কামরুন নাহার মাহমুদ
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, আইনটির বেশ কয়েকটি ধারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, মানহানি কিংবা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি সংক্রান্ত অপরাধগুলো এখনও ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে সাংবাদিক, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী এবং রাজনৈতিক সমালোচকদের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা বিদ্যমান।
যদিও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে বিতর্কিত নয়টি ধারা বাতিল করা হয়েছে এবং পূর্ববর্তী মামলাগুলোর জন্য সাধারণ ক্ষমা দেওয়া হয়েছে, তবুও অস্পষ্ট ভাষার বহু অপরাধ বহাল থাকায় উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
নাগরিক স্বাধীনতা ও গোপনীয়তা
নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ওয়ারেন্টবিহীন নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং বিষয়বস্তু অপসারণের ক্ষমতা যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে। ধারা ৮-এর অধীনে জাতীয় নিরাপত্তা বা জাতীয় ঐক্যের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত যে কোনো বিষয়বস্তু ব্লক করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে, যার ওপর স্বাধীন তদারকির ব্যবস্থা সীমিত। এছাড়া আইনটিতে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা বা গোপনীয়তা রক্ষার জন্য কোনো স্বতন্ত্র সুরক্ষা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ব্যবসা ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব
এই আইন কার্যকর হওয়ার ফলে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর নতুন দায়িত্ব আরোপিত হয়েছে। তাদেরকে অপসারণ, ব্লকিং ও নজরদারিসংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হবে। নির্দেশনা অমান্য করলে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। একদিকে এটি অনলাইন জালিয়াতি ও আর্থিক সাইবার অপরাধ দমনে সহায়ক হতে পারে, অন্যদিকে বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ডিজিটাল ব্যবসা ও উদ্ভাবনকে নিরুৎসাহিত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক আইন
আইনটি আন্তর্জাতিক চুক্তি, পারস্পরিক আইনগত সহায়তা এবং প্রত্যর্পণ সহযোগিতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা বিষয়ক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে যে অস্পষ্ট বক্তব্যসংক্রান্ত অপরাধ বাতিলের আহ্বান জানিয়ে আসছিল, আইনটি সে বিষয়ে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারেনি।
তবে ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকারকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া আন্তর্জাতিক ডিজিটাল অধিকার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অন্যান্য দেশের আইনের সঙ্গে তুলনা
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি বিধিমালা কিংবা পাকিস্তানের ইলেকট্রনিক অপরাধ প্রতিরোধ আইনের মতোই সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৬ সাইবার অপরাধ ও বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট বা যুক্তরাজ্যের অনলাইন সেফটি অ্যাক্টের তুলনায় বাংলাদেশের আইনটি অনলাইন বক্তব্যের ক্ষেত্রে অনেক বেশি কঠোর।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের আইন যেখানে প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি, ব্যবহারকারীর অধিকার এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির ওপর জোর দেয়, সেখানে বাংলাদেশের আইন মূলত ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদান এবং রাষ্ট্রকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেওয়ার ওপর নির্ভরশীল। পাকিস্তানের আইনের সঙ্গে এর সবচেয়ে বেশি সাদৃশ্য দেখা যায়, যেখানে সাইবার সন্ত্রাসবাদ, মানহানি এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
অস্পষ্টতা ও সম্ভাব্য ফাঁকফোকর
আইনের বেশ কয়েকটি শব্দ ও ধারণা অত্যন্ত বিস্তৃত এবং অস্পষ্ট। ‘অপমান’, ‘বিরক্তি’, ‘প্রতিশোধ’ কিংবা ‘ক্ষতিকর বিষয়বস্তু’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। একইভাবে, জরুরি পরিস্থিতির অজুহাতে বিচারিক অনুমোদনের আগেই বিষয়বস্তু অপসারণ বা ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার সুযোগও অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, তদন্তের ৯০ দিনের সময়সীমা পূরণের চাপ কখনো কখনো দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। এছাড়া অপসারণ আদেশের বিরুদ্ধে স্বাধীন আপিল বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আইনটিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। ফলে প্রকৃত সাইবার অপরাধ দমনের পাশাপাশি আইনটি সেন্সরশিপ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কাও রয়ে গেছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনী
আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতিগুলোর একটি হলো জনস্বার্থভিত্তিক প্রতিরক্ষার অনুপস্থিতি। আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিক, হুইসেলব্লোয়ার, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের কর্মীদের জন্য সুরক্ষা থাকা জরুরি। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, করপোরেট অনিয়ম কিংবা নিরাপত্তা দুর্বলতা প্রকাশ করা সবসময় ক্ষতিকর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাজ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা গণতান্ত্রিক জবাবদিহির জন্য অপরিহার্য।
এ কারণে আদালতকে প্রকৃত সাইবার হুমকি এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের সুযোগ দিতে হবে। আইনের ভাষাও আরও নির্দিষ্ট ও সীমিত হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো, সাইবার হুমকি এবং ক্ষতিকর ডিজিটাল কার্যকলাপের মতো ধারণাগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা উচিত।
‘বিরক্তি’ বা ‘অনুভূতিতে আঘাত’ জাতীয় অস্পষ্ট শব্দাবলি বাদ দিয়ে সরাসরি সহিংসতার উসকানি, হুমকি অথবা চিত্রভিত্তিক যৌন নির্যাতনের মতো নির্দিষ্ট মানদণ্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। সব ধরনের বিষয়বস্তু অপসারণের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বিচারিক অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
তদন্ত ক্ষমতার ক্ষেত্রেও শক্তিশালী বিচারিক তদারকি থাকা উচিত। ডিজিটাল ডিভাইস তল্লাশি, যোগাযোগে প্রবেশ, তথ্য জব্দ বা তথ্য প্রকাশে বাধ্য করার মতো ক্ষমতা সাধারণত আদালতের পূর্বানুমোদনের অধীন হওয়া উচিত। সাংবাদিকদের তথ্য, অপ্রকাশিত নথি এবং গোপন সূত্রের জন্য বিশেষ সুরক্ষা প্রদান করা জরুরি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভিত্তি হলো তথ্যদাতার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা।
সাইবার নিরাপত্তা গবেষক এবং নৈতিক হ্যাকারদের জন্যও নিরাপদ আইনগত পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সদিচ্ছার ভিত্তিতে নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত ও প্রকাশকারী গবেষকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হলে সামগ্রিকভাবে দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সরকারি সংস্থাগুলোকে নিয়মিতভাবে তদন্ত, তল্লাশি, তথ্য চাওয়া এবং মামলা পরিচালনার পরিসংখ্যান প্রকাশ করতে বাধ্য করা উচিত। এতে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। একজন স্বাধীন সাইবার অধিকার ওমবাডসম্যান নিয়োগ করা যেতে পারে, যিনি নজরদারি, তদন্ত বা ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করবেন। এছাড়া তথ্য সুরক্ষার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা, যেমন তথ্যের সীমিত ব্যবহার, নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য, আনুপাতিকতা এবং জবাবদিহির নীতি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
আইনটির নির্দিষ্ট সময় পরপর সংসদীয় পর্যালোচনার ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। প্রযুক্তি ও সাইবার হুমকি দ্রুত পরিবর্তিত হয়, ফলে বর্তমান সময়ে প্রয়োজনীয় মনে হওয়া ক্ষমতা ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় বা অপব্যবহারের ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ধর্মীয় অনুভূতি সম্পর্কিত বিষয়েও আরও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বক্তব্যের ওপর বিধিনিষেধ কেবল তখনই আরোপ করা উচিত, যখন তা সহিংসতা, বৈষম্য বা বিদ্বেষ উসকে দেয়। শুধুমাত্র সমালোচনা বা মতভিন্নতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।
সবশেষে, আইনের দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতার ওপর। স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, নির্দিষ্ট মেয়াদ এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রতি জনআস্থা বৃদ্ধি পাবে।
সমষ্টিগতভাবে এই সংস্কারগুলো বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোকে দুর্বল করবে না, বরং আরও শক্তিশালী করবে। কারণ টেকসই সাইবার নিরাপত্তা কেবল কঠোর ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; এটি সাংবিধানিক অধিকার, ন্যায়বিচার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করেই কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
