ভারতের উদারীকরণ, বেসরকারীকরণ ও বিশ্বায়ন নীতির ভিত্তি স্থাপিত হয়। এই নীতি গণমাধ্যম ও সম্প্রচার শিল্পে দেশীয় ও বৈশ্বিক বিনিয়োগ এবং বেসরকারি অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্য সরকার কর প্রণোদনা এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিবেশ তৈরি করে।
সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী কাজকে স্বীকৃতি এবং প্রণোদনা দেওয়ার জন্য ভারত শক্তিশালী মেধাস্বত্ব ও রয়্যালটি ব্যবস্থাও গড়ে তুলেছে। এর ফলে নির্মাতারা তাঁদের সৃষ্টিশীল কাজ থেকে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের সুযোগ পান। সস্তা ইন্টারনেট সুবিধা এবং প্রায় ৯৯৫.৬৩ কোটি ব্রডব্যান্ড গ্রাহক ভারতের ডিজিটাল গণমাধ্যম ও ইন্টারনেটভিত্তিক বিনোদন খাতের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মোবাইলনির্ভর বিষয়বস্তু ব্যবহার এবং স্থানীয় ও আঞ্চলিক ভাষার বিষয়বস্তুর ব্যাপক চাহিদাও বাজার সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সৃজনশীল জনশক্তি গড়ে তুলতেও ভারত দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ করে আসছে। সরকার প্রতিষ্ঠিত পুনের ভারতীয় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রতিষ্ঠান, কলকাতার সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রতিষ্ঠান এবং চেন্নাইয়ের এম.জি.আর. সরকারি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান চলচ্চিত্র নির্মাণ ও চিত্রগ্রহণে প্রশিক্ষিত জনশক্তি তৈরি করছে। পাশাপাশি মুম্বাইয়ের হুইসলিং উডস ইন্টারন্যাশনাল এবং নয়ডার এশিয়ান একাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশনের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও সৃজনশীল পেশাজীবী তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ভারতের নীতিনির্ধারকেরা বিনোদন ও গণমাধ্যমকে শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখেননি। বরং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের উপস্থিতি বাড়ানোর সক্ষমতা থাকা একটি রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে বিবেচনা করেছেন। অস্কার ও কান চলচ্চিত্র উৎসবে ভারতীয় চলচ্চিত্রের পুরস্কার ও মনোনয়ন আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশটির সৃজনশীল সক্ষমতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। দৃশ্যপ্রভাবের ক্ষেত্রেও ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে। অস্কার মনোনীত মুফাসা: দ্য লায়ন কিং ও এমিলিয়া পেরেজ এর মতো বড় প্রকল্পে ভারতের সৃজনশীল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ব্যবহার তার উদাহরণ।
ভারতীয় প্রিমিয়ার লিগের মাধ্যমেও ভারত বৈশ্বিক ডিজিটাল পরিসরে বড় ধরনের প্রভাব তৈরি করেছে। ২০২৬ সালে ভারতীয় প্রিমিয়ার লিগের ডিজিটাল দর্শকসংখ্যা রেকর্ড ১.২ বিলিয়নে পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। সামগ্রিকভাবে ভারতের সৃজনশীল শিল্পের রপ্তানি মূল্য প্রায় ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে বা ৯৪৬.৭৭ বিলিয়ন রুপিতে পৌঁছেছে। অ্যানিমেশন ও দৃশ্যপ্রভাব, খেলাধুলাভিত্তিক প্রযুক্তি এবং সরাসরি বিনোদনমূলক আয়োজনের প্রতি বৈশ্বিক চাহিদা এই রপ্তানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
সাম্প্রতিক নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে ভারত সরকার গণমাধ্যম ও বিনোদন খাতে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের সীমা ৭৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০০ শতাংশ করেছে। ২০০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই খাতে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ ১২,৪৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৮২,২০১ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। একই সময়ে অনলাইন খেলাধুলাভিত্তিক বিনোদন খাতের বাজার ২০২৫ সালের ৩.০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ২০২৭ সালে ৩.৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।
২০২৬ থেকে ২০২৭ অর্থবছরের কেন্দ্রীয় বাজেটে ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জন্য ৫১৫.০৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৪,৫৫১.৯৪ কোটি রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৫ হাজার স্কুল ও ৫০০ কলেজে অ্যানিমেশন, দৃশ্যপ্রভাব, খেলাধুলাভিত্তিক প্রযুক্তি ও চিত্রকাহিনি বিষয়ক বিষয়বস্তু নির্মাতা পরীক্ষাগার স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রকল্পে ০.০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২৫০ কোটি রুপি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও বিনোদন খাত
অনুরূপ সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশেরও বেশ কিছু শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে। তরুণ জনগোষ্ঠী, দ্রুত ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণ এবং ক্রমবর্ধমান ইন্টারনেট সংযোগের ওপর ভর করে দেশে একটি প্রাণবন্ত সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা ১৩৫.৯৪ মিলিয়ন। এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১২০.৮৪ মিলিয়ন।
দেশীয় ইন্টারনেটভিত্তিক বিনোদন প্ল্যাটফর্ম বঙ্গ, চরকি, বিঞ্জ, বায়োস্কোপ এবং টফির উত্থান প্রমাণ করে যে স্থানীয়ভাবে নির্মিত ডিজিটাল বিষয়বস্তুর প্রতি দর্শকদের আগ্রহ বাড়ছে। তবে এই খাত এখনো বেশ কিছু কাঠামোগত বাধার মুখে রয়েছে। অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, ডিজিটাল জলদস্যুতা, দুর্বল মেধাস্বত্ব প্রয়োগ, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং স্থানীয় সম্প্রচার প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য অসম প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনকে নিরুৎসাহিত করছে।
ভারতের সাফল্য বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। প্রথমত, বিনোদন শিল্পকে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই শিল্প উদ্যোক্তা তৈরি করে, কর্মসংস্থান বাড়ায়, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে এবং রপ্তানির পরিসর বহুমুখী করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মেধাস্বত্ব আইন, সৃষ্টিশীল অধিকারের সুরক্ষা এবং কার্যকর রয়্যালটি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নীতিগত সংস্কার জরুরি। শক্তিশালী মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে কার্যকর রয়্যালটি ব্যবস্থা চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক, সংগীতশিল্পী ও পরিবেশকদের জন্য টেকসই আয়ের সুযোগ তৈরি করবে। ফলে সৃজনশীল কাজে নতুনত্ব ও বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়বে।
তৃতীয়ত, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বিনোদন প্ল্যাটফর্মের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রয়োজন। বিনিয়োগে প্রণোদনা, প্রতিযোগিতামূলক করনীতি এবং স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রক কাঠামো দেশীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বৈশ্বিক বিনিয়োগও আকর্ষণ করতে পারে।
চতুর্থত, বাংলাদেশের সৃজনশীল অবকাঠামো ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। আধুনিক চলচ্চিত্র স্টুডিও, অ্যানিমেশন কেন্দ্র, দৃশ্যপ্রভাব পরীক্ষাগার, চলচ্চিত্র-পরবর্তী নির্মাণসুবিধা এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে উন্নতমানের বিষয়বস্তু নির্মাণের সক্ষমতা বাড়বে এবং দক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে সহযোগিতাও বাড়ানো জরুরি। চলচ্চিত্র নির্মাণ, অ্যানিমেশন, দৃশ্যপ্রভাব, ডিজিটাল গণমাধ্যম, খেলাধুলাভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং সৃজনশীল উদ্যোক্তা তৈরির মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে বিশেষায়িত শিক্ষাক্রম চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে।
সবশেষে, রপ্তানি ও পর্যটনের সঙ্গে বিনোদন শিল্পকে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক সৃজনশীল ব্র্যান্ড গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণ, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনা চুক্তি, সাংস্কৃতিক পর্যটন সম্প্রসারণ এবং শিল্প ও সৃজনশীল পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও শক্তিশালী হবে।
ভারতের সৃজনশীল শিল্পের ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কাঠামোগত সহায়তা বিনোদন ও সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কিছু নীতিগত উদ্যোগ বিনোদন শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান সচেতনতার ইঙ্গিত দেয়। তবে সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং কার্যকর নীতিগত সংস্কার নিশ্চিত করা। সৃজনশীল প্রতিভা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল প্রযুক্তি গ্রহণের দিক থেকে বাংলাদেশ যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এখন প্রয়োজন এমন একটি নীতিপরিবেশ, যা দেশের এই সৃজনশীল সম্পদকে টেকসই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পারে।
ভারতের গণমাধ্যম ও বিনোদন শিল্পের অভিজ্ঞতা দেখায়, স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তাই একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক সৃজনশীল পরিবেশ তৈরির ভিত্তি গড়ে দেয়। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিত নীতি সংস্কার গ্রহণ করা গেলে দেশের বিনোদন শিল্পও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।
তথ্যসূত্র
- FICCI & EY. (2025). Media and Entertainment Industry Report 2025.
- Confederation of Indian Industry: India to the World: Changing Ecosystem of India’s Media & Entertainment Sector
- Bangladesh Ministry of Cultural Affairs.
- Bangladesh Telecommunication Regulatory Commission (BTRC).
