শুদেব বড়ুয়া
ফ্রিল্যান্স বিশ্লেষক
বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণ, সহজীকরণ ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্ন বিনিয়োগ কাঠামোকে একত্রিত করতে ১৮০ দিনের অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন এবং ওয়ান-স্টপ সেবার ডিজিটালায়নের মতো উদ্যোগের জন্য সংস্থাটি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। তবে সামগ্রিক প্রভাব, বিশেষত ২০২৫ সালে, এখনও প্রশ্নের বাইরে নয়।
গত এক বছরে বিডা বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২৫, রোডশো, বিনিয়োগকারী গোলটেবিল বৈঠক, স্টার্টআপ কানেক্ট ইভেন্ট, খাতভিত্তিক পরামর্শ সভা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিনিধিদলসহ বিভিন্ন আলোচিত কার্যক্রমের মাধ্যমে ৪,২০০ অংশগ্রহণকারী ও ১৩০-এরও বেশি বক্তাকে একত্রিত করেছে। কিন্তু তাজা বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক ইকুইটি পুঁজির চিত্র তেমন উৎসাহব্যঞ্জক নয়।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের নিট এফডিআই ১.৭৭ বিলিয়ন ডলারে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ছিল পুনরায় বিনিয়োগকৃত আয় এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ, যা মূলত ধরে রাখা পুঁজিরই প্রতিফলন। পুনরায় বিনিয়োগকৃত আয় ৩১৮ শতাংশ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ ২৫.৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ইকুইটি পুঁজি বেড়েছে মাত্র ১.৮৪ শতাংশ, ২০২৪ সালের ৫৪৪.৬৪ মিলিয়ন ডলার থেকে মাত্র ১০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৫৫৪.৬৪ মিলিয়ন ডলারে। বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা নিঃসন্দেহে আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়েছেন, কিন্তু প্রচারমূলক তৎপরতা তাজা ইকুইটি বিনিয়োগে রূপান্তরিত না হওয়ার দুর্বলতাটি উপেক্ষা করা কঠিন।
ব্যাপকভাবে প্রশংসিত বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর প্রতি গণমাধ্যমের অতিরিক্ত মনোযোগও খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। ২০২৫ সালজুড়ে তিনি জাতীয় টেলিভিশন সাক্ষাৎকার, পত্রিকার ফিচার, সামিট বক্তৃতা, বিনিয়োগকারী ফোরাম, পডকাস্ট, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কভারেজ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচারণায় নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন। এতে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম দৃশ্যমান অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তবে গণমাধ্যমে দৃশ্যমানতা কখনো পরিমাপযোগ্য বিনিয়োগ ফলাফলের বিকল্প হতে পারে না।
ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে চীনে বিডার প্রথম আন্তর্জাতিক কার্যালয় খোলার সিদ্ধান্তটিও ভাবনার দাবি রাখে। চীনে উপস্থিতি স্থাপন অন্যায্য কিছু নয়। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে চীন বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, আর সেখানে ক্রমবর্ধমান শ্রমব্যয় সরবরাহ শৃঙ্খলকে বিদেশে স্থানান্তরিত করতে উৎসাহিত করছে।
তবে প্রশ্ন হলো, বিডার প্রথম বিদেশি কার্যালয়ের জন্য চীনকেই কেন বেছে নেওয়া হলো। দক্ষিণ এশিয়া এখন চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রভূমি। ওয়াশিংটন ও দিল্লির মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে মতভেদ থাকলেও উভয় দেশই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত উভয়ই বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত, তাই বেইজিংয়ের প্রতি স্পষ্ট ঝোঁক বিদেশে অনাকাঙ্ক্ষিত ধারণার জন্ম দিতে পারে। আরও সুষম পন্থা হতো চীন, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক প্রধান অর্থনীতিতে একসঙ্গে কার্যালয় স্থাপন করা, যা একটি দেশে কেন্দ্রীভূত না হয়ে বৈচিত্র্যের বার্তা দিত।
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও রুয়ান্ডার মতো সফল বিনিয়োগ প্রচার সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।
প্রথমত, বাংলাদেশ আইনি অনুমোদনের নির্দিষ্ট সময়সীমা চালু করতে পারে, যেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাড়া না দিলে আবেদন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হবে। ভারত ইতিমধ্যে রাজ্য পর্যায়ে এ ধরনের ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাজ্যের সাবেক ডেলিভারি ইউনিট মডেল থেকে আংশিক অনুপ্রেরণা নিয়ে বাংলাদেশ একটি মন্ত্রিসভা পর্যায়ের বিনিয়োগ বাস্তবায়ন ইউনিট গঠন করতে পারে, যা প্রধান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, বাধা ও বাস্তবায়নে বিলম্বের তথ্য প্রকাশ্যে পর্যবেক্ষণ করবে।
তৃতীয়ত, বিডা আরও বিকেন্দ্রীভূত পদ্ধতি অনুসরণ করে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও জার্মানির মতো প্রধান অংশীদার দেশগুলোর জন্য স্থায়ী কান্ট্রি ডেস্ক তৈরি করতে পারে। প্রতিটি ডেস্কে বার্ষিক বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে বিশেষায়ন ও দক্ষতা দুটোই বাড়বে। চতুর্থত, ইন্দোনেশিয়ার অনলাইন সিঙ্গেল সাবমিশন (ওএসএস) পদ্ধতি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। লাইসেন্সিং জটিলতা কমিয়ে এই পদ্ধতি দেশটির বিনিয়োগ পরিবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করেছে। বিডার ওয়ান-স্টপ সার্ভিসকে কেবল একটি ডিজিটাল ফরওয়ার্ডিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে না রেখে একটি প্রকৃত অনুমোদন কর্তৃপক্ষে পরিণত করতে হবে।
সবশেষে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হয়তো ভিয়েতনামের কাছ থেকেই নেওয়া সম্ভব। দেশটির সাফল্য প্রধানত বিপণন প্রচারণা বা বিনিয়োগ সামিটের ফল নয়। বরং ভিয়েতনাম নিশ্চিত করেছিল যে শিল্প অঞ্চলগুলো প্রস্তুত, বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্ভরযোগ্য, শুল্ক প্রক্রিয়া উন্নত এবং বিনিয়োগকারীরা নিয়মের ক্ষেত্রে পূর্বানুমানযোগ্যতা পাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত অবকাঠামো ও নীতিই প্রচারমূলক অনুষ্ঠানের চেয়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিডার সামনে এখন মূল প্রশ্নটি আর মনোযোগ আকর্ষণের সক্ষমতা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, সেই মনোযোগকে কারখানা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও তাজা ইকুইটি পুঁজিতে রূপান্তরিত করা যাচ্ছে কি না। বাস্তবায়নের সূচকগুলো উন্নত না হলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ ফলাফলের দেশ হিসেবে নয়, বরং বিনিয়োগ সামিটের দেশ হিসেবেই পরিচিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
